কোভিড ১৯, শ্রমিক শ্রেণী এবং জাতীয়-বাজেট ২০২০-২১ ২০২০

কোভিড ১৯, শ্্রমিক শ্রেণী এবং জাতীয়-বাজেট ২০২০-২১
কোভিড-১৯-এর মহামারি এবং এর ফলে সৃষ্ট অর্থনৈতিক মন্দা পরিস্থিতি শ্রমিক শ্রেণীর জীবনে দুর্দশা, বিপর্যয় ও অনিশ্চয়তা প্রকট করেছে।বর্তমান বিশ্বায়িত দুনিয়ায় কোভিড-১৯ এর আঘাতে বৈশ্বিক এবং দেশজ সরবরাহ চেইন ভেঙ্গে পড়েছে। এর সাথে চাহিদার সংকোচনের ফলে উৎপাদনে স্থবিরতা ও মহামন্দার আভাস দেখা যাচ্ছে। মহামারির ফলে একদিকে প্রান্তিক শ্রমজীবিদের উদোম-অরক্ষিত জীবনের ঝুকি অপরদিকে জীবিকার অনিশ্চয়তায় শ্রমজীবী মানুষ অজানা আশংকায় দিন যাপন করছে। এ পরিস্থিতির অবসান কবে ঘটবে সে সম্পর্কে নিশ্চতভাবে আগাম কিছ ুবলা যাচ্ছে না। কোভিড-১৯ মহামারি ঠেকানোর জন্য গৃহিত হঠাত নেমে আসা ’লকডাউন’ ও ’সামাজিক দূরত’¡-এর কৌশলে একদিকে বিপর্যস্ত জীবিকা অপরদিকে জীবিকার সুরাহা না করে অপরিকল্পিত লকডাউন তুলে দিলে জীবন, জীবিকা দুটোই অনিশ্চত হয়ে যায়।
কোভিড-১৯ ভাইরাসের আক্রমন প্রকৃতি সৃষ্টি হলেও মহামারি ও মন্দার সমস্যা, বৈশিষ্ট্য ও তীব্রতাজনিত সংকট সামাজিক ও রাজনৈতিক।এটা নির্ভর করছে স্বাস্থ্যগত ব্যবস্থাপনা ও সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার ধরণের ওপর। এর অভিঘাত দেশ ভেদে যেমন বিভিন্ন, সেক্টর বা খাত ভেদেও বিভিন্নÑ এটি ভিন্নভাবে আঘাত হানছে গ্রাম-শহর, প্রবাসী শ্রমিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের জীবন ও জীবিকায়। এ অবস্থায় সবচেয়ে বেশি সংকটে রয়েছে চুক্তিভিত্তিক, দৈনিক আয়ের উপর নির্ভরশীল ও অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকরা। পরিস্থিতি মোকাবেলায় বাংলাদেশ সরকার রিলিফ সহায়তাসহ নানাধরণের প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। এ প্রেক্ষিতে কোভিড-১৯ এবং আসন্ন বাজেট ২০২০-২১ কে লক্ষ্য করে আলোচ্য অবস্থান-পত্রে আমরা শ্রমজীবীদের জন্য নীতি-কৌশল ও সুপারিশমালা উপস্থাপন করছি।
বাংলাদেশের শ্রমখাত মূলত: অনানুষ্ঠানিক ও সেবাখাত নির্ভর। ছয় কোটির বেশি শ্রমশক্তির ৮৫.১% মানুষ অসংগঠিত-অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত, যার পরিমান ৫ কোটি ১৭ লাখ।এরা একাধিক পেশায় নিয়োজিত থাকে। এরমধ্যে বড় অংশ মৌসুমি, স্বনিয়োজিত ও দৈনিক চুক্তিভিত্তিক যারা সকল প্রকার আইনি সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত। এরমধ্যে কৃষিখাতে নিয়োজিত সবচেয়ে বেশি (৪০.৬%), ২ কোটি ৮ লাখের বেশি, সেবাখাতে রয়েছে (৩৯%%) ১ কোটি ৭০ লাখ শ্রমিক, শিল্পখাতে রয়েছে (২০.৪%) ১ কোটি ১১ লাখ ৬৮ হাজারশ্রমিক। এ ছাড়া প্রবাসে প্রায়১ কোটি শ্রমিক কর্মরত রয়েছেন।
কৃষিতে স্থবিরতার ফলে কৃষিপণ্যের লাভজনক মূল্য প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে কৃষক, যার অভিঘাত পড়ছে কৃষি শ্রমিকের ওপর। প্রাতিষ্ঠানিক খাতে সবচেয়ে বেশী শ্রমিক নিয়োজিত রয়েছে রপ্তানিমুখি পোষাক শিল্পখাতে। মহামারির এ দুর্যোগের সময়েও রপ্তানিমুখি পোষাক শিল্পেখাতে স্বাস্থ্য ঝুকি নিয়ে খোলা হয়েছে কারখানা, এর সাথে ছাটাই ও লেঅফের ঘটনা ঘটছে।প্রবাসী শ্রমিকদের মধ্যে একটা অংশ দেশে ফেরত এসে বেকার হয়ে পড়েছেন, অনেকে বিদেশে কাজ হারিয়ে অনিশ্চিত জীবন যাপন করছে; কোথাও কোথাও মুখোমুখি হচ্ছে খাদ্য সংকটের ।
করোনা দুর্যোগ মোকাবেলায় সরকার প্্রায় ১ কোটি পরিবারকে ১০ কেজি চাল প্রদান করেছে ও ৫০ লাখ পরিবারকে নগদ এককালীন ২৫০০ টাকা প্রদানের কর্মসূচী গ্রহণ করেছে। এ সহায়তা অপর্যাপ্ত ও অপ্রতুল। এছাড়া ব্যাংক ঋণ নির্ভর স্বল্প সুদের ১৮টি প্যাকেজ প্রণোদনা হিসেবে মোট ১ লাখ ১ হাজার ১১৭ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে; প্যাকেজ সমূহে ৫০০০ কোটি টাকা গার্মেন্ট শ্রমিকদের বেতন সহায়ত াপ্রদান ব্যতিরেকে শ্রমিকদের জন্য কোথাও কোন প্রণোদনার প্যাকেজ নেই।
এ প্রেক্ষিতে আগামী বাজেটের লক্ষ্য হবে সকল খাতের শ্রমিকের জন্য মহামারির সময়কালে নগদ আয়-সহায়তা প্রদান, বিদ্যমান কর্মসংস্থান টিকিয়ে রাখা, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষাখাতকে দরিদ্র্য ও শ্রমিকবান্ধব হিসাবে গড়ে তোলা। এ পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে শ্রমজীবীদের জন্য আমাদের সুপারিশমালা:

  1. সকল শ্রমজীবী পরিববারের জন্য আগামী ১ বছর খাদ্য সহায়তা প্রদান করতে হবে; এজন্য শিশু-খাদ্যের সুবিধাসহ রেশন ব্যবস্থা চালু করতে হবে।
  2. অনুানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত আড়াই কোটি দরিদ্র শ্রমিক পরিবারকে আগামী ৬ মাস মাসে আট হাজার টাকা বেসিক ইনকাম গ্রান্ট প্রদান করতে হবে।
  3. অবিলম্বে শ্রম আইনের ১২, ১৬, ২০, ২৬ ধারাসমূহ স্থগিত ঘোষণা করতে হবে যাতে কারখানা বন্ধ, ছাঁটাই, লে-অফ ঘোষণা থেকে মালিকগণ বিরত থাকেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে ব্যক্তিখাত ও রাষ্ট্রায়ত্ব শিল্প-কারখানায় কোন প্রকার শ্রমিক-কর্মচারী ছাঁটাই চলবেনা, করোনাকালীন সময়ে অন্তত ৩ মাস পূর্ণ বেতন দিতে হবে।
  4. কোভিড পরিস্থিতিতে কর্মস্থলে পেশাগত নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যসুরক্ষার জন্য যথাযথ ব্যবস্থা ছাড়া কাউকে কাজে যোগ দেয়ার জন্য বাধ্য করা যাবে না। কোভিডকালীন সময়ে কাজে যোগ দেয়া সকল শ্রমিক-কর্মচারীকে ঝুঁকি ভাতা প্রদান করতে হবে।
  5. যে কোন শ্রমিকের করোনা লক্ষণ দেখা দেওয়া মাত্র তাকে কোভিড জনিত পরীক্ষা, উন্নত চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে ভর্তি ও আনুসঙ্গিক সুবিধা ও সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে। সকল শ্রমিককে স্বাস্থ্যবীমার আওতায় আনতে হবে।
  6. কোভিড পরিস্থিতিতে কাজে যোগ দেয়ার ফলে ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকের ও তার পরিবারের দায়িত্ব মালিককে নিতে হবে এবং উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
  7. সার্বজনীন সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা চালু করতে হবে; এ লক্ষ্যে জাতীয় পেশাজীবী শ্রেণী বিন্যাসকরণ ও শ্রমজীবী নিবন্ধন করে জাতীয় পেনশন স্কীম চালু করতে হবে। এজন্য বাজেটে পর্যাপ্ত বরাদ্দ প্রদান করতে হবে।
  8. শ্রমজীবীদের নিরাপত্তা ও কল্যাণে সরকার কর্তৃক শ্রমিক বন্ড চালু করার ব্যবস্থা নিতে পারে। সামাজিক বীমার প্রচলন করতে হবে।
  9. নারী শ্রমিকের পেশাগত নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়ে অগ্রাধিকার প্রদান করতে হবে।
  10. রপ্তানিমূখী শিল্প-শ্রমিকের বেতন পরিশোধের উদ্দেশ্যে প্রদত্ত সরকারি প্রণোদনা/ ঋণ-সহায়তা সরাসরি প্রকৃত উপকারভোগী তথা শ্রমিক-কর্মচারীদের কাছে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করতে হবে।
  11. শ্রমজীবীর জন্য বিশেষ হাসপাতাল চালু করতে হবে। তার আগ পর্যন্ত প্রত্যেক হাসপাতালে শ্রমজীবীদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা ও উপযোগী সেবার সময় নির্ধারণ করতে হবে।
  12. ফিরে আসা অভিবাসী শ্রমিকদের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ তথ্য ভান্ডার তৈরি, পুনরায় বিদেশ প্রেরণে সহায়তা অথবা পুনর্বাসনে সহায়তা প্রদানের জন্য কার্যকর প্রকল্প গ্রহণ।
  13. কৃষিশ্রমিক, কৃষিতে স্ব-নিয়োজিত বর্গাচাষীদের জন্য উপকরণ সহায়তা, উৎপাদিত পণ্যে নগদ ভর্তূকী প্রদানসহ কৃষিপণ্যের লাভজনক মূল নিশ্চিত করার জন্য যথাযথ বাজেট বরাদ্দ প্রদান।
  14. শিল্পাঞ্চলগুলোতে ” শিল্পশ্রমিক আবাসন এলাকা” ঘোষনা করে তাদের বাড়ী ভাড়া রেট নির্ধারণ ও তদারকির ব্যবস্থা করতে হবে। বাড়ীওয়ালাদের হোল্ডিং ট্যাক্স মাফ করে দিতে হবে। যাতে শ্রমিকেরা স্বল্পব্যয়ে বাড়ীভাড়ায় থাকতে পারে।

 

আন্তর্জাতিকক্রেতা/ব্রান্ডেরকাছেদাবি

  • ক্রেতা ও ব্রান্ডকর্তৃক করোনা কালীন সময়ে কোন কার্যাদেশ বাতিল করা যাবে না। সিএম প্রাইস কমানো যাবে না। শ্রমিকদের স্বাস্থ্য নিরাপত্তায় কল্যাণমূলক ব্যয় বৃদ্ধি করতে হবে । কেন্দ্রীয় তহবিলে ক্রেতাকর্তৃক অনুদান প্রদান নিশ্চিত করতে হবে।