করোনায় কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা : প্রেক্ষিত জাতীয় বাজেট ২০২০-২১ ২০২০

১. কৃষি বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান কর্মকান্ড এবং জীবনীশক্তি। দেশের অধিকাংশ মানুষ গ্রামে বসবাস করেন এবং তারা সরাসরি বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। বিশ্বব্যাংকের হিসাব মতে, বাংলাদেশের এখনো শতকরা প্রায় ৮৭ ভাগ গ্রামীণ মানুষের আয়ের উৎস কৃষি। দুই-তৃতীয়াংশ গ্রামীণ পরিবার কৃষি ও অকৃষিজ উভয় আয়ের ওপর নির্ভরশীল। শহরে বসবাসকারীদের মধ্যেও ১১ শতাংশ মানুষ সরাসরি কৃষিকাজে যুক্ত। দেশের মোট শ্রমমক্তির ৪০.৬শতাংশ কৃষিতে নিয়োজিত রয়েছে । দেশের সবচেয়ে বড় উৎপাদনশীল ব্যক্তিখাত হলেও জিডিপিতে কৃষিখাতের অবদান প্রায় ১৩.৭ শতাংশে নেমে এসেছে । শতকরা হিসাবে মোট দেশজ উৎপাদনমূল্যে কৃষির অংশীদারিত্ব কমলে জাতীয় পরিসরে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কেন্দ্রে কৃষির উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রয়েছে। কৃষির বিকাশের মাধ্যমেই শিল্প ও সেবাখাত বিকশিত হয়েছে; গ্রামীণ এলাকার ভোক্তাদের বাজারের চাহিদাভিত্তিক মালামালের প্রধান উৎসও কৃষি। কৃষি সামাজিক কর্মকান্ডের এমন একটি আন্তঃসম্পর্কিত ক্ষেত্র যা জনগণের খাদ্য ও পুষ্টির নিশ্চয়তা, কর্মসংস্থান, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং দারিদ্র্য হ্রাসকরণের মত বিষয়াদির সাথে সংশ্লিষ্ট।

২. কৃষি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় উৎপাদনশীল ব্যক্তিখাত। কিন্ত, কিন্তু, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জাতীয় বাজেটের খাতভিত্তিক বরাদ্দের ক্ষেত্রে কৃষিখাত সবচেয়ে বেশি অবহেলিত থাকছে। ১৯৯০ সালের পর থেকে জিডিপিতে কৃষিখাতের অবদানের ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাচ্ছে। এই সময়কালে শিল্প এবং সেবাখাতযেমন বিকশিত হয়েছে, পাশাপাশি এর মধ্যদিয়ে কৃষিতে রাষ্ট্রীয় সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির অভাব, রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ ও পরিকল্পনা প্রণয়নে বৃহৎ ব্যবসায়ী গ্রুপের প্রভাব বিস্তার এবং নীতি-প্রণয়ন পর্যায়ে কৃষকদের স্বার্থ সুরক্ষায় শক্তিশালী প্রতিনিধিত্ব/ সংগঠন না থাকার মতো কারণগুলো স্পষ্ট হয়ে উঠবে।

৩. প্রতিবছর জাতীয় বাজেটের আকার বাড়লেও জাতীয় বাজেটে কৃষি ও তৎসংশ্লিষ্ট খাতের বাজেট ক্রমহ্রাসমান। মোট বাজেটে আনুপাতিক হারে কৃষি মন্ত্রণালয়ের জন্য বাজেট বরাদ্দ প্রতি বছর নিয়মিত হারে কমছে। আওয়ামী লীগ সরকারের প্রথম মেয়াদে ২০০৯-১০ অর্থ বছরে কৃষি মন্ত্র¿ণালয়ের জন্য বরাদ্দ ছিলো মোট বাজেটের ৮.৪৪ শতাংশ, আর ২০২০ অর্থবছরে তা হ্রাস পেয়ে ২.৬৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

৪. চলতি বছর করোনা মহামারীর ধাক্কা লেগেছে বাংলাদেশেও। আগ্রাসন থেকে রেহাই পায়নি আমাদের কৃষিখাত। মার্চের শুরুতে যখন প্রথম নভেল করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) সংক্রমণের খবর সরকারিভাবে ঘোষিত হয়, তখন ছিল ভরা বোরো মৌসুম। শীতকালীন অনেক ফসল উঠে গেলেও কিছু ফসল তখনো মাঠে ছিলো। কৃষি মন্ত্রনালয়ের হিসাব মতে, এপ্রিল ও মে মাসে প্রায় সাড়ে তিন কোটি টন কৃষিপণ্য বাজারে আসে এবং কৃষকদের জন্য এটাই সবচেয়ে বড় মৌসুম। টানা লগডাউন, হাটবাজার বন্ধ এবং সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করতে গিয়ে কৃষক উৎপাদিত পণ্য পানির দামে বেচে দেয়; গণমাধ্যম বলছে, শশা,বেগুণ, শিম, টমেটো দ্রুত পচনশীল বলে এগুলো সাধারণ-দামের ২০০ থেকে ৩০০ শতাংশ (কেজি প্রতি শশা ৩-৫ টাকা,বেগুণ ৫ টাকা ) কম দামে বিক্রি করে কৃষক ।

৫. কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, আলু তোলার কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে থাকার কারণে ১০৮ লাখ টন আলু তোলার যে লক্ষ্যমাত্রা ছিল, তার মধ্যে ৯৭ দশমিক ৬ লাখ টন ফসল তোলা হয়েছে। তবে পেঁয়াজ তোলার সময়ে লকডাউন শুরু হওয়ার কারণে ২৩ দশমিক ৮ লাখ টন পেঁয়াজের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও তোলা হয়েছে মাত্র ৯ দশমিক ৭৩ লাখ টন।

৬. গত ৭ এপ্রিল জেলা প্রশাসকদের সাথে এক ভিডিও কনফারেন্সে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এই যে করোনা প্রভাব, এতে ব্যাপকভাবে খাদ্যাভাব দেখা দেবে বিশ্বব্যাপী। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে যে দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়ে়ছিল, সে রকম অবস্থা হতে পারে।’ খাদ্য নিরাপত্তা বিষয়টি দেখলে গেলে সেক্ষেত্রে মৎস্য, ডেইরি ও পোল্ট্রিখাতও এই সাথে যোগ করতে হবে। বাংলাদেশ ডেইরি ফারমার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিডিএফএ) পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ‘বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রতিদিন ১৫০ লাখ লিটার দুধ অবিক্রীত থেকে যাচ্ছে, যার বাজারমূল্য প্রায় ৫৭ কোটি টাকা। আগামী এক মাস এভাবে চলতে থাকলে প্রায় ১ হাজার ৭১০ কোটি টাকার ক্ষতির মধ্যে পড়বেন খামারিরা।

৭. পোলট্রি খাতসংশ্নিষ্ট সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, মার্চের শেষের দিকে এসে পোল্ট্রি খাতে বড় ধরনের সংকট টের পাওয়া যায়। প্রতিদিন দেশে ৩ হাজার ২৭ টন মুরগির মাংস উৎপাদন হচ্ছে কিন্তু ৭০ শতাংশ মুরগি অবিক্রীত থাকছে। ফলে দিনে প্রায় ২১ কোটি টাকা ক্ষতি হচ্ছে। প্রতিদিন ৪ কোটি ৬৬ লাখ ডিম উৎপাদন হচ্ছে কিন্তু ডিম বিক্রি ৬০ শতাংশ কমে গেছে। এজন্য ১৫ কোটি ৩৮ লাখ টাকা ক্ষতি হচ্ছে। তেমনি একদিনের বাচ্চাও ৯০ শতাংশ বিক্রি হচ্ছে না এবং পোল্ট্রি খাদ্য ৭০ শতাংশ বিক্রি কমে গেছে। বাংলাদেশ পোল্ট্রি ্র ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিলের (বিপিআইসিসি) তথ্য অনুযায়ী, পোল্ট্রি ্র ইন্ডাস্ট্রিতে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ রয়েছে। এ খাতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ৬০ লাখ কর্মসংস্থান রয়েছে।

৮. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য -অর্থনীতি ইনস্টিট্উিটের হিসাবে করোনাকালীন সময়ে শষ্য উৎপাদন, প্রাণীসম্পদ এবং মৎস্য সম্পদখাতে প্রতিদিন ২০০ কোটি টাকা ক্ষতি হচ্ছে।

৯. চলতি করোনা ভাইরাস পরিস্থিতিতে কৃষিউদ্যোক্তাদের জন্য গত ১২ এপ্রিল মাননীয় প্রধানমন্ত্রী পাঁচ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনার ঘোষণা দেন। প্রথমত: এই প্রণোদনা কৃষকদের জন্য সরাসরি রাষ্ট্রীয় কোন অনুদান বা আর্থিক সহায়তা নয়। এটি কৃষিখাতে ৪% সুদে ঋণ (এটি প্রথমে ৫ শতাংশ ছিল, পরে ৪ শতাংশ করা হয়েছে)। এই প্রণোদনাটির জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক “কৃষিখাতে বিশেষ প্রণোদনামূলক পুনঃঅর্থায়ন স্কীম” গঠন করে একটা সার্কুলার জারি করেছে যা মূলত: এসএমই কৃষি উদ্যোক্তাদের সহায়তা করবে। অর্থাৎ প্রচলতি ব্যাংকিং ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এই প্রণোদনা থেকে বর্গাচাষী, অপ্রাতিষ্ঠানিক কৃষি কাজ করেন বা কৃষিসমন্ধীয়কাজ করেন এমন কৃষকরা কোন সহায়তা পাবেন না।

১০. প্রধানমন্ত্রী ১২ এপ্রিল জানান, আগামি বাজেটে সারের ভর্তুকি বাবদ ৯ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। গত তিন বছর ধরেই বাজটে সমপরিমাণ অর্থ কৃষিভর্তুকি হিসেবে রাখা হচ্ছে, যা মূলত: সার আমদানিতে আমদানিকারক/ ডিলার পর্যায়ে প্রদান করা হচ্ছে। কিন্তু, সংশোধতি বাজেটে দেখা যায়, আন্তর্জাতিক বাজারে সারের দাম কমে যাওয়ায় বরাদ্দকৃত টাকার উল্লেখযোগ্য অংশ অব্যবহৃত ছিল। উদাহরণস্বরূপ, ২০১৬, ২০১৭ এবং ২০১৮ অর্থবছরে যথাক্রমে ২,৫৭০ কোটি টাকা, ৫,৩৯০ কোটি টাকা এবং ৩,৮০০ কোটি টাকা অব্যবহৃত ছিল,যা সরাসরি কৃষককে উৎপাদন/ সংরক্ষণ/ বিপনন পর্যায়ে দেয়া যেত।

১১. পিপিআরসি ও বিআইজিডি গবেষণা বলছে, করোনার বিপর্যয় ঠেকাতে দেশের প্রায় প্রতিটি অঞ্চলে লকডাউন থ আয়ের পথ বন্ধ হয়ে দরিদ্র-অতি দরিদ্র মানুষের জীবিকা হুমকির মুখে পড়েছে। এই সময়ে দেশে নতুন করে ৩ কোটি ৬৯ লাখ ৪৪ হাজার (২২.৯%) মানুষ নতুন করে দরিদ্র হয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে দেশে সবমিলিয়ে ৭ কোটি দরিদ্র মানুষ দারিদ্র্য অবস্থায় ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

১২. বাংলাদেশে ৬ কোটির বেশি শ্রমশক্তিরপ্রায় ৮৫.১ শতাংশ অসংগঠিত-অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত, যাদে সংখ্যা প্রায় ৫ কোটি ১৭ লাখ। লকডাউনের কারণে অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত মানুষ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়েছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক বলছে, এই অবস্থা চলতে থাকলে চলতি অর্থবছরে ১শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি হারাবে বাংলাদেশ এবং চাকরি হারাবে অন্তত: ৯লাখ মানুষ।

১৩. খাদ্য স্বয়ংসম্পূর্ণতার কথা বলতেও নাগরিকদেও খাদ্য নিরাপত্তা দিক থেকে বাংলাদেশ সবসময় একটি চ্যালেঞ্জের মধ্যে ছিলো। সম্প্রতি প্রকাশিত ‘বিশ্ব খাদ্য নিরাপত্তা সূচক ২০১৯’ অনুসারে বিশ্বের ১১৩টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ৯৩তম। এক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের অবস্থান সর্বনিন্মে। বৈশ্বিক ক্ষুধা সূচকে ১১৭টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৮৮তম। এই প্রতিবেদনটি বলছে, ১০০ এর মধ্যে ২৫.৮ স্কোর নিয়ে বাংলাদেশে মারাত্মক মাত্রায় ক্ষুধার সংকটে রয়েছে।

১৪. পিআিরসি ও ব্আিই্জিডির হিসাব মতে, করোনাকালীন সময়ে দেশে শহরাঞ্চলে মানুষের ৪৭ শতাংশ ও গ্রামের মানুষের ৩২ শতাংশ খাবার গ্রহণের পরিমাণ কমেছে। সরকারি তথ্য মোতাবেকই দেশের প্রায় পৌনে ৪ কোটি মানুষ (দরিদ্র ২১.৮ শতাংশ) পর্যাপ্ত খাবার গ্রহণ করতে পারতেন না। আর প্রায় ২ কোটির (অতি দরিদ্র ১১.৩ শতাংশ) কাছাকাছি মানুষ পর্যাপ্ত খাবার কেনার জন্য প্রয়োজনীয় আয় করতে পারতেন না। অর্থাৎ, খাদ্য নিরাপত্তার সঙ্কট আগ থেকেই ছিলো। করোনাভাইরাস দুর্যোগ আমাদের এই খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকিকে আরও ঘনীভূত এবং দীর্ঘমেয়াদী করবে। দুই হাজার ৬৭৫ জনের ওপর পরিচালিত ব্র্যাকের সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা যায়, জরিপকালীন ১৪ ভাগ মানুষের ঘরে কোনো খাবার ছিল না। ২৯ ভাগের ঘরে ছিল এক থেকে তিন দিনের খাবার-এর তথ্য সেই ইঙ্গিতই বহন করছে।

এত বিপদাপদের বিপরীতে, টানা লকডাউন আর সাধারণ ছুটির ফলে আমাদের শিল্প ও সেবা খাত যখন ভেঙে পড়েছে তখন আশা দেখাচ্ছে আমাদের কৃষিখাত। আসন্ন জাতীয় বাজেটে কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা বিষয়ে আমাদের প্রস্তাবনা :

১. কৃষিখাতকে আগামি বাজেটে অগ্রাধিকার খাত হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। করোনায় সৃষ্ট অর্থনৈতিক প্রতিকূলতা মোকাবেলায় ও বিপদাপন্ন মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত রাখতে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি ও সরকারি মজুদ ক্ষমতা বৃদ্ধি করা দরকার;

২. বিগত বছরগুলোর মতো সারের ভর্তুকির নামে ৯০০০ কোটি টাকা বরাদ্দের পরিবর্তে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের পানি,সেচ, বীজ, শ্রমিকের মজুরি ইত্যাদির জন্য নগদ অর্থে ভর্তুকি প্রদান করা; এবং ভর্তুকির অর্থ সরাসরি কৃষকের ব্যাংক হিসাব বা মোবাইল ওয়ালেটে প্রেরণ করা;

৩. করোনা মহামারীতে সৃষ্ট ‘নতুন দরিদ্র’, প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের বেকার এবং অভিবাসী শ্রমিকদের কৃষিতে কর্মসংস্থান তৈরি করা যেতে পারে। এজন্য সকল বেদখলকৃত জমি উদ্ধার করা এবং কৃষিজমির সুরক্ষা নিশ্চিত করা;তরুণ ও ক্ষুদ্র কৃষির উদ্যোক্তাদের জন্য আর্থিক প্রণোদনা প্রদান করা;

৪. খাদ্য ভর্তুকির জন্য বরাদ্দ বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। এসএসএনপি’র আওতায়গৃহীত অতিরিক্ত পরিবারগুলির খাদ্য সরবরাহের জন্য অতিরিক্ত ব্যয় সামঞ্জস্য করার জন্য এই অর্থবছরে বরাদ্দ বৃদ্ধি করা।

৫. কৃষিপণ্য মূল্য নির্ধারণে একটি জাতীয় মূল্য কমিশন গঠন করা। ধানের আগাম মূল্য ঘোষণা করা, কৃষক ও অন্য ক্ষুদ্র উৎপাদককে ধান-চাল ক্রয়ে ”নুন্যতম মূল্য সহায়তা’ প্রদান করা;

৬. কৃষি জন্য ঘোষিত প্রণোদনায় ‘কৃষি-উদ্যোক্তাদের জন্য’ সুদের হার সবোর্চ্চ ২ শতাংশ করা। তরুণ ও নারী কৃষি উদ্যোক্তাদের অগ্রাধিকার দেয়া। এছাাড়াও ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক- যারা সবজি, ফল-ফলাদি, পোল্ট্রি ও ড্ইেরি চাষীদের সুদবিহীন ঋণ প্রদান করা।

৭. সব্জি, ফলমূল, দুধ সহ পচনশীল পণ্য পরিবহনে ফ্রিজিং ভ্যানের ওপর শুল্ক হ্রাস করা। প্রক্রিয়াজাতকরণ উপকরণ, প্রযুক্তি উন্নয়ন ও কমিউ্ুনিটি হিমাগার তৈরিতে সহজ শর্তে/ সুদবিহীন আর্থিক সহায়তা/ বৃত্তি প্রদান করা;

৮. সরকার উৎপাদিত ধানের মাত্র ১০ শতাংশের মতো ক্রয় করে থাকে। সরকারের উচিত ধান সংগ্রহকে অগ্রাধিকারদেওয়া, প্রয়োজনে ধান কৃষকের বাড়িতে সংরক্ষণের জন্য নতুন কৌশল অনুসন্ধান করা যেতে পারে। সরকারের প্রয়োজন সরাসরি কৃষকের কাছথেকে ধান ক্রয় করা, ধানক্রয়ে লটারি সিস্টেম বাতিল করা, ধান সংগ্রহের জন্য প্রস্তুত কৃষকদের তালিকা পাবলিকপ্লেইসে প্রকাশ করা এবং মাঠ পর্যায়ে খাদ্যশস্য ক্রয়ে খাদ্য মন্ত্রণালয় ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত করা;

৯. জাতীয়ভাবে ক্ষুদ্র-কৃষক-উপযোগী শস্যবীমা চালু করা; ক্ষুদ্র ও প্রান্তিককৃষকদের মৌসুমভিত্তিক শষ্যঋণ /কৃষ্ৃিঋণ প্রদান করা।নারী কৃষককে অগ্রাধিকারদেয়া। জুমচাষীদেরকে এর আওতায় আনা।

১০. নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীর জন্য জন্য লকডাইনকালে এবং পরবর্তীতে ৬ মাস খাদ্য সহায়তা চালু রাখা। কৃষিপ্রণোদনার টাকা থেকে বর্গাচাষী ও কৃষিশ্রমিকদের নগদ সহায়তা-প্রণোদনা প্রদান করা।

১১. সাপ্লাইচেইন পুনরুদ্ধারে কৃষিপণ্য পরিবহণে রেলের মালবাহী বগি ব্যবহার ও ফ্রিজিং কম্পার্টমেন্ট চালু করা। উত্তারাঞ্চল ও দক্ষিণাঞ্চলের মধ্যে কৃষি পণ্য পরিবহণে সরাসরিট্রেন সার্ভিস চালু করা;

১২. করোনাকালে কৃষি পণ্য সরবরাহের জন্য যে সকল বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল নতুন স্বাভাবিকতা [ঘবি ঘড়ৎসধষ] পরিস্থিতিতে এই সকল ইনোভেশানের সম্প্রসারণ করতে হবে। সেজন্য ই-কমার্সের প্রসার ও অনলাইন এগ্রিকালচার মার্কেট প্লেস গড়ে তোলা, এবং কৃষকদের এ বিষয়ে দক্ষতা বৃদ্ধি করে তুলতে হবে।

১৩. আমাদের সবজি বীজের অর্ধেকটাই আসে চীন, কোরিয়া, থাইল্যান্ড, জাপান থেকে। পাট বীজের প্রায় পুরোটাই আসে বিদেশ থেকে। বীজ আমদানির এই নীতির পরিবর্তে আসন্ন বাজেটে বীজ আমদানি বাবদ বরাদ্দকৃত ১৫০ কোটি টাকা থেকে শুধুমাত্র বীজ আমদানির ছাড়াও স্থানীয়ভাবে বীজ উৎপাদনে নারীকৃষকদের ’বীজ উন্নয়ন ও সংরক্ষণ’ সহায়তা প্রদান করা এবং পারিবারিক কৃষিতে বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধি করা।

১৪. খাদ্য সংকটে পড়া মানুষের জন্য ওএম্এস/ সামাজিক নিরাপত্তা বলয় বাড়ানো এবং করোনাকালীন ও পরবর্তী সময়ে অন্তত: ১২ মাস সরকারিভাবে খাদ্য সহায়তা চালু রাখা।

১৫. খাদ্য নিরাপত্তা, কৃষিতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, নতুন দারিদ্র্য উত্তোরণ ও বিকল্প জোরদার অর্থনৈতিক খাত হিসেবে গড়ে তোলার জন্য কৃষিসংশ্লিষ্ট প্রকল্পগুলো অগ্রাধিকারভিত্তিক বাস্তবায়ন, অতিরিক্ত তহবিলের যোগান দেওয়া; ও ২০২১ অর্থবছরের মোট বাজেটের কমপক্ষে গ৬ শতাংশ কৃষিখাতে বরাদ্দ দেওয়ার জোর দাবি জানাই।

১৬. সরকারি ধানচাল ক্রয়ে লটারি সিস্টেম বাতিল করে কমিউিনিটিভিত্তিক/ জোতভিত্তিক ধানচাল ক্রয় করতে হবে।

১৭..কৃষকের ঘরে ধানচাল সংরক্ষণে ব্যবস্থা করতে হবে৤ এজন্য কৃষকদের ইউনিয়নভিত্তিক সংরক্ষণাগার গড়ে তোলা যেতে পারে

১৮. করেনাকালে কৃষিপণ্য বিপণন, পরিবহণ এবং উত্‌পাদন ও কাল্টিবিশনের ক্সেত্রে যে সকল ইনোভেশন ও বিকল্প এসেছে নতুন স্বাভাবিকতায় সেগুলোকে সম্প্রসারণের জন্য সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করতে হবে

১৯. পারিবারিক খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারিবারিক কৃষি সম্প্রসারণকরতে হবে এবং এজন্য বাজেটে বরাদ্দ রাখতে হবে৤

২০. জৈব সার উত্‌পাদন এবং ব্যবহারকে উত্‌সাক দিতে বাজেটে ‘জৈবসার ভর্তুকি প্রণোদনা’ ঘোষণা করতে হবে

২১. শুধুমাত্র ধান উত্‌পাদন নয়, অন্যান্য ফসল, মসলা, ফল উত্‌পাদন বৃদ্ধিতে জোর দিতে হবে৤ অপ্রচলিত কৃষিশষ্য উত্‌পাদনকারী কৃষকদের জন্য সরকারিভাবে কারিগরি ও আর্থিক সমর্থন যোগাতে হবে

২২. লাভজনক কৃষির সম্প্রসারণের জন্য কৃষি-বাজার ব্যবস্থা গড়ে তুলবে হবে৤ কৃষি বিপণন অধিদপ্তরকে জোরদারএবং সক্রিয় করতে হবে৤ এই বিষয়ে সরকারকে মনোযোগী হতে হবে এবং বাজেটে বরাদ্দ ও নির্দেশনা দিতে হবে

২৩. গরু/ মহিষের দুগ্ধজাত [চিজ,মাখন, মাঠা, লাবাং] স্থানীয় শিল্পের জন্য সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা দিতে হবে৤ বিদেশ থেকে পাউডার দুধ আমদানিতে শুল্ক বাড়াতে হবে

২৪. করোনা পরবর্তী সময়ে দুগ্ধ ও পোল্ট্রি খামারীদের এককালীন নগদ ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল প্রদান করা

২৫. খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য কৃষিকে অত্যাধিক গুরুত্ব দিয়ে যথেষ্ট পরিমাণে বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে। এর জন্য মোট বাজেটের ন্যূনপক্ষে ১৫ শতাংশ অর্থ বৃহত্তর কৃষি খাতের জন্য (কৃষি মন্ত্রণালয়, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ, পরিবেশ ও বন, ভূমি এবং পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়) বরাদ্দ করা উচিত।

২৬. কৃষিজমি সুরক্ষা নিরছিত করতে হবে। ‘কৃষিজমিসুরক্ষা এবং ভূমি ব্যবহার আইন’ কার্যকর করতে হবে।

২৭. গ্রামীণক্ষুদ্র ও প্রান্তিক খাদ্য উৎপাদনকারীদের নেতৃত্বে স্থানীয়ভাবে বাজার গড়ে তুলতে হবে এবং বাজারগুলোকে সাময়িক সংরক্ষণাগার, অবকাঠামো এবং পরিবহন পুল থাকতে হবে

নুরুল আলম মাসুদ
সাধারণ সম্পাদক
খাদ্য নিরাপত্তা নেটওয়ার্ক (খানি)