জাতীয় বাজেট ২০১৭-১৮ ও কৃষিখাত ২০১৭

 

আমাদের জাতীয় জীবনে কৃষিখাত শুধুমাত্র খাদ্য সার্বভৌমত্বের প্রশ্নেই গুরুত্বপূর্ণ নয়; কৃষিখাতে নিয়োজিত রয়েছে আমাদের শ্রমমক্তির সবচেয়ে বড় অংশ। বিশ্বব্যাংকের হিসাব মতে এখনো বাংলাদেশের শতকরা প্রায় ৬৬ ভাগ মানুষের জীবন-জীবিকা কোন না কোনভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশ শ্রমশক্তি জরিপ (২০১৩) এর হিসাব মতে, দেশের মোট শ্রমমক্তির ৪৫.৭ শতাংশ এখনো কৃষিতে নিয়োজিত আছে যারা দেশের পিছিয়েপড়া দরিদ্র জনগোষ্ঠীর বৃহত্তর অংশ; যাদের জীবনযাত্রার উন্নয়ন সরাসরি কৃষির উন্নয়নের সাথে সম্পৃক্ত। কৃষিখাতের সাথে সম্পর্কযুক্ত রয়েছে গ্রামীণ উন্নয়ন, দারিদ্র্য বিমোচন এবং কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক বিকাশের দিকসমূহ; সেকারণে বাজেটে কৃষিখাতের বিশ্লেষণ ও জনঅংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কৃষিখাতে রয়েছে বাজেট বরাদ্দের স্বল্পতা, বাজেট বাস্তবায়নের সীমাবদ্ধতা, সুশাসনের অভাব, কর্পোরেট স্বার্থে প্রণীত নীতিকাঠামো ও কৃষির কাঠামোগত সংকট। একই সাথে কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য না পাওয়া, ক্রমবর্ধমান উপকরণমূল্য, কৃষি উৎপাদনপূর্ব যোগান ব্যবস্থাপনায় কর্পোরেট নিয়ন্ত্রণ, আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ক্ষুদ্র উৎপাদকদের অভিগম্যতার না থাকা এবং প্রাকৃতিক বিপর্যয় মতো কারণগুলো বিদ্যমান রয়েছে। ফলে কৃষিতে নিয়োজিত বিপুল গ্রামীণ জনগোষ্ঠী প্রায় অলাভজনক উৎপাদন সম্পর্কের শৃঙ্খলে আবদ্ধ রয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনীতি কৃষি, তৈরি পোশাক, আর বিদেশি থেকে প্রেরিত অর্থের ওপর দাঁড়িয়ে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার স্বপ্ন দেখলেও খাদ্য নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে কৃষির গুরুত্বপূর্ণ অবদান অনস্বীকার্য।

কৃষিখাতের সাম্প্রতিক অবস্থা
বর্তমান সরকার তাদের প্রথম মেয়াদে ক্ষমতায় আসীন হওয়ার পর কৃষি ও গ্রামীণ উন্নয়ন এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পোন্নয়ন (এসএমই)-কে অগ্রাধিকারযোগ্য খাত হিসেবে চিহ্নিত করেছিল, যা ছিল অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। এছাড়া সরকারের পক্ষ থেকে খাদ্য নিরাপত্তাকেও সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল যার ফল হিসেবে দেশ আজ দানাদার খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা (!) অর্জন করেছে। বর্তমানে দেশে ফসল ও মৎস্যসহ কৃষি উৎপাদন অনেকাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে। সরকার দেশের মৃতপ্রায় পাটখাতের পুনরুজ্জীবনে বেশকিছু ভাল পদক্ষেপ নিয়েছিল। দেশের কৃষির স্থায়িত্বশীল উন্নয়নে “একটি বাড়ি একটি খামার” ও “সমন্বিত কৃষি উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি প্রকল্প”-এর মত বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে “বাংলাদেশ কান্ট্রি ইনভেস্টমেন্ট প্লান (সিআইপি ২০০৯) প্রণয়ণ ও বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছিল। সরকারের এসব উদ্যোগসমুহকে আমরা সাধুবাদ জানাই। কিন্তু কৃষিখাতের নি¤œমুখী প্রবৃদ্ধির ধারা সরকারের এ উদ্যোগসমূহের ফলাফল ও কার্যকারিতা প্রশ্নের মুখে ফেলছে। ফলে সরকারের এসব নীতি কতটা কৃষিবান্ধব সেটা নিয়ে প্রশ্ন তোলার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। গত ছয় বছরের ব্যবধানে কৃষিখাতে প্রবৃদ্ধি ৬.৫৫% থেকে কমে ১.৫৩% -এ নেমে এসেছে। এর মধ্যে শস্য ও শাকসবজি’র প্রবৃদ্ধির হার সবচেয়ে কম, ৭.৫৭% থেকে কমে ০.৫%-এ নেমে এসেছে।

চিত্র-১: কৃষিখাতে জিডিপিপ্রবৃদ্ধির শতকরা হার (২০০৯-১০ থেকে ২০১০-১৬)

সূত্র: বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০১৬

সরকার দাবি করছে, সরকার গৃহীত কৃষিবান্ধব নীতির ফলেই কৃষিতে অভাবনীয় সাফল্য এসেছে; এবং সেটির ওপর ভিত্তি করে সরকার দেশের সাত শতাংশের ওপর প্রবৃদ্ধি অর্জন এবং মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার স্বপ্ন দেখাচ্ছে। কিন্তু কৃষিখাতের নি¤œমুখী প্রবৃদ্ধির ধারা সরকারের বাস্তবানাধীন নীতিগুলো কতটা কৃষকবান্ধব সেটা নিয়ে প্রশ্ন তোলার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।

জাতীয় বাজেটে কৃষিখাত
বাজেটের খাতভিত্তিক বরাদ্দের ক্ষেত্রে কৃষিখাতের গুরুত্ব স্বীকৃত নয়। প্রতিবছর জাতীয় বাজেটের আকার দ্রুতহারে বাড়লেও জাতীয় বাজেটে কৃষি ও তৎসংশ্লিষ্ট খাতের বরাদ্দ ক্রমহ্রাসমান, যা অত্যন্ত হতাশাজনক (চিত্র-২ ও ৩)।

চিত্র-২: মোট জাতীয় বাজেট (হাজার কোটি টাকায়), ২০০৯-১৭

সূত্র : বিভিন্ন বছরের বাজেটের সংক্ষিপ্তসার

চিত্র -৩: কৃষিখাতে জাতীয় বাজেট বরাদ্দের শতকরা হার, ২০০৯-২০১৭

সূত্র : বিভিন্ন বছরের বাজেটের সংক্ষিপ্তসার

২০০৯-১০ অর্থবছরে জাতীয় বাজেটের আকার ছিল ৯৪ হাজার কোটি টাকা, ২০১৬-১৭ অর্থ বছরে তা বেড়ে ৩ লক্ষ ৪১ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। পক্ষান্তরে, ২০০৯-১০ অর্থবছরে জাতীয় বাজেটে কৃষি ও সংশ্লিষ্ট খাতের অংশ ছিল ১০.৯ শতাংশ, চলতি ২০১৬-১৭ অর্থ বছওে তা ৬.৭ শতাংশে নেমে এসেছে। অন্যদিকে, চলতি ২০১৬-১৭ অর্থবছরে কৃষি মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দ ছিল ১৩ হাজার ৬৭৫ কোটি টাকা যা পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় ৯৭৬ কোটি টাকা (৭.৭%) বেশি; কিন্তু মোট বাজেটের শতকরা অংশ হিসাবে তা পূর্ববর্তী অর্থবছরের তুলনায় ০.৩% কম। অন্যদিকে মন্ত্রনালয়ের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থের ৮৬% ব্যয় হয় উন্নয়ন খাতে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে কৃষিখাতের অংশ মাত্র ৪.৬ শতাংশ যা ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ছিল ৫.৭ শতাংশ এবং ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ছিল ৫.১ শতাংশ। চলতি ২০১৬-১৭ অর্থবছরে কৃষিতে ভর্তুকির পরিমাণ পূর্ববর্তী বছরের সমান ৯ হাজার কোটি টাকা হলেও সেই বছরে এই খাতে প্রকৃত ব্যয় করা হয়েছে ৭ হাজার কোটি টাকা ।

সরকারি কৃষি সহায়তা : বঞ্চিত হয় বর্গাচাষী ও ক্ষুদ্র কৃষকরা
বাংলাদেশে এখন বেশিরভাগ জমির মালিকা নিজে চাষ করেন না। বর্গা বা নগদ টাকায় জমি লিজ নিয়ে চাষাবাদ কৃষির প্রধান (৫৪%) বৈশিষ্ট্য (চিত্র-৪)। অপরদিকে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক মোট কৃষকের ৮০ শতাংশের বেশি (চিত্র-৫)। ফসল উৎপাদনে প্রধান ভূমিকা পালন করছে বর্গাচাষী, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকরা। ফলে জাতীয় বাজেট বর্গাচাষী, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকদের সমস্যা সমাধানে ভূমিকা রাখতে পারছে না। সরকারি সুবিধা, কৃষি-উপকরণ বন্টন ব্যবস্থা নীতিমালায় বর্গাচাষীদের বিষয়টি উপেক্ষিত থাকছে।

চিত্র ৪: জমিচাষের ধরণের প্রেক্ষিতে বাংলাদেশে কৃষকের বৈশিষ্ট্যচিত্র

৫: জমি মালিকানার বাংলাদেশে কৃষকের বৈশিষ্ট্য

সূত্র : Bangladesh Integrated Household Survey 2013Bangladesh Integrated Household Survey 2013

অপরদিকে ক্ষুদ্র কৃষকরা তেমনভাবে সরকারি কৃষিসহায়তা পান না। আন্তর্জাতিক খাদ্যনীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আএফপিআরআই) জরিপ অনুযায়ী মাত্র ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের মাত্র ২৭ শতাংশ কৃষি সম্প্রসারণকর্মীদের সেবা পেয়ে থাকে; অন্যদিকে বড় কৃষকদের মধ্যে এ সেবা পাচ্ছেন ২৮ শতাংশ কৃষক। সেচের ভর্তুকির সম্পূর্ণ সুবিধা সেচযন্ত্রের মালিকের পকেটে যাচ্ছে; কৃষককে সেচবাবদ ভাড়া হিসাবে উৎপাদিত ধানের চারভাগের একভাগ প্রদান করতে হয়। অপরদিকে ২০১৫ সালে বিতরণকৃত কৃষিঋণের ৫.২% পেয়েছেন প্রান্তিক কৃষক, ৯.১% পেয়েছেন ক্ষুদ্র কৃষক। অন্যদিকে বড় কৃষক পেয়েছেন ১৪.৬% এবং মাঝারি কৃষক পেয়েছেন ১২.১%। সরকারি সুবিধা বন্টন ব্যবস্থায় কৃষির কাঠামোগত বিষয়টি যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয় না ।

ধান/গমের সরকারি মূল্য সহায়তায় লাভবান হন না কৃষক

সরকারি নীতি ও কর্মপরিকল্পনায় এবং জাতীয় বাজেটে দানাদার খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন যতটা গুরুত্ব পেয়েছে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও সংখ্যাগরিষ্ট কৃষক জনগোষ্ঠী বিশেষ করে ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও ভূমিহীন কৃষকের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের বিষয়টা ততটা গুরুত্ব পায়নি। পক্ষান্তরে, ভোক্তার জন্য চালের মূল্য কম রাখতে সরকার যতটা তৎপর কৃষকের জন্য লাভজনক মূল্য নিশ্চিত করতে তার কিয়দাংশও দেখা যায় না। পর্যবেক্ষণে দেখা যাচ্ছে সরকারি প্রায় সব নীতি ও পরিকল্পনায় ক্ষ্রুদ উৎপাদকদের চাইতে ব্যবসায়ীদের পরিসরকে বিস্তৃত করেছে।খাদ্য স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে যাদের মূখ্য অবদান সেই কৃষকরা ক্রমাগতভাবে তার উৎপাদিত ফসলের লাভজনক মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। দেশের ব্যবসায়ী মহল এবং বৈদেশিক দাতা সংস্থাগুলোর পরামর্শে গৃহীত নীতির ফলে অবাধ বাণিজ্য প্রতিযোগিতায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে প্রান্তিক ক্ষুদ্র কৃষকরা। উৎপাদন বাড়লেও উৎপাদন উপকরণের মূল্য বৃদ্ধি ও পণ্যের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় কৃষকরা কৃষি থেকে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন। অপরদিকে খাদ্যশস্য ধান/গম ক্রয়ের মাধ্যমে সরকারি মূল্য সহায়তায় মিল মালিকরাই লাভবান হন। তাছাড়া সরকারি ক্রয়মূল্য চলতি বাজার দরের চেয়ে কখনো কখনো কম থাকে। সরকারি ক্রয়মূল্য কম থাকায় এ বছর মিল মালিকরা সরকারি গুদামে চাল দিতে রাজী হচ্ছেন না। বর্তমানে বাজারে প্রতিকেজি চালের পাইকারি মূল্য ৪৪ থেকে ৪৫ টাকা। আর সরকার প্রতি কেজি চালের সংগ্রহ মূল্য ঠিক করেছে ৩৪ টাকা।

আমরা অত্যন্ত হতাশার সাথে লক্ষ করেছি ২০১৫ সালে উদ্বৃত্ত চাল শ্রীলংকায় রপ্তানি করা সত্ত্বেও প্রায় সাড়ে চৌদ্দ লক্ষ টন চাল ভারত থেকে আমদানি করা হয়েছিল যা সেই বছর ধানের মূল্য হ্রাসে ব্যাপক ভূমিকা পালন করেছে। সরকারি এসব নীতি থেকে এটা স্পষ্ট যে, ব্যবসায়ী ও ভোক্তা স্বার্থ সংরক্ষণে সরকার যতটা উদ্যোগী কৃষকের স্বার্থ সংরক্ষণে ততট নয়।

বিগত বাজেটগুলোতে কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার পদক্ষেপ হিসেবে ‘কৃষক বিপণন দল’ ও ‘কৃষক ক্লাব’ গঠন এবং গ্রোয়ার্স মার্কেট স্থাপনের যে সাফল্যের কথা তুলে ধরা হয়েছে তা প্রকৃতপ্রস্তাবে কতটা সফল তা নিয়ে ইতোমধ্যেই প্রশ্ন উঠেছে। কৃষির ঢালাও বাণিজ্যিকীকরণের ফলে এবং ক্রুটিপূর্ণ বর্তমান মুক্ত বাজার ব্যবস্থায় মাথার ঘাম পায়ে ফেলে কৃষক যা উৎপাদন করে তার লভ্যাংশটুকু লুটেপুটে নেয় মধ্যস্বত্বভোগীরা যেখানে কৃষক তার উৎপাদন ব্যয়টাও উঠাতে পারে না। অন্যদিকে, ভর্তুকি বা ঋণ হিসেবে যা বরাদ্দ দেওয়া হয় তাও একশ্রেণীর সুবিধাভোগীদের পকেটে চলে যায়। কাজেই, শুধু কিছু গ্রোয়ার্স মার্কেট নির্মাণ করে এই জটিল সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়। এজন্য প্রয়োজন বর্তমান বাজার ব্যবস্থার আমূল সংস্কার যার কোন দিকনির্দেশনা বিগত বাজেটগুলোতে পাওয়া যায়নি।

সরকারি নীতি খাদ্য নিরাপত্তাকে ঝুঁকিতে ফেলছে
অন্যদিকে, দানাদার খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জিত হলেও খাদ্য নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্যের নিশ্চয়তা আজও সুদুর পরাহত। কারণ, খাদ্য উৎপাদনে প্রায় ৪৩ লাখ টন রাসায়নিক সার ও প্রায় ৪৮ হাজার টন রাসায়নিক বালাইনাশক ব্যবহার করা হচ্ছে । পক্ষান্তরে, মানুষ আজ পেট পুরে খেতে পারলেও “পুষ্টিহীনতাজনিত গুপ্ত ক্ষুধা (হিডেন হাঙ্গার)”-এ ভূগছে দেশের বিপুল সংখ্যক মানুষ। অথচ এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, কেবল খাদ্য উৎপাদন বাড়ালেই যেমন খাদ্য নিরাপত্তা যেমন নিশ্চিত হয় না। অপরদিকে খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় না রেখে সরকার খাদ্য থেকে জ্বালানি তৈরির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। খাদ্যশস্য পুড়িয়ে ইথানল উৎপাদনের পরিকল্পনা করছে সরকার। এতে কাাঁচামাল হিসাবে চালের খুদ, ভূট্টা ও চিটাগুড়ের ব্যবহার খাদ্য নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলবে।

কর্পোরেট কৃষি ধ্বংস করছে হাজার বছরের কৃষি
জাতীয় কৃষি নীতি ২০১৩ এবং ষষ্ঠ ও সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় কৃষির বাণিজ্যিকীকরণকে মূল বিবেচনায় রাখা হয়েছে। এই পরিকল্পনায় কৃষির বাণিজ্যিকীকরণের ওপর জোর দেয়া দিয়ে খামারভিত্তিক চাষাবাদকে উৎসাহীত করেছে; যেমন পোল্ট্রি খামার, মৎস্য খামার, দুগ্ধ খামার ইত্যাদি। বিদেশি ও হাইব্রিড জাতনির্ভর এরূপ খামারভিত্তিক চাষাবাদে ধ্বংস হচ্ছে দেশের হাজার বছরের স্থায়িত্বশীল কৃষি। একই সাথে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়েছে ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষকরা। সরকার একদিকে জলবায়ু সহনশীল ও স্থায়িত্বশীল কৃষির কথা বললেও “হাই ইনপুট, হাই আউটপুট” কৃষি উৎপাদন প্রযুক্তি সম্প্রসারণে সর্বশক্তি নিয়োজিত করা হয়েছে। কিন্তু কৃষি অর্থনীতির “ক্রমহ্রাসমান উৎপাদন বিধি” বিবেচনায় নিলে এরূপ কৃষি উৎপাদন উপকরণের (যেমন: রাসায়নিক সার, বালাইনাশক, হরমোন, ভিটামিন ইত্যাদি) ব্যবহার ক্রমাগতভাবে বৃদ্ধির ফলে একটা পর্যায় পর্যন্ত উৎপাদন বাড়লেও এক সময় স্থিতাবস্থায় পৌছানোর পর উৎপাদন ক্রমশ: হ্র্রাস পেতে থাকে। অর্থাৎ উৎপাদন ব্যয় ক্রমশ: বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে কৃষি আর কৃষকের জন্য লাভজনক থাকেনা। এ জাতীয় কৃষি ব্যবস্থায় কৃষি উপকরণ-সরবরাহকারি কোম্পানি এবং ব্যবসায়ীরা ব্যাপকভাবে লাভবান হলেও উৎপাদক কৃষক লাভবান হয় না। বস্তুত: আমরা এখন তথাকথিত উন্নত দেশের কৃষির মডেল অনুসরণ করছি যা হাজার হাজার ডলার ভর্তুকি দিয়ে টিকিয়ে রাখা হয়েছে। এই কারণেই মাত্র এক/ দেড় দশকের ব্যবধানে দেশের পোল্ট্রি চাষীদের এখন টিকে থাকার জন্য ভর্তুকি দাবি করতে হচ্ছে।

এমতাবস্থায়, সরকারের উচিত এদেশের প্রান্তিক কৃষকের আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নয়ন ও সাধারণ মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাণিজ্যিক দৃষ্টিভঙ্গী থেকে সরে এসে ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষকের স্বার্থে প্রয়োজনীয় নীতি প্রণয়ন এবং সে অনুযায়ী জলবায়ু সহনশীল স্থায়িত্বশীল কৃষি পুনপ্রতিষ্ঠায় সরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা জরুরি।

জাতীয় কৃষিবাজেটকে কৃষকবান্ধব করতে কিছু সুপারিশ ও কৃষকের দাবীসমূহ:
১. জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে খাদ্য উৎপাদনের স্বার্থে মাটির স্থায়িত্বশীল উৎপাদনশীলতা বজায় রাখার জন্য অপরিহার্য জৈব সার ব্যবহার বৃদ্ধিসহ জলবায়ু সহিঞ্চু স্থায়িত্বশীল কৃষি (ঈষরসধঃব জবংরষরবহঃ ঝঁংঃধরহধনষব অমৎরপঁষঃঁৎব-ঈজঝঅ) চর্চাকে উৎসাহিত করার জন্য সরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং বিশেষ প্রণোদনার ব্যবস্থা করতে হবে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাধ্যমে জলবায়ুসহিঞ্চু স্থায়িত্বশীল কৃষিচর্চার কৌশল ও দক্ষতা বৃদ্ধিতে প্রশিক্ষণ এবং গবেষণাখাতে বরাদ্দ রাখতে হবে।
২. কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার জন্য চলমান উৎপাদন ও বাজার ব্যবস্থার সংস্কারের উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। এজন্য আধুনিক বাজার ব্যবস্থাপনা সম্বলিত কৃষকদের ‘উৎপাদন ও বিপণন সমবায়’ গড়ে তুলতে হবে। প্রকৃত কৃষক সমবায়ের মালিকানায় এসএমই আকারে কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প ও হিমাগার স্থাপন করতে হবে। “শস্য গুদাম ঋণ প্রকল্প”কে পুনরুজ্জীবিত করে ‘শস্য সংরক্ষণ ঋণ’ চালু করতে হবে। পাশাপাশি, কৃষিপণ্যের আগাম মূল্য নির্ধারণে সরকার-উৎপাদক-ভোক্তা সমন্বয়ে মূল্য কমিশন গঠন করতে হবে।
৩. ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও ভূমিহীন কৃষকদের জন্য সুদবিহীন বা স্বল্পসুদে মৌসুমভিত্তিক কৃষিঋণ সহজলভ্য করতে হবে এবং নারী কৃষকদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি প্রদানের মাধ্যমে ঋণসহ সকল সরকারি সেবা ও প্রণোদনায় নারী কৃষকদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে; এবং তারজন্য বাজেটে নির্দেশনা রাখতে হবে।
৪. বর্গাচাষী, ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও ভূমিহীন কৃষকদের জন্য সরকারি সুবিধা ও উপকরণ সহায়তা প্রদানের জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
৫. প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক ঘোষিত “লাঙ্গল যার জমি তার” নীতির ভিত্তিতে দেশের ভূমি মালিকানা ব্যবস্থার আমূল সংস্কার করতে হবে। এজন্য “ভূমি ব্যাংক” ব্যবস্থা চালু করে অনুপস্থিত ভূমিমালিকদের কাছ থেকে জমি “ভূমি ব্যাংকে” জমা নিয়ে তা প্রকৃত কৃষকদের জন্য সহজলভ্য করতে হবে। পাশাপাশি, ভূমি জরিপ আধূনিকীকরণ ও ডিজিটাইজেশন, ভূমি ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন ও ভূমি সংস্কারে সরকারকে অগ্রণী ভূমিকা নিতে হবে। কৃষিজমি সুরক্ষা আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
৬. দেশের মৃতপ্রায় নদীগুলোকে বাঁচাতে হবে এবং নদীর পানিভিত্তিক সেচ ব্যবস্থাকে পুনরুজ্জীবিত করতে হবে। পাশাপাশি, নদী-নালা, খাল-বিল, হাওড়-বাওড়সহ সকল সকল জলাশয়ে প্রকৃত মৎস্যজীবিদের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক ঘোষিত “জাল যার জলা তার” নীতির আশু বাস্তবায়ন করতে হবে।
৭. দেশীয় গরু-ছাগল-মহিষ-ভেড়া এবং হাস-মুরগির বাণিজ্যিক উৎপাদন ও বিপণনে সরকারি সেবা ও প্রণোদনা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি, বিদ্যমান পোল্ট্রি শিল্প ও প্রাণী সম্পদখাত উন্নয়নে রাষ্ট্রীয় প্রণোদনা বৃদ্ধি করতে হবে।
৮. সার, বীজ, সেচ কাজে ভর্তুকি প্রদানের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি জলবায়ু সহনশীল স্থায়িত্বশীল কৃষি প্রযুক্তি তথা জৈব সার, বালাইনাশক, আইপিএম-এর মত জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশবান্ধব কৃষি প্রযুক্তি সম্প্রসারণে রাষ্ট্রীয় প্রণোদনা ও ভর্তুকি দিতে হবে এবং এই ভর্তুকির সুবিধা যাতে সরাসরি নারী কৃষকসহ প্রকৃত কৃষকরা পায় তার বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নিতে হবে। নারী কৃষিশ্রমিককের জন্য রাষ্ট্রীয় সেবা ও অর্থনৈতিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে কৃষি নীতিমালায় নারী কৃষকদের কৃষি উপকরণ ও জামানতবিহীন ঋণ প্রদান সম্পর্কে সুস্পষ্ট বিধান রাখতে হবে এবং নারীবান্ধব কৃষি গবেষণায় বিনিয়োগ করতে হবে।
৯. খাদ্যশস্য পুড়িয়ে বায়োফুয়েল উৎপাদনের আতœঘাতি সিদ্ধান্ত অবিলম্বে বাতিল করতে হবে।
১০. কৃষকদের সংগঠন তৈরির মাধ্যমে কৃষি ফসল অঞ্চলভিত্তিক বীজ উৎপাদন ও সংরক্ষণ করতে হবে। কৃষি বাজারসমূহ কৃষকের ব্যবহার উপযোগী করে তোলার জন্য অবকাঠামোগত সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে এবং কৃষক সংগঠনের দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে বৈদেশিক বাজারে উচ্চমূল্যে ফসল রপ্তানির সুযোগ সৃষ্টিতে সহায়তা করতে হবে।
১১. সরকারিভাবে ধান ক্রয়ের ক্ষেত্রে সরকার নির্ধারিত ডিলারের কাছে কৃষকেরা যাতে সরাসরি ধান বা কৃষি সমবায়গুলো তাদের প্রক্রিয়াজাতকৃত চাল বিক্রি করতে পারে তা নিশ্চিত করতে হবে। সঠিক মূল্য নিশ্চিত করতে মাঠ পর্যায়ে সরকারের প্রতিনিধির উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে এবং ধানের দাম সরাসরি কৃষকের বা কৃষক সমবায়ের ব্যাংক হিসাবে ট্রান্সফার করতে হবে।
১২. জাটকা মাছ নিধন রোধসহ সমুদ্রগামী মৎস্যজীবীদের দুর্যোগজনিত পুনর্বাসন কর্মসুচিতে বাজেটে বরাদ্দ বাড়াতে হবে। হাওড়-বাওড়, বিল অঞ্চলে পরিকল্পিত মৎস্য চাষে উৎসাহিত করতে মৎসজীবীদের প্রণোদনা ও সক্ষমতা বাড়াতে হবে। ইজারাকৃত মরা নদী ও বিলের পানি শুকিয়ে মাছ আহরণের ফলে ধীরে ধীরে মা মাছ ধ্বংস করে ফেলার প্রবণতা বন্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
১৩. শুধু বীজ নয়, সকল প্রকার কৃষি উপকরণের বাণিজ্য একচেটিয়াভাবে মুনাফালোভী কোম্পানির হাতে ছেড়ে না দিয়ে বৃহদাংশ বিএডিসির হাতে রাখার জন্য সংস্থাটিকে আরো শক্তিশালী করতে হবে; এ জন্য বাজেটে পর্যাপ্ত বরাদ্দ প্রদান করতে হবে।
১৪. মেধাপাচার রোধ করে গবেষণা কার্যক্রম আরও জোরদার করার জন্য কৃষিগবেষণা ও কৃষিশিক্ষায় বরাদ্ধ বৃদ্ধি করতে হবে।
১৫. যে কোনো ধরণের দুর্যোগের ক্ষতির হাত থেকে রক্ষার জন্য ক্ষুদ্র কৃষকদের শস্য বীমার আওতায় আনতে হবে।

 

কৃষিবিদ শহীদুল ইসলাম, সদস্য, খাদ্য নিরাপত্তা নেটওয়ার্ক (খানি)