বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা এবং জাতীয় বাজেটে বরাদ্দ ২০১৭

শিক্ষা প্রতিটি মানুষের মৌলিক অধিকার। ১৯৪৮ সালের সার্বজনীন মানবাধিকার সনদের ২৬/১- ধারায় এর স্বীকৃতি প্রদান করা হয়েছে। বাংলাদেশের সংবিধানে এ বিষয়ে বলা হয়েছে যে, রাষ্ট্র ‘একই পদ্ধতির গণমুখী ও সর্বজনীন শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য’[অনুচ্ছেদ ১৭(ক)], ‘সমাজের প্রয়োজনে শিক্ষাকে সঙ্গতিপূর্ণ করা এবং সেই উদ্দেশ্যে যথাযথ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও সদিচ্ছাপ্রণোদিত নাগরিক সৃষ্টির জন্য’কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে [অনুচ্ছেদ ১৭(খ)]।

স্বাধীনতার পর থেকে সরকারগুলো শিক্ষাকে প্রাধাণ্য দিয়ে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। বর্তমান সরকারের সর্বশেষ নির্বাচনী ইশতেহারেও (২০১৪) বিষয়টি অগ্রাধিকার পেয়েছিল। সেখানে জাতীয় উন্নয়নে শিক্ষা ও মানব উন্নয়নের নিয়ামক ভূমিকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।ইশতেহারে শিক্ষার মানোন্নয়নকে সর্বাধুনিক গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি বর্তমান শিক্ষানীতির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন, শিক্ষা খাতে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ বৃদ্ধি, প্রাথমিক শিক্ষার স্তর পঞ্চম থেকে অষ্টম শ্রেণিতে উন্নীতকরণ এবং অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষাকে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক করার কথা বলা হয়েছিল।

রূপকল্প ২০২১ বাস্তবায়নের পাশাপাশি ২০১৬-২০ অর্থবছর পর্যন্ত বিস্তৃত সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনাএমন একটি সময়ে শুরু হয়েছে যখন বাংলাদেশ সবেমাত্র মধ্যম আয়ের দেশগুলোর মর্যাদায় প্রবেশ করতে শুরু করেছে। একই সাথে বিশ্বব্যাপী জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য (এসডিজি) কার্যμমও শুরু হয়েছে।যেখানে একটি সমন্বিত শিক্ষালক্ষ্য (এসডিজি-৪) “সবার জন্য একীভূত, সমতাভিত্তিক মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতকরণ এবং জীবনব্যাপী শিক্ষার সুযোগ প্রসার” গৃহীত হয়েছে।

বাংলাদেশে শিক্ষা
ডাকার ডিক্লারেশন (ইএফএ) এবং ইউএন মিলেনিয়াম ডিক্লারেশন (এমডিজিস) এ স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে ২০১৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে শিক্ষায় বিশেষ অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে। এর মধ্যে জাতীয় শিক্ষা নীতি ২০১০ প্রণয়নসহ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি ও ছেলেমেয়ে সমতা উল্ল্যেখযোগ্য। চালু হয়েছে সৃজনশীল শিক্ষা পদ্ধতি, বছরের শুরুতেই সকল শিক্ষার্থীর জন্য বিনামূল্যে নিশ্চিত করা হচ্ছে পাঠ্যপুস্তক। প্রাথমিক শিক্ষায় পূনরাবৃত্তি, ঝরে পড়া প্রভৃতি কমেছে এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাতকে একটি মানসম্মত পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা চালানো হচ্ছে।

সারণি ১: প্রাথমিক শিক্ষায় অগ্রগতি

তথ্যসূত্র: বার্ষিক প্রাথমিক বিদ্যালয় শুমারী, ২০১৬, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর

আবার মাধ্যমিক শিক্ষায় রয়েছে এর বিপরীত চিত্র। এখানে বিদ্যালয় রয়েছে ২৪,০০০-এর অধিক (নি¤œ মাধ্যমিক, মাধ্যমিক, স্কুল ও কলেজসহ), যেখানে লেখাপড়া করছে প্রায় ১ কোটি ৩৪ লক্ষ এর বেশি শিক্ষার্থী। এর মধ্যে সরকারি ব্যবস্থাপনার প্রতিষ্ঠান রয়েছে মাত্র ১১০৬টি যেখানে মোট শিক্ষার্থীর ১২ শতাংশ লেখাপড়া করছে। সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কম হওয়াতে এখানে ভর্তির প্রতিযোগিতাও বেশি। সরকারি ও মানসম্মত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অভাবে দেশে গড়ে উঠছে বেসরকারি ব্যবস্থাপনার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এর মাধ্যমে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মালিক হচ্ছেন অনেক ব্যক্তি বা সংগঠন। যেখানে বেসরকারি বিদ্যালয়গুলো এখন শিক্ষা প্রদানের নামে তৈরি করা লাভজনক প্রতিষ্ঠান বা প্রকল্পে পরিণত হয়েছে।

সারণি ২: শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, শিক্ষার্থী ও শিক্ষক


তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ শিক্ষা পরিসংখ্যান ২০১৫, বেনবেইস

বাংলাদেশে এসডিজি-৪/ শিক্ষা ২০৩০-এর বিভিন্ন লক্ষ্য অর্জনে বর্তমান সরকারের প্রচেষ্টা প্রশংসার যোগ্য। যার দৃশ্যমান উদাহরণ হল সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার সাথে সমন্বয় করে এসডিজি লক্ষ্যভিত্তিক বাস্তবায়নের জন্য বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব ম্যাপিং, যেখানে শিক্ষাখাতকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আশা করছি, অচিরেই আমরা পাব একটি পূর্ণাঙ্গ শিক্ষা আইন, যার মাধ্যমে শিক্ষার একটি পর্যায় পর্যন্ত অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান ও তা রাষ্ট্রীয় ব্যয়ে পরিচালিত হবে।তবে উপর্যুক্ত অর্জনগুলোর পরও শিক্ষাক্ষেত্রে এখনোও অনেক চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান। যার অনেকগুলো সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায়ও উল্লেখ করা হয়েছে যেমনঃ শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত, ঝরে পড়া, লিঙ্গ বৈষম্য, গুণগত বিষয়- পাঠ্যμমের অনুপযোগিতা, ভৌত অবকাঠামোগত সুবিধার স্বল্পতা, শিক্ষকদের সক্ষমতা ও প্রশিক্ষণ সংশ্লিষ্ট বিষয় প্রভৃতি।

জাতীয় বাজেটে শিক্ষায় বরাদ্দ
বাংলাদেশের জাতীয় বাজেটের গতি-প্রকৃেিত দেখা যায় যে,প্রতিবছর বাজেটের আকার বৃদ্ধির সাথে সাথে শিক্ষায় বরাদ্দ টাকার অংকেওবেড়েছে। কিন্তু জাতীয় বাজেটের আকার যতটা বড় হচ্ছে, শিক্ষা খাতে বরাদ্দ সে অনুপাতে বাড়ছে না। আবার বরাদ্দ শতাংশের হারে বৃদ্ধি পেলেও অনুন্নয়ন ব্যয়ের তুলনায় উন্নয়ন ব্যয় যথেষ্ট কম। ২০১১-১২ অর্থবছর থেকে পরবর্তী বাজেটগুলোতে শিক্ষাখাতে বরাদ্দ টাকার অংকে বাড়লেও কখনোই তা শতকরা হিসেবে বাড়েনি, বরং প্রতি বছর তা কমতে কমতে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ১০.৭ শতাংশে পৌছেছিল। সর্বশেষ ২০১৬-১৭ অর্থবছরে জাতীয় বাজেটে শিক্ষাখাতে বরাদ্দ টাকার অংক এবং শতকরা উভয় হিসেবেই বৃদ্ধি পেয়েছে।
লেখচিত্র ১: জাতীয় বাজেটের তুলনায় শিক্ষাখাতে বরাদ্দ

তথ্যসূত্র: বাজেটের সংক্ষিপ্তসার (বিভিন্ন বছর), অর্থ মন্ত্রণালয় ও লেখকের নিজস্ব হিসাব
সেদিক থেকে বিবেচনা করলে ২০১৬-১৭ অর্থবছরের বরাদ্দকৃত বাজেট অনেকাংশেই আশাব্যঞ্জক ও সুদূরপ্রসারী। বরাদ্দকৃত এই বাজেটে শিক্ষাখাতের জন্য মোট বরাদ্দ রাখা হয়েছিল ৪৯,০১০ কোটি টাকা (শিক্ষা মন্ত্রণালয় ২৬,৮৪৮ এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় ২২১৬২), যা মোট বাজেটের ১৪.৩৯ শতাংশ ও দেশজ আয়ের ২.৪ শতাংশ এবং গতবারের তুলনায় প্রায় ৩২ শতাংশ বেশি। বাজেট বক্তৃতায় মাননীয় অর্থমন্ত্রী প্রাথমিক শিক্ষাকে ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত বর্ধিত করা, বিনামূল্যে বই বিতরণ, উপবৃত্তি প্রদান, ১১২৫টি বিদ্যালয়বিহীন গ্রামে প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন এবং ৩৪,৮৯৫ জন শিক্ষক নিয়োগ করার কথা উল্ল্যেখ করেছিলেন। এছাড়া National Human Resource Development Fund (NHRDF) Ges National Skills Development Authority (NSDA) গঠনের প্রস্তাব, উপানুষ্ঠানিক শিক্ষাখাতে সেক্টর কর্মসূচি প্রণয়নের পরিকল্পনা গ্রহণ, জাতীয় ফিডিং নীতিমালা প্রণয়ন এবং বেসরকারি শিক্ষকদের কল্যাণে বরাদ্দ প্রস্তাব করেছিলেন। অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যে যেসকল অর্জন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করা হয়েছিল তা নিঃসন্দেহে প্রশংসাযোগ্য ও ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গীর প্রতিফলন। কিস্তু জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এর বাস্তবায়ন বিষয়ে অর্থমন্ত্রী একটি কথাও বলেননি, যদিও সরকার সবসময় এটিকেই তাদের অর্জনের তালিকায় প্রথম স্থান দিয়ে থাকেন।

লেখচিত্র ২: জাতীয় বাজেটের তুলনায় শিক্ষাখাতে বরাদ্দ

লেখচিত্র ৩: জাতীয় বাজেটের তুলনায় শিক্ষাখাতে বরাদ্দ

তথ্যসূত্র: বাজেটের সংক্ষিপ্তসার (বিভিন্ন বছর), অর্থ মন্ত্রণালয় ও লেখকের নিজস্ব হিসাব

আপাতদৃষ্টিতে অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতার প্রস্তাবনাগুলো চমকপ্রদ মনে হলেও ‘সবার জন্য গুণগত শিক্ষা’ নিশ্চিতকরণ অথবা সে লক্ষ্যে এগিয়ে চলায় পাথেয় হিসেবে বরাদ্দকৃত ঐ বাজেট ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। প্রথমেই দেখা যেতে পারে সরকার কর্তৃক অনুমোদিত ৭ম ও ৮ম পে স্কেলের কারণে শিক্ষাক্ষেত্রে কর্মরত শিক্ষক ও অন্যান্যদের বেতন বৃদ্ধির বিষয়টি। এ বিষয়ে গতবছরের মার্চ মাসে একটি পত্রিকায় মাননীয় অর্থমন্ত্রীর উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছিল শুধুমাত্র বেসরকারি স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসায় কর্মরত ৪৭৭,২২১ জন শিক্ষক ও অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য ৮ম পে স্কেলের কারণে বছরে প্রয়োজন হবে প্রায় ৭,১৯৫ কোটি টাকা। এখন প্রশ্ন হচ্ছে যদি শুধুমাত্র বেসরকারি স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসায় কর্মরত ৪৭৭,২২১ জন এমপিওভূক্ত শিক্ষক ও অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য ৭,১৯৫ কোটি টাকার প্রয়োজন হয় তবে সরকারি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়, সরকারি কলেজ ও মাদ্রাসা এবং বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন ইনস্টিটিউটে কর্মরত শিক্ষক ও অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারিদের জন্য কত টাকা অতিরিক্ত লাগবে?

দ্বিতীয়ত, ২০০৯ পরবর্তী সময়ে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের ফলে দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় বিশেষ করে ভর্তি ও ঝরে পড়া রোধে ব্যাপক উন্নতি হয়েছে। অনেকে এটিকে বিশ্বে রোল মডেল হিসেবেও উল্লেখ করে থাকেন। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা অধিদপ্তরের একটি পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে যে, ২০০৫ সালে দেশে নিট ভর্তি ছিল ৮৭.২% যা ২০১৬ সালে ৯৭.৯৬%-এ উন্নীত হয়েছে। একইভাবে ঝরে পড়ার হার হ্রাস পেয়ে ৪৭.২% থেকে ১৯.২%-তে দাঁড়িয়েছে। নিঃসন্দেহে এটি একটি বড় অর্জন। কিন্তু এখন প্রশ্ন হচ্ছে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর সংখ্যা যেভাবে বেড়েছে একইসাথে তাল মিলিয়ে শিক্ষাখাতের বরাদ্দ কি বেড়েছে? পরিসংখ্যাণ বলছে তা বাড়েনি। এক্ষেত্রে শিক্ষার্থী প্রতি মাথাপিছু বরাদ্দের পরিমাণ পূর্বের তুলনায় কমে গেছে।

২০১২ সালে দেশে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ছিল ৩৭,৬৭২টি, সেখানে শিক্ষক ছিল ২১৪,৫৬৮ জন। ২০১৩ সালে নতুনভাবে প্রায় ১০৪,০০০ জন শিক্ষকসহ ২৬,১৯২টি বেসরকারি রেজিষ্টার্ড প্রাথমিক বিদ্যালয়কে জাতীয়করণের মাধ্যমে সরকারি সুবিধার আওতায় নিয়ে আসা হয়েছিল। নতুনভাবে জাতীয়করণকৃত এসকল বিদ্যালয় ও শিক্ষকের সংখ্যা ছিল পূর্বের তুলনায় যথাক্রমে ৬৯% এবং ৪৮% বেশি। এসকল বিদ্যালয়ের জন্য ব্যয় খুব স্বাভাবিকভাবেই বেশি হবে। কিন্তু পরবর্তী বাজেটগুলোতে নতুনভাবে জাতীয়করণকৃত এই বিদ্যালয়গুলোর অবকাঠামো, শিক্ষকদের বেতন ও ছাত্রছাত্রীদের জন্য আলাদা কোনো বরাদ্দ দেওয়া হয়নি।

জাতীয় আয় ধরে বরাদ্দের হিসেব করলে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে শিক্ষাখাতে বরাদ্দ ২.৪ শতাংশ, যা সার্কভূক্ত অন্যান্য দেশগুলোর মধ্যে সর্বনি¤œ। সার্ক ও আশিয়ানভূক্ত দেশগুলো যেমন ভারত (৩.৮%), ভিয়েতনাম (৬.৬%), মালয়শিয়া (৫.৯%), থাইল্যান্ড (৭.৬%), নেপাল (৪.৭%) প্রভৃতি দেশগুলো বাংলাদেশের তুলনায় শিক্ষাখাতে বেশি বরাদ্দ দিয়ে থাকে।ডাকার ঘোষণায় স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশ তার জাতীয় আয়ের কমপক্ষে ৬% বা জাতীয় বাজেটের ২০% শিক্ষাখাতে বরাদ্দ দেবার জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ২০১৫ সালে দক্ষিণ কোরিয়ায় অনুষ্ঠিত বিশ্ব শিক্ষা সম্মেলনেও মোট জাতীয় আয়ের কমপক্ষে ৪-৬% শিক্ষাখাতে বরাদ্দের কথা বলা হয়েছে। কিন্তুএখনো লক্ষ্যমাত্রার চাইতে অনেক পিছিয়ে আছি আমরা।

শিক্ষায় অর্থায়ন বিষয়ে জাতিসংঘের সদস্য দেশগুলোকে তাদের জাতীয় বাজেটের ২০% অথবা জাতীয় আয়ের ৬% শিক্ষাখাতে বরাদ্দের জন্য তাগিদ দেয়া হয়েছে। আমরা বিশ্বাস করি, শিক্ষাখাতে অপর্যাপ্ত বরাদ্দ কখনোই টেকসই উন্নয়ন লক্ষমাত্রা- ৪ অর্থাৎ “সবার জন্য একীভূত, সমতাভিত্তিক মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতকরণ এবং জীবনব্যাপী শিক্ষার সুযোগ প্রসার” নিশ্চিত করতে পারবে না। এ লক্ষমাত্রা অর্জনে অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা ইতোমধ্যেই একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, টেকসই উন্নয়ন লক্ষমাত্রা অর্জনে অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণকে দ্বিগুণ করতে হবে। আগামী ১০ বছরের মধ্যে ট্যাক্স-জিডিপি অনুপাত ১২.১% থেকে ১৮% এ উন্নীত করা প্রয়োজন।

রূপকল্প-২০২১ অর্জন ও মধ্য আয়ের রাষ্ট্রে পরিণতসহ এসডিজি-৪ অর্জনে ‘সবার জন্য শিক্ষা’ নিশ্চিত করার গুরুত্ব অপিরসীম। আধুনিক শিক্ষায় সুশিক্ষিত, বিজ্ঞানমনস্ক ও তথ্য প্রযুক্তিতে দক্ষ মানুষের মধ্য আয়ের দেশ হিসেবে পরিচিতির লক্ষ্যে শিক্ষাই প্রধান হাতিয়ার। এমতাবস্থায়, শিক্ষার যথাযথ সংস্কার ও সার্বিক উন্নয়নের রূপরেখা নিশ্চিত করার জন্য ২০১৭-১৮ সহ সামনের অর্থবছরগুলোর জাতীয় বাজেটে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক নি¤œলিখিত সুপারিশমালা বিবেচনা করা প্রয়োজন।

  • জাতীয় শিক্ষানীতির পূর্ণ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে রূপকল্প ২০২১, ৭ম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা এবং এসডিজি-৪ বিবেচনায় একটি রোডম্যাপ প্রণয়ন করা।
  • ২০১৭-১৮ অর্থবছরে শিক্ষাখাতে মোট বাজেটের ন্যূনতম ১৮% বরাদ্দসহ ক্রমান্বয়ে ১%-২% বৃদ্ধি করে ২০%-উন্নীত করতে হবে। একই সাথে বরাদ্দকৃত অর্থের যথাযথ ও কার্যকর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা।
  • জাতীয় বাজেটে শিক্ষার বরাদ্দ বৃদ্ধির লক্ষ্যে “শিক্ষা সেস” (ঊফঁপধঃরড়হ ঈবংং) প্রবর্তন এবং জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে “শিক্ষা তহবিল” গঠন করা যেতে পারে। এছাড়া কর ন্যায্যতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে করের আওতা বৃদ্ধিসহ কর-কাঠামো যথাযথভাবে সাজানো প্রযোজন।
  • ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়া এবং আয় ও সম্পদ বৈষম্য কমানোর লক্ষ্যে টেকনিক্যাল ও ভোকেশনাল শিক্ষার প্রসারের জন্য যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ ও বরাদ্দ দেওয়া।
  • বাংলাদেশে অন্তর্ভুক্ত ছিটমহলে অবকাঠামোগত উন্নয়নসহ সকল বিদ্যালয়বিহীন গ্রামে বিদ্যালয় স্থাপনসহ অধিক শিক্ষার্থীর স্থানসংকুলানের জন্য বাড়তি শ্রেণিকক্ষ নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় বরাদ্দ দেওয়া।
  • শিক্ষকতা পেশায় মেধাবীদের আকৃষ্ট এবং তাদের পেশাজীবিতা উন্নয়নের লক্ষ্যে দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা তৈরি, চারবছর মেয়াদী কোর্স প্রচলন, শিক্ষকদের জন্য যুগোপযোগী বেতন কাঠামো প্রণয়ন, বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগ এবং নিয়োগের পূর্বে তাদের প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা এবং এর জন্য প্রয়োজনীয় বরাদ্দ রাখা।
  • আনুষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি বয়স্ক ও জীবনব্যাপী শিক্ষার জন্য “শিক্ষার দ্বিতীয় সুযোগ” (ঝবপড়হফ ঈযধহপব ঊফঁপধঃরড়হ) কার্যক্রম সফলভাবে বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ নিশ্চিত করা।
  • উৎধভঃ ঝপযড়ড়ষ ঋববফরহম চড়ষরপু অনুযায়ী ২০২১ সালের মধ্যে দেশের প্রত্যন্ত ও পিছিয়ে পড়া অঞ্চল বিশেষ করে চর, হাওর, চা বাগান, পার্বত্য ও আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চল এবং নগরীর বস্তি এলাকার সকল প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মিড-ডে মিল কর্মসূচি সম্প্রসারণ করা।
  • সকল ধরণের প্রতিবন্ধী শিশুর জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষাব্যবস্থাসহ তাদের উপযোগী প্রয়োজনীয় ভৌত অবকাঠামো এবং প্রতিবন্ধীবান্ধব শিক্ষা উপকরণের জন্য প্রয়োজনীয় বরাদ্দ প্রদান করা।
  • ২০০৪ সাল থেকে প্রবর্তিত উপবৃত্তির টাকার পরিমান মাথাপিছু ১০০ থেকে বৃদ্ধি করে কমপক্ষে ২৫০ টাকায় উন্নীত করা।
  • শিক্ষা ব্যবস্থাপনা বিকেন্দ্রায়নকরার লক্ষ্যে সুসমন্বয়, ক্ষমতা অর্পন, তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং যথাযথ পরিবীক্ষণের মাধ্যমে শিক্ষা প্রশাসনে গতি সঞ্চার এখন সময়ের দাবী, এজন্য পর্যাপ্ত বরাদ্দ দেওয়া প্রয়োজন।

 

 

মোঃ মোস্তাফিজুর রহমান
কার্যক্রম ব্যবস্থাপক, গণসাক্ষরতা অভিযান

মোহাম্মদ আবদুল কুদ্দুছ
কার্যক্রম কর্মকর্তা, গণসাক্ষরতা অভিযান