পর্যালোচনা ও প্রস্তাব: জাতীয় বাজেট ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর উন্নয়ন-অগ্রগমন ২০১৯

চিররঞ্জন সরকার

আদিবাসী জনগোষ্ঠী

প্রতি বছর জাতীয় বাজেটের আকার বাড়লেও কাঙ্ক্ষিত সুফল পায় না সমতল ও পাহাড়ের ৫৪টি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মানুষ। সরকারি হিসাব অনুযায়ী দেশে আদিবাসী আছে প্রায় ১৬ লাখ, বেসরকারি হিসাবে এই সংখ্যা ৩০ লাখেরও বেশি। কিন্তু রাষ্ট্রীয় নীতি ও উন্নয়ন কার্যক্রম থেকে এই জনগোষ্ঠী আজও বঞ্চনার শিকার।
‘আদিবাসী মানুষ-পাহাড়-সমতল নির্বিশেষে নিরন্তর বঞ্চিত। পার্বত্য হোক আর সমতল হোক-আদিবাসী মানুষেরা মানুষ হিসাবে উন্নয়নের কোন মানদন্ডেই ভাল নেই। জমি-জলা-জঙ্গল-এ আদিবাসী মানুষের মালিকানা বা অভিগম্যতা নেই (সামাজিক, প্রথাগত, ঐতিহ্যগত, গোষ্ঠীগত, ব্যক্তিগত)- এ মানদন্ডে আদিবাসী মানুষের হয়েছে আধোগতি। আর শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য, স্থানীয় উদ্যেগ, স্থানীয়-শাসন-কোন কিছুতেই তাদের এখন মূল ধারায় অর্ন্তভূক্ত করা যায়নি। ১৯৯৭ সালে (০২ ডিসেম্বর) ‘শান্তিচুক্তি’ খ্যাত পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরিত হবার প্রায় ২০ বছর পরেও এখনও পর্যন্ত পার্বত্য আদিবাসী মানুষের মধ্যে বঞ্চনা-বৈষম্য হ্রাসকারী জনকল্যাণকারী কোন স্থায়ী উন্নয়নের সুলক্ষণ প্রতিভাত হয়নি।’ আমরা দেখতে পাই, আর্থিক বাজেটের মধ্যেও সরকারের প্রতিশ্রুতি শুধু প্রতিশ্রুতি হিসেবেই রয়েছে। আদিবাসীদের মধ্যে নিরঙ্কুশ দারিদ্র্য ও চরম দারিদ্র্যের হার যথাক্রমে ৬৫ শতাংশ ও ৪৪ শতাংশ। চরম দারিদ্র্য আদিবাসীদের কাজ খুঁজে পাবার সামর্থ্যও তাই কম, যা তাদের অবস্থাকে আরও করুণ করে তোলে। প্রস্তাবিত বাজেটে তাই আদিবাসী জনগণের জন্যে রাষ্ট্রের এবং সরকারের প্রতিশ্রুতি ও চুক্তিগুলোর আঙ্গিকে বাজেট প্রণয়ন করা উচিত। অপরদিকে আদিবাসীদের পরিচয় সংকট ও সঠিক সংখ্যা নির্ধারণে জটিলতার ফলে আদিবাসী জনগোষ্ঠি বাজেটে বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। ২০১১ সালে সরকারি হিসেবে আদিবাসীদের সংখ্যা ১৫,৮৬,২৩২ জন । কিন্তু বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের দাবি, বাংলাদেশে ৩০ লক্ষাধিক আদিবাসী জনগণ বসবাস করেন ।

জাতীয় বাজেটে আদিবাসী জনগোষ্ঠী
জাতীয় বাজেটেও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর আকাক্সক্ষার প্রতিফলন নেই। বাজেট হলো সরকারের অর্থনৈতিক দলিল। বাজেটের মধ্য দিয়েই সরকারের যাবতীয় নীতি-কর্মসূচি বাস্তবায়নের দিকনির্দেশনা উপস্থাপিত হয়। কিন্তু আমাদের দেশের কেন্দ্রীভূত শাসন ব্যবস্থায় বাজেট প্রণয়ন প্রক্রিয়া এখনো আমলানির্ভর। বাজেট ১৬ কোটি মানুষের চাহিদার ক্ষেত্র। কিন্তু বাজেট যারা প্রণয়ন করেন তৃণমূলের মানুষের সঙ্গে তাদের কোনো যোগাযোগ নেই। এমনকি জনপ্রতিনিধিরাও বিষয়টির সঙ্গে সম্পৃক্ত নন। ফলে বাজেটে তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত সকল মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয় না, তাদের দাবির প্রতিফলনও ঘটে না। আমাদের জাতীয় বাজেটে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর আশা-আকাক্সক্ষার তেমন কোনো প্রতিফলন লক্ষ করা যায় না।
আদিবাসীদের জন্য বাজেট বরাদ্দ বলতে আমরা সাধারণত পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়-এর আওতায় যে বরাদ্দকৃত অর্থ এবং সমতলের আদিবাসীদের জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে যে থোক বরাদ্দটুকু দেয়া হয় তাকেই বুঝে থাকি। পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী ও অন্যান্যদের জন্য কিংবা এ অঞ্চলের অবস্থা পরিবর্তনে জাতীয় বরাদ্দ বাস্তবায়নে রয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়। আর সমতলের আদিবাসীদের দেখভাল করা ও তাদের উন্নয়নের বাজেট বাস্তবায়নে আজও কোনো মন্ত্রণালয় বা অধিদপ্তর নেই।
আদিবাসীদের প্রথাগত ভূমির মালিকানা ও ব্যবহার সম্পর্কে স্বীকৃতি না থাকা; খাসজমিতে বসবাসরত আদিবাসী ও দলিতদের ভূমি অধিকারের বিষয়টির উল্লেখ না থাকা; ২০১৮ সালে প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে সংস্কারের দাবি অগ্রাহ্য করে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির চাকরিতে সকল কোটা রহিতকরণের ফলে ‘উপজাতিদের’ জন্য ৫% কোটাও বিলীন করে দেওয়া, সমতলের আদিবাসীদের জন্য সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও কার্যক্রম উল্লেখ না করা; সমতলের আদিবাসীদের ভূমি অধিকার এবং তাদের অবস্থার উন্নয়নে কোনো পরিকল্পনা প্রণয়নের উল্লেখ না থাকার ফলে আদিবাসীদের আরও প্রান্তিকতার মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দকৃত বাজেট
পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামের ৩টি জেলার আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন কর্মকান্ডের সমন্বয় সাধন এবং এই অঞ্চলের জনসাধারণের সাংস্কৃতিক উন্নয়নসহ আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের যথাযথ ব্যবস্থাদি গ্রহণের কথা রয়েছে। সর্বশেষ ২০১৮-২০১৯ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম মন্ত্রণালয়ের বাজেটে বরাদ্দ ছিল ১৩০৯ কোটি টাকা।

সূত্র: বাজেটের বিভিন্ন বছরের সংক্ষিপ্তসার

কিন্তু, বরাদ্দকৃত এই অর্থ শুধুমাত্র পার্বত্য এলাকায় বসবাসকারী আদিবাসীদের জন্য প্রযোজ্য নয়। এই অঞ্চলে বসবাসকারী সেটেলার বাঙালি ও আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারি বাহিনীর উন্নয়ন খাতেও খরচ হয়। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির ২০ বছর অতিবাহিত হয়ে গেলেও এ চুক্তি পূর্ণ বাস্তবায়নে সরকারের বার বার অঙ্গীকার থাকা সত্ত্বেও পর্যাপ্ত বরাদ্দ জাতীয় বাজেটে রাখা হয় না। জুম্ম শরনার্থী ও আভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু পুনর্বাসনের জন্য ‘টাস্কফোর্স’ গঠিত হয়েছে, কিন্তু এ প্রতিষ্ঠানের জন্য ও পুনর্বাসন বাবদ জাতীয় বাজেটে আর্থিক বরাদ্দ নেই। পার্বত্য চুক্তির ফলে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ গঠিত হলেও এটি শক্তিশালীকরণে পর্যাপ্ত বরাদ্দ জাতীয় বাজেটে রাখা হয় না। তদুপরি, গতবছর লংগদুতে ২৫০টি বাড়িঘর পুড়ে নিঃস্ব অসহায় পাহাড়িদের স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিতে সরকারি বরাদ্দ পাওয়া যায় না।

সমতলের আদিবাসীদের জন্য বরাদ্দ

সূত্র: গৃহীত উন্নয়ন কর্মসূচির এডিপি বরাদ্দের সংক্ষিপ্তসার

সমতলের ২০ লক্ষাধিক আদিবাসীদের উন্নয়নে বাজেট বরাদ্দের কোন নির্দিষ্ট খাত/বিভাগ নেই। তাদের জন্য বরাদ্দ বলতে, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় হতে বাস্তবায়নাধীন উবাবষড়ঢ়সবহঃ অংংরংঃধহপব ভড়ৎ ঝঢ়বপরধষ অৎবধ (বীপবঢ়ঃ ঈঐঞ) বা “বিশেষ এলাকার জন্য উন্নয়ন সহায়তা (পার্বত্য চট্টগ্রাম ব্যতীত)” শীর্ষক কর্মসূচিকে বুঝে থাকি। ২০০৯-১০ হতে ২০১৭-১৮ বিগত ৯টি অর্থ বছরে মোট ১৫৬.০০ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল। এই কর্মসূচির উদ্দেশ্যে স্বাস্থ্য, শিক্ষাসহ বিভিন্ন আয়বর্ধক কর্মসূচির মাধ্যমে সমতলের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন। বিগত ৯ বছরের সমতলের আদিবাসীদের জন্যে অর্থাৎ ৬১ টি জেলার পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য উন্নয়ন বরাদ্দ মোটেই সঙ্গত নয়। সরকারি পরিসংখ্যানের মতে, হিসাব কষলে বিগত ২০১৫-১৬ ও ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ১ জন সমতলের আদিবাসীর জন্য গড়ে বাজেট হয় ৮০ থেকে ১০০ টাকা। ২০১৭-১৮ অর্থ বছরে তা দাঁড়ায় ১৫০ টাকায়। হিসেব কষলে, জাতীয় বাজেটে গড়ে প্রতি জনের জন্য বরাদ্দ যেখানে প্রায় ২৫,৬৯১ টাকা সেখানে পিছিয়ে পড়া বঞ্চিত একজন সমতলের আদিবাসী প্র্রেষণামূলক বার্ষিক বরাদ্দ ১৫০ টাকা। একদিকে যেমন অর্থ বরাদ্দের পরিমাণ আদিবাসী জনসংখ্যা অনুযায়ী খুবই কম আবার অন্যদিকে এ বরাদ্দকৃত অর্থ বণ্টন প্রক্রিয়ার মধ্যেও রয়েছে নানা জটিলতা। বাজেট বাস্তবায়নে আদিবাসী প্রতিনিধিদের কোন সংশ্লিষ্টতা নেই। আবার, প্রতি বছর সবগুলো উপজেলার আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে একসাথে নির্দিষ্ট পরিমাণ এ বরাদ্দ প্রদান করা হয় না। ফলে, প্রকৃত আদিবাসী উপকারভোগী জনগণ এ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীতে আদিবাসীদের অন্তর্ভুক্তিকরণ
দুঃখের বিষয় হলেও সত্যি, বিশেষ এলাকার জন্য উন্নয়ন সহায়তা (পার্বত্য চট্টগ্রাম ব্যতীত)-এ থোক বরাদ্দ ছাড়া আদিবাসীদের জীবনমান উন্নয়নে নির্দিষ্ট করে কোন কার্যক্রম বা বরাদ্দ এখানে চোখে পড়ে না। গত বছর সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় ৫৪,২৬০ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল। যেখানে আদিবাসীদের জন্য একটি থোক বরাদ্দ রয়েছে মাত্র ৩০ কোটি টাকার, যা সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর মোট বরাদ্দের মাত্র ০.০৫%। যার ফলে আদিবাসী পিছিয়ে পড়া মানুষ বাজেটের খাতভূক্ত বরাদ্দে বরাবরই অবহেলিত থেকে যাচ্ছে। সমতলের আদিবাসীদের জন্য বিগত ৩ অর্থ বছরে ১৬০টি উপজেলায় ৪০০টি আয়বর্ধনমূলক প্রকল্পে ৯.৮০ কোটি টাকা খরচ হয়। সমতলের সহজ সরল আদিবাসীরা আমলাতন্ত্রের জটিলতার মধ্যে
কতটুকু এই উপকার ভোগ করতে পেরেছে, তা সত্যিই ভাবার বিষয়। তাছাড়া সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর অন্যান্য কর্মসূচি যেমন: ভিজিএফ, ভিজিডি, এফএফই, কাবিখা, কাবিটা ইত্যাদিতেও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্তি খুবই কম।

মন্ত্রণালয়ভিত্তিক আদিবাসী বাজেট চাই
পার্বত্য চট্টগ্রাম মন্ত্রণালয়ে (যেখানে আদিবাসীদের জন্য একটি অংশ বরাদ্দ থাকে) ১,১৫০ কোটি টাকা আর সমতলের জন্য মাত্র ৩০ কোটি টাকা বরাদ্দ আদিবাসীদের জন্য যথেষ্ট নয়। আবার সমতলের আদিবাসীদের জন্য বড় সমস্যা হলো তাদের উন্নয়নে বরাদ্দ বাস্তবায়নে সরাসরি কোন মন্ত্রণালয় বা খাত নেই। প্রধানমন্ত্রীর অধীনে একটি থোক বরাদ্দ রয়েছে যা বর্তমানে মাত্র ৩০ কোটি টাকা। হিসেব কষলে সমতলের একজন আদিবাসীর ভাগে পড়ে মাত্র ১৫০ টাকা। দীর্ঘ সময় থেকে বঞ্চিত হয়ে আসা সমতলের আদিবাসী কিংবা গোবিন্দগঞ্জের বাগদা ফার্ম থেকে উচ্ছেদকৃত হাজারো সাঁওতাল পরিবার যারা খোলা আকাশের নিচে বসবাস করছে তাদের কাছে এ অর্থ উপহাস ছাড়া কিছুই নয়। এটা দিয়ে সমতলের ২০ লক্ষাধিক মানুষের জীবনমান উন্নয়ন কোনভাবেই সম্ভব নয়। তার চেয়েও দুঃখজনক ব্যাপার হলো, এই অর্থ বাস্তবায়নে সমতলের আদিবাসীদের কোন অংশগ্রহণ বা ক্ষমতা নেই।

আদিবাসীদের অধিকার বাস্তবায়নে জাতীয় বাজেটে বরাদ্দের প্রস্তাব
আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবনে উন্নয়নের বিকাশ ঘটাতে হলে প্রয়োজন জাতীয় বাজেটে আদিবাসীদের জন্য বরাদ্দ বৃদ্ধি ও বরাদ্দের সুষ্ঠু বাস্তবায়নে আদিবাসীদের সম্পৃক্তকরণ। তখন খুব সহজে তারা দেশের মূল ¯্রােতের জনগণের সহিত সামনে অগ্রসর হবার সুযোগ পাবে এবং ক্রমান্বয়ে অনগ্রসরতা কাটিয়ে দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারবে। আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর উন্নয়নের জন্য এই সময়ে আমাদের প্রস্তাবÑ
১. আদিবাসী জনগণের উন্নয়নের জন্য খাতভিত্তিক ও মন্ত্রণালয়ভিত্তিক বাজেট বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে; সকল মন্ত্রণালয়ের/বিভাগের বাজেটে আদিবাসীদের জন্য সুনির্দিষ্ট বরাদ্দ রাখা এবং বরাদ্দের সুষ্ঠু বাস্তবায়নে আদিবাসীদের সম্পৃক্ত করতে হবে এবং এ বিষয়ে একটি নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে;
২. জাতীয় বাজেট বক্তৃতায় আদিবাসী বিষয়ে স্পষ্ট বিবরণী থাকতে হবে। আদিবাসী জনগণের সঠিক সংখ্যা নিরূপণ এবং সংখ্যার ভিত্তিতে আদিবাসীদের বাজেট বৃদ্ধি করতে হবে; বাজেট বরাদ্দ সাধারণত হয় মন্ত্রণালয়ভিত্তিক। সংখ্যাগরিষ্ঠ আদিবাসীর বাস সমতলে। সমতলের আদিবাসীদের বিষয়টি দেখার জন্য এখনও কোনো মন্ত্রণালয় বা বিভাগ নেই। তাই, সমতলের আদিবাসীদের জন্য একটি পৃথক মন্ত্রণালয় গঠন করতে হবে; এজন্য বাজেটে বরাদ্দ রাখতে হবে;
৩. পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি ১৯৯৭ এর পূর্ণ বাস্তবায়নে এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি-বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন ২০০১-এর যথাযথ বাস্তবায়ন ও ভূমি কমিশনের কাজ ত্বরান্বিত করার জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে বরাদ্দ রাখতে হবে। পার্বত্য চট্টগ্রাম মন্ত্রণালয়, পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ ও জেলা পরিষদসমূহের বাজেট বৃদ্ধি করতে হবে। পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ ও পার্বত্য জেলা পরিষদের সুশাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা শক্তিশালীকরণে পর্যাপ্ত বাজেট রাখতে হবে; জুম্ম শরনার্থী ও আভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু পুনর্বাসনের জন্য ‘টাস্কফোর্স’ ও পুনর্বাসন প্রক্রিয়া বাস্তবায়নে জাতীয় বাজেটে পর্যাপ্ত আর্থিক বরাদ্দ রাখতে হবে;
৪. আদিবাসী বা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সাংস্কৃতিক একাডেমিগুলোতে আদিবাসী সংস্কৃতি উন্নয়নে বরাদ্দ বৃদ্ধি করতে হবে। শুধু নাচ-গান নয়, এ একাডেমিগুলোতে আদিবাসীদের সাংস্কৃতিক উন্নয়ন ও গবেষণার জন্য বিশেষ বরাদ্দ রাখতে হবে;
৫. সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী ও সামাজিক ক্ষমতায়নের বাজেট খাতে আদিবাসীদের উন্নয়নে নির্দিষ্ট প্রকল্প/কার্যক্রম হাতে নিতে হবে এবং নিরাপত্তা বেষ্টনীর অন্যান্য কার্যক্রমেও তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিতকরণে নির্দেশনা থাকতে হবে;
৬. উচ্চ শিক্ষা ও কারিগরী শিক্ষায় বৃত্তিসহ আদিবাসী নারী ও তরুণদের আত্ম-কর্মসংস্থানের জন্য বাজেট বরাদ্দ থাকতে হবে।
৭. আদিবাসীদের মাতৃভাষায় প্রাথমিক স্তরের শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য জাতীয় বাজেটে পর্যাপ্ত বরাদ্দ রাখতে হবে।
৮. আদিবাসীদের পৃথক পৃথক জাতিস্বত্ত্বা এবং পরিচয়ের সাংবিধানিক স্বীকৃতি প্রদান এবং আদিবাসী বিষয়ক আন্তর্জাতিক সনদসমূহে স্বাক্ষর নিশ্চিত করা; যথাযথ গবেষণার মাধ্যমে অন্তর্ভুক্তির বিষয়গুলো চিহ্নিত করে বিদ্যমান আইন ও নীতিসমূহকে আদিবাসীদের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক করা;
৯. সরকারি সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে আদিবাসীদের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক করার লক্ষ্যে সেবাপ্রদানকারীদের দৃষ্টিভঙ্গি ও চর্চা পরিবর্তনের জন্য সচেতনতামূলক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা; সমতলের আদিবাসীদের ভূমি সমস্যা সমাধানে পৃথক ভূমি কমিশন গঠন এবং তাদের জমির মালিকানা সমস্যার কার্যকর নিষ্পত্তি;
১০. আদিবাসীদের আর্থসামাজিক অবস্থা ও মর্যাদার উন্নয়নে তাদের মতামতের ভিত্তিতে সামাজিক নিরাপত্তাসহ অন্যান্য পদক্ষেপ গ্রহণ এবং পদক্ষেপসমূহ কার্যকর করতে জনঅংশগ্রহণ, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি কাঠামো তৈরি ও সেগুলোর চর্চা নিশ্চিত করা।
সংবিধানের ২৩ (ক) ধারায় দেশের জাতিগত সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘রাষ্ট্র বিভিন্ন উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃ-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের অন্যান্য বৈশিষ্ট্যপূর্ণ আঞ্চলিক সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্য সংরক্ষণ, উন্নয়ন ও বিকাশের ব্যবস্থা গ্রহণ করিবে।’ অর্থাৎ বাংলাদেশের সংবিধানের যে অঙ্গীকার- ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষভেদ বা জন্মস্থান নির্বিশেষে সব মানুষ সমান- তার মূল সুরকে ধারণ করে যদি উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হয় তাহলে প্রয়োজন এক নবতর উন্নয়ন দৃষ্টিভঙ্গি। আর তার সূচনা হতে পারে দলিত ও আদিবাসীদের মতো সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর নাগরিকদের জন্য বিশেষ উন্নয়ন ও নীতি পরিকাঠামো তৈরির উদ্যোগ নেওয়ার মধ্য দিয়ে।