প্রতিবন্ধীবান্ধব জাতীয় বাজেট ২০১৭-১৮ ২০১৭

বাংলাদেশ জাতিসংঘ প্রবর্তিত স্থায়ীত্বশীল উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDGs) এজেন্ডা ২০৩০ বাস্তবায়নে ইতোমধ্যে ৭ম পঞ্চমবার্ষিক পরিকল্পনার দলিলের সাথে সঙ্গতি রেখে একটি উন্নয়ন ফলাফল কাঠামো ((Development Result Framework) তৈরি করেছে। এ প্রস্তুততিমূলক পদক্ষেপের দৃষ্টিকোণ থেকে ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেট তাৎপর্যপূর্ণ। আশা করা হচ্ছে, চলতি পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার মেয়াদের বছরগুলোতে স্থায়ীত্বশীল উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার মূল চেতনা ‘বাদ যাবে না কেউ’এর সুনির্দিষ্ট প্রতিফলন ঘটবে বছরওয়ারী বাজেট দলিলে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের আশা-আকাক্সক্ষা পূরণের মধ্য দিয়ে। আর এ আশা- আকাক্সক্ষার কতটুকু প্রতিফলন ঘটবে তা নির্ভর করছে তিনটি বিষয়ের ওপরÑ ১) নীতি পরিবেশ ও জাতীয় অগ্রাধিকার ২) প্রাতিষ্ঠানিক আয়োজন এবং ৩) অর্থ-সম্পদ বরাদ্দ প্রক্রিয়া।

জাতীয় অগ্রাধিকারের দৃষ্টিকোণ থেকে শিক্ষা ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৭৭,৬৭০ (২০১৭ সাল) এবং ৭৮০৫২ (২০১৮ সাল) যা আশাব্যঞ্জক। কিন্তু শিক্ষা প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জীবনের একমাত্র ক্ষেত্র নয়। স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থানসহ অন্যান্য ক্ষেত্রেও প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অন্তর্ভুক্তিপ্রয়োজন যা উন্নয়ন ফলাফল কাঠামোয় (Development Result Framework) অনুপস্থিত। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ(সিপিডি)-এর গবেষণা মতে, বাংলাদেশ সরকারের জাতীয় অগ্রাধিকার প্রক্রিয়ার ১৭টি SDGs এর মধ্যে মাত্র ৮টি ভালোভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অবশিষ্ট যেসব ক্ষেত্র বা বিষয় উপেক্ষিত রয়েছে সেগুলোর মধ্যে স্বাস্থ্য, অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান এবং সুশাসন অন্যতম এবং এগুলো প্রতিবন্ধী অন্তর্ভুক্তিমূলক SDGs এর বিষয় – এ সম্পর্কে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই।

নীতিপরিবেশ ও আইনগত কাঠামোর ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের বিষয়ে অগ্রগতিও আশাব্যঞ্জক। উদাহরণস্বরূপ, নিউরো ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধী সুরক্ষা আইন ২০১৩ এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন ২০১৩ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য সহায়ক আইনী কাঠামো ও নীতি পরিবেশ সৃষ্টি করেছে।এরূপ পরিবেশ থাকা সত্ত্বেও বিরাজমান আইনের বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া তথা বিধিমালা প্রণয়ন করা হয়নি বিধায় জাতীয় আইনের অগ্রাধিকারের মধ্যে এখনো প্রতিবন্ধীবান্ধব পদক্ষেপ সুক্ষ্মভাবে তুলে ধরা হয়নি। যদিও কিছু প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা ইতোপূর্বে নেয়া হয়েছে, কিন্তু তা ফলপ্রসূ হয়নি। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে, ২০০৭ সালের নির্বাহী আদেশবলে ৪৬টি মন্ত্রণালয়ে প্রতিবন্ধিতা বিষয়ে ফোকাল পয়েন্ট এর ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু ফোকাল পয়েন্টের বিশেষ দায়িত্ব ও কর্তব্য তথা বিধিমালার অনুপস্থিতির কারণে এ মন্ত্রণালয়সমূহের পরিকল্পনায় প্রতিবন্ধীবান্ধব কর্মসূচি নিশ্চিত করার বিষয়টি এখনো সময়ের অপেক্ষায় রয়েছে।

উন্নয়ন চালচিত্রে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির এ অবস্থানের পেছনে মূল যে বিষয়টি দায়ী সেটি হচ্ছে প্রতিবন্ধিতা ইস্যুটির প্রচলিত চিকিৎসামূলক মডেল (Medical model) থেকে সামাজিক মডেল (Social model) এ উত্তরণ ঘটেনি। তাই যদি UNCRPD (United Nation Convention on the Rights of Persons with Disabilities) এর মতো অধিকার ভিত্তিক আইনী কাঠামো আমাদের সামনে রয়েছে তথাপি উন্নয়ন পরিকল্পনায় সেবাগ্রহীতার বাইরে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ক্ষমতায়ন ওঅধিকার বিষয়টির সুনির্দিষ্ট রূপরেখা তৈরি হয়নি। সামাজিক মডেলের আলোকে প্রতিবন্ধীবান্ধব পরিকল্পনার রূপরেখা তৈরি করতে হলে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের impairments, activity limitations এবং participation restrictions এ তিনটি পস্পর সম্পর্কযুক্ত বাস্তবতাকে বিবেচনায় আনা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে দ্বিস্তরভিত্তিক পদ্ধতি (twin-track approach) বা সমাজভিত্তিক পুনর্বাসন প্রক্রিয়া অনুসরণ করা প্রয়োজন। দ্বিস্তরভিত্তিক উন্নয়ন পদ্ধতি বা দৃষ্টিভঙ্গী অনুযায়ী অপ্রতিবন্ধী মানুষের তুলনায় প্রতিবন্ধী ব্যক্তির উন্নয়নে অর্থায়নও আলাদাভাবে বিবেচনায় আনা প্রয়োজন। কেননা, উন্নয়নের মূল ধারায় প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে অন্তর্ভুক্ত করতে হলে অপ্রতিবন্ধী মানুষের তুলনায় অতিরিক্ত বা সহায়ক ব্যয় আনা জরুরি যা অমর্ত্য কুমার সেন Conversion handicap নামে অভিহিত করেছেন।

উপর্যুক্ত বিষয়গুলো উন্নয়ন ভাবনায় না থাকার কারণে অর্থসম্পদ বরাদ্দ প্রক্রিয়ার কাঠামোগত দুর্বলতা এখনো রয়ে গেছে যা বিগত ৫ বছরের জাতীয় বাজেটে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির জন্য বরাদ্দকৃত তথ্য উপস্থাপন থেকে সুস্পষ্ট হবে।
সারণি ১: প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী বাজেটের গত ৫ বছরের তুলনামূলক চিত্র:

উপরের সারণি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য একদিকে যেমন বাজেটের পরিমান ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে তেমনি বাজেটে নতুন নতুন ক্ষেত্র সংযোজিত হচ্ছে। কিন্তু লক্ষনীয় বিষয় হচ্ছে বাজেটে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রধানত সেবাগ্রহীতা হিসেবে দেখা হচ্ছে। এছাড়া শিক্ষা ব্যতিরেকে অন্যান্য ক্ষেত্র যেমন স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান ইত্যাদি বিষয়ে বাজেটে সরাসরি কোন উল্লেখ নাই। এখানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, কেবলমাত্র শারীরিক ও বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী ছাড়া অন্যান্য সকল ধরনের প্রতিবন্ধী (দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী, শ্রবণ প্রতিবন্ধী, বাকপ্রতিবন্ধী প্রভৃতি) ব্যক্তির চাহিদা বাজেটে প্রতিফলিত হয়নি।সর্বোপরি, বাজেটের আকার ও ক্ষেত্র প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য বাড়ানো হলেও এখনও পর্যন্ত বরাদ্দের অর্থ গতানুগতিক কিছু ভাতা ও সুবিধার মধ্যে সীমিত রয়েছে। উপরন্তু, ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির ক্ষমতায়ন বা অধিকারের বিষয়ে কোনো কর্মসূচি নাই। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য বাজেট একবোরেই নেই বললেও ভুল হবে।
নীচের লেখচিত্র অনুযায়ী, ২০১২-১৩ থেকে ২০১৬-১৭ পর্যন্ত ৫ বছরের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সামাজিক নিরাপত্তা ও সামাজিক ক্ষমতায়ন খাতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে। উল্লেখ্য, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য গৃহিত কার্যক্রমের বরাদ্দও এই খাতের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের বরাদ্দ সামাজিক নিরাপত্তা ও সামাজিক ক্ষমতায়ন খাতের বরাদ্দের মাত্র ১.৬৭% যা বিগত ২০১৫-১৬ সালে ছিল ১.৪%, ২০১৪-১৫ সালে ১.০৭%, ২০১৩-১৪ সালে ০.৬৪% এবং ২০১২-১৩ সালে ০.৫৭%। যদিওসামাজিক নিরাপত্তা ও সামাজিক ক্ষমতায়ন সম্পর্কিত বাজেট লাইনে এ সংক্রান্ত বরাদ্দ আনুপাতিকভাবে বছরওয়ারি বেড়েছে, প্রতিবন্ধী ব্যক্তির চাহিদার তুলনায় তা খুবই অপ্রতুল। অন্যদিকে সামাজিক নিরাপত্তা ও সামাজিক ক্ষমতায়ন সম্পর্কিত বাজেট লাইনে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের উন্নয়নের জন্য কার্যক্রম অন্তভুক্ত থাকার কারণে তাদের বিশেষায়িত ক্ষমতায়নের দিকগুলো সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে না।
লেখচিত্র ১: সামাজিক নিরাপত্তা ও সামাজিক ক্ষমতায়ন এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য বাজেট (কোটি টাকায়)

বাজেটে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির চাহিদার প্রতিফলন ঘটাতে হলে সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন আনা দরকার। অন্যকথায়, গতানুগতিক ধারায় কল্যানমূলক বা সেবামূলক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তে সামাজিক মডেল বা সমাজভিত্তিক পুনর্বাসনের (Community Based Rehabilitation) বিষয়টি গুরুত্বেও সাথে বিবেচনা করতে হবে। এছাড়া বরাদ্দের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির চাহিদা অপ্রতিবন্ধী ব্যক্তির চাহিদা থেকে বিবেচনায় আনতে হবে। এইসব বিবেচনায় প্রতিবন্ধীবান্ধব বাজেট প্রণয়ন তিনটি পূর্বশর্তের উপর ভিত্তিশীল হওয়া বাঞ্ছনীয়।
১. প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার বিষয়ে বিরাজমান বিধিমালা অনুসরণ
২. সামাজিক মডেল তথা সমাজভিত্তিক পুনর্বাসন (Community Based Rehabilitation) অনুসরণ
৩. বিরাজমান বিধিমালা ও সমাজভিত্তিক পুনর্বাসনের আলোকে বাজেট কর্মসূচি প্রণয়নে দ্বি-স্তর ভিত্তিক অর্থায়ন (Twin Track Financing)
উপযুক্ত দুটি নীতিমালার আলোকে প্রতিবন্ধীবান্ধব বাজেট সম্পর্কিত বিশেষ সুপারিশসমূহ প্রদত্ত হলো:

ক. সরকারের চলমান কার্যক্রমে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্তকরণ সম্পর্কিত সুপারিশমালা
সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় ১৪৫ টি কার্যক্রম রয়েছে। এগুলো বাস্তবায়ন করছে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ। এ সকল কার্যক্রমে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্তকরণে অগ্রাধিকার প্রদান করতে হবে। এক্ষেত্রে মাননীয় অর্থ মন্ত্রী বাজেটে যথাযথ নির্দেশনা প্রদান করতে পারেন। উদাহারণস্বরুপ কয়েকটি সুপারিশ নি¤েœ উপস্থাপন করা হলো-

  • মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আওতায় পরিচালিত সকল প্রশিক্ষণ কার্যক্রম, আত্মকর্মসংস্থানের জন্য ক্ষুদ্র ঋণ, দরিদ্র মা’র জন্য মাতৃত্বকালীন ভাতা, শহর অঞ্চলে কর্মজীবি ল্যাকটেটিং মাদার সহায়তার জন্য ভাতা, ভিজিডি কর্মসূচী, ভিজিডি (ইউপি), খাদ্য ও জীবিকা নিরাপত্তা প্রকল্প, নারী উদ্যোক্তা উন্নয়ন ইত্যাদি কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এ সকল প্রকল্পের উপকারভোগী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধী নারীদের অগ্রাধিকার প্রদান করতে বাজেটে নির্দেশনা প্রদান করতে হবে।
  • যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ‘ন্যাশনাল সার্ভিস’ এর আওতায় বেকার যুবক ও যুব মহিলাদের দক্ষতা বৃদ্ধিমূলক প্রশিক্ষণ প্রদান ও বেকার যুবকদের আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ক্ষুদ্র ঋণ প্রদান করা হয়ে থাকে। এ সকল কার্যক্রমে প্রশিক্ষণ গ্রহণ উপযোগী প্রতিবন্ধী যুবক ও যুব মহিলাদের অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে বেকার সমস্যা হ্রাস করা যেতে পারে।
  • স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের আওতায় “একটি বাড়ি একটি খামার” প্রকল্পে ৪০,২১৬টি গ্রাম উন্নয়ন সমিতি গঠন করা হয়েছে যেখানে ২৪ লক্ষ ৩১ হাজার ৬২০টি পরিবার রয়েছে। প্রত্যেকটি সমিতিতে ৬০ জন সদস্য অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সমিতিসমূহে সদস্য হিসেবে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে।
  • সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় অতিদরিদ্রদের জন্য যে কর্মসংস্থানমূলক কার্যক্রম চলমান আছে সে সকল কার্যক্রমে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য পৃথকভাবেবাজেটে নির্দেশণা প্রদান করা যেতে পারে।

খ. প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের উন্নয়নে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণের সুপারিশ
১. বাজেট বক্তৃতা ২০১৬-১৭ তথ্য অনুযায়ী ২ মার্চ ২০১৬ পর্যন্ত বাংলাদেশে মোট ১৪ লক্ষ ৯০ হাজার ১০৫ জন প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে সনাক্ত করা হয়েছে। মাঠ পর্যায়ে আমাদের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, অনেক প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এখানো জরিপের বাইরে রয়েছে। অথচ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সঠিক সংখ্যার উপর নির্ভর করে যথাযথ উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাজেট বরাদ্দ। তাই বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো’র মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মানদন্ড যেমন ওয়াশিংটন গ্রুপ এর মান অনুযায়ী প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সঠিক সংখ্যা নিরূপণ করা জরুরি। এক্ষেত্রে শিল্প দুর্ঘটনাজনিত কারণে যেসব শ্রমিক প্রতিবন্ধী হয়েছে তাদেরকে বিরাজমান পরিসংখ্যান ব্যবস্থায় অন্তুর্ভুক্ত এবং তাদের পুনর্বাসনের জন্য বিশেষ বাজেট বরাদ্দ থাকা আবশ্যক।
২. দেশে ৯০% প্রতিবন্ধী শিশু স্কুলে ভর্তি হওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত (ইউনিসেফ এর দক্ষিণ এশিয়া আঞ্চলিক গবেষণা, ২০১৪)। কাজেই প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের শিক্ষার আওতায় আনতে ও ঝরে পড়া রোধ করতে ২০১৭-১৮ অর্থ বছরে উপবৃত্তির সংখ্যা ও টাকার পরিমাণ বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে জনপ্রতি মাসিক প্রাথমিক পর্যায়ে ৫০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৮০০ টাকা, মাধ্যমিকে ৬০০ টাকার থেকে ১২০০ টাকা, উচ্চ মাধ্যমিকে ৭০০ টাকা থেকে ১৫০০ টাকা এবং উচ্চতর শিক্ষায় ১২০০ টাকা থেকে ২৫০০ টাকায় উন্নীত করার সুপারিশ রাখছি। সেই সাথে উপবৃত্তি উপকারভোগীর সংখ্যা ৬০ হাজার থেকে ৩ লক্ষ করার সুপারিশ করছি।

৩. শিক্ষায় প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধিতে শিক্ষা ও কারিগরি প্রতিষ্ঠানের ভৌত অবকাঠামো প্রবেশগম্য করা (র‌্যাম্প, লিফ্ট, প্রসস্ত দরজা ইত্যাদি), তথ্যগত প্রবেশগম্যতা নিশ্চিত করা (শিক্ষা সহায়ক উপকরণ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের উপযোগী করা যেমন- ব্রেইল বই, ডিজিটাল মাল্টিমিডিয়া টকিং বই, এক্সেসিব্ল ই-বুক ইত্যাদি), একীভূত শিক্ষা কার্যক্রম বাস্তবায়নে শিক্ষক প্রশিক্ষণ, কারিকুলামে ইশারা ভাষা ও ব্রেইল পদ্ধতি অন্তর্ভুক্ত করা এবং পাঠদান ও মূল্যায়ন পদ্ধতি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের উপযোগী করতে বাজেটে পর্যাপ্ত বরাদ্দের সুপারিশ করছি।
৪. বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ভাষার বিকাশ ও উন্নয়নের জন্য বাংলা ইশারা ভাষা গবেষণা ইনষ্টিটিউট স্থাপনে বাজেটে বরাদ্দ রাখার সুপারিশ করিছ।

৫. বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর জন্য সরকারি চাকুরিতে কোটা সংরক্ষণের ব্যবস্থা থাকলেও তা যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে না। যা বাস্তবায়নে কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন ২০১৩ তে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের বেসরকারিভাবেকর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টিতে কর রেয়াতের সুবিধার বিষয়ে উল্লেখ রয়েছে। সুতরাং তা বাস্তবায়নে বাজেটে সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকা প্রয়োজন। কর্মসংস্থানে বাধা দুর করতে কর্মক্ষেত্র প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের উপযোগিকরণ অত্যাবশ্যক। আগামী বাজেটে এ বিষয়ে যথাযথ বরাদ্দ ও নির্দেশনার দাবি জানাচ্ছি।

৬. বেকারসমস্যা হ্রাস করতে প্রতিবন্ধী উদ্যোক্তা সৃষ্টিতে “আত্মকর্মসংস্থান অর্থায়ন তহবিল” গঠন করে ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দের সুপারিশ করছি।

৭. প্রতিবন্ধী নারীদের কর্মসংস্থানে সম্পৃক্ততা বাড়াতে কর্মজীবি মহিলা হোস্টেলগুলো প্রবেশগম্য করে অন্তত ১০% আসন প্রতিবন্ধী নারীদের জন্য সংরক্ষণ করতে বাজেট বরাদ্দের সুপারিশ করছি।

৮. শিক্ষা ও প্রশিক্ষন প্রতিষ্ঠান, পুলিশ স্টেশন, হাসপাতাল, আদালত, রেল স্টেশন, বাস টার্মিনাল, বিমান বন্দর, সাইক্লোন সেন্টার, পার্ক, গ্রন্থাগার, গণশৌচাগার, শপিং মল, রাস্তাঘাট, বিনোদন কেন্দ্র, দর্শনীয় স্থান ইত্যাদির অবকাঠামোগত ও তথ্যগত প্রবেশগম্যতা নিশ্চিতকরণে বাজেটে বরাদ্দ প্রয়োজন। ডিজিটাল বাংলাদেশের সেবায় প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করতে সকল ওয়েব সাইট, সরকারি ই-সার্ভিস, ইউনিয়ন তথ্য কেন্দ্র ইত্যাদি তাদের ব্যাবহার উপযোগী হওয়া উচিত। সুতরাং অবকাঠামোগত প্রবেশগম্যতার জন্য ৩০০ কোটি টাকা ও তথ্যগত প্রবেশগম্যতার জন্য ৫০ কোটি বাজেট বরাদ্দের সুপারিশ করছি।

৯. বাংলাদেশে এ পর্যন্ত একটি বাসও নেই যেখানে হুইল চেয়ার ব্যবহারকারীরা ব্যবহার করতে পারে। তাই প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা যাতে পরিবহন সুবিধা পেতে পারে, এজন্য সকল বাস স্ট্যান্ড, নৌ টার্মিনাল, ট্রেনের প্ল্যাটফর্ম প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রবেশগম্য করতে বাজেট বরাদ্দের প্রস্তাব করছি। একইসাথে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের চলাচলের জন্য ঢাকা শহরে ১০টি ও বিভাগীয় পর্যায়ে আরো ১০টি প্রবেশগম্য বাস আমদানির জন্য বাজেটে যথাযথ বরাদ্দ ও বেসরকারি উদ্যোগে অন্তত ৫% প্রবেশগম্য বাস আমদানির নির্দেশনা প্রত্যাশা করছি।

১০. সরকারের আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রবেশগম্যতা নিশ্চিত করা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য স্থানচ্যুত, গৃহহীন প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের আবাসন এর ব্যবস্থা করে দুর্যোগ মোকাবেলায় সক্ষমতা অর্জনের জন্য বাজেটে বরাদ্দ রাখা এবং কর্মজীবী প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের আবাসনের জন্য সরকারী ঋণ প্রদান প্রতিষ্ঠান কর্তৃক সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা রাখার নির্দেশনা প্রদানের সুপারিশ করছি।

১১. প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড ও ক্রীড়া উন্নয়ন প্রসারের লক্ষ্যে আগামী অর্থবছরের বাজেটে বরাদ্দের প্রস্তাব করছি।

১২. প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ধরণ ও চাহিদা মোতাবেক সহায়ক উপকরণ দরিদ্র প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের বিনামূল্যে সরবরাহ করার জন্য বাজেটে পর্যাপ্ত বরাদ্দের প্রস্তাব করছি।

১৩. সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর উপখাতে বিভিন্ন তহবিল গঠনের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন ২০১৩ -তে উল্লিখিত ১১ প্রকারের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা যাতে উপকৃত হতে পারে সেজন্য প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের উন্নয়ন তহবিল গঠন করে ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দের সুপারিশ করছি।

১৪. প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ন্যায় বিচার প্রাপ্তিতে জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশন এর প্রশিক্ষণ কারিকুলামে প্রতিবন্ধিতা বিষয়টি যুক্ত করে বিচারকদের এ বিষয়ে প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। প্রতি জেলার আইনজীবী সমিতির অন্তত ২ জন আইনজীবীকে (একজন রাষ্ট্রপক্ষের ও অন্যজন বেসরকারি) প্রতিবন্ধিতা বিষয়ক প্রশিক্ষণ প্রদান করতে আইন মন্ত্রণালয়ের বাজেটে বরাদ্দ রাখার সুপারিশ করছি।

১৫. অতি গুরুতর প্রতিবন্ধী ব্যক্তির জীবনযাত্রার ব্যয় তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। তাদের জন্য কেয়ার গিভারের প্রয়োজন হয়। এ বিষয় বিবেচনায় এনে অস্বচ্ছল প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ভাতা জনপ্রতি মাসিক ন্যূনতম ১৬০০ টাকায় উন্নীত করার জন্য সুপারিশ করছি।

১৬. প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে অংশগ্রহণ বৃদ্ধি, সহিংসতা ও নির্যাতন হ্রাসকল্পে তৃণমূল পর্যায়ে ব্যাপক সচেতনতা কার্যক্রম গ্রহণ করা প্রয়োজন। এসকল কার্যক্রম প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সংগঠন (ডিপিও) যেহেতু তৃণমূল পর্যায়ে সফলভাবে পরিচালনা করছে, সুতরাং এসকল কার্যক্রম আরো জোরালোভাবে পরিচালনার জন্য ডিপিও’দের জন্য ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দের সুপারিশ করছি।
প্রণয়ন ও বিশ্লেষণ: আলবার্ট মোল্লা, নির্বাহী পরিচালক, অ্যাকসেস্ বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন।