বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবাখাত ও জাতীয় বাজেট ২০১৯

আমিনুর রসুল বাবুল
জাকির হোসেন

বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা খাত
আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের জন্য স্বাস্থ্যসেবার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।স্বাস্থ্য অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মানবাধিকার এবং সর্বজনীনভাবে স্বীকৃত মানব উন্নয়নের সূচক।এ কারণে সাংবিধানিকভাবে ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বাস্থ্যসেবার বিষয়টিকে মানুষের সার্বিক সক্ষমতার জন্য অগ্রাধিকার দিয়ে উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে স্থান দেয়া হয়েছে।
মানব উন্নয়নের সূচক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ এ খাতে বাজেট বরাদ্দের ক্ষেত্রে সরকার অগ্রাধিকারের কথা বলে থাকে। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতিতে দেখা যায় দরিদ্র, প্রান্তিক জনগণ এখনো স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। স্বাস্থ্যসেবার ওপর পরিচালিত একটি সামাজিক নিরীক্ষা থেকে প্রাপ্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, স্বাস্থ্যখাতে বিরাজমান সমস্যাগুলোর মধ্যে জনবল সংকট, চিকিৎসা সেবার জন্য পর্যাপ্ত যন্ত্রপাতি এবং উপকরণের অভাব, অবকাঠামোর অভাব, আঞ্চলিক বৈষম্য, বাজেটে অপর্যাপ্ত বরাদ্দ এবং সর্বোপরি স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও ব্যবস্থাপনার ঘাটতি রয়েছে।
উন্নয়নের উপায় ও লক্ষ্য হলো মানুষের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা। সে কারণে সক্ষমতার সাথে সম্পর্কিত পুষ্টি, স্বাস্থ্য ও শিক্ষাকে গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হয়। কেননা স্বাস্থ্যসেবার মতো গুরুত্বপূর্ণ সেবাখাতের উন্নয়ন শুধুমাত্র অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিই নয়, এটি জীবনের গুণগত মান ও সামাজিক প্রগতির ভিত্তি স্বরূপ। এছাড়া স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নকে দারিদ্র্য নিরসনের কৌশল হিসাবেও গণ্য করা হয়। সমাজের সুষম উন্নয়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সেবাখাতে শ্রেণী-লিঙ্গ-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলের অভিগম্যতা নিশ্চিত করা অত্যাবশ্যক।
ধনী-গরীব সকলের জন্য মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবায় সরকারি বরাদ্দের ঘাটতি, ব্যক্তি পর্যায়ে অত্যাধিক ব্যয়, সুশাসনের অভাব, স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তিতে গ্রাম-শহর, ধনী-দরিদ্র অসম সুযোগ ও বঞ্চনা সকলের জন্য মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তিতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। এর সাথে রয়েছে স্বাস্থ্যসেবায় জনবল সংকট ও এর বিন্যাসে আঞ্চলিক বৈষম্য; রয়েছে অবকাঠামো, আধুনিক যন্ত্রপাতি, জবাবদিহিতা ও ব্যবস্থাপনার সংকট। এজন্য স্বাস্থ্যখাতের বাজেট বিশ্লেষণ ও জনঅংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আমাদের জাতীয় পরিকল্পনা ও বাজেট বরাদ্দে সবার জন্য স্বাস্থ্যের বিষয়টি অগ্রাধিকার হিসাবে বলা হলেও এই খাতে প্রধান সমস্যাগুলো সমাধানের বিষয়টি আমাদের জাতীয় বাজেটে খুব একটা প্রাধান্য পায় না। আমাদের জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনার ক্ষেত্রে দাতাদের নির্দেশিত উন্নয়ন পরিকল্পনার প্রভাব থাকায় স্বাস্থ্যের মত সেবাখাতগুলোতে বেসরকারিকরণ প্রক্রিয়ায় নিতে বাধ্য করা হচ্ছে। এতে বাড়ছে অর্থনৈতিক বৈষম্য। ফলে দেখা যাচ্ছে, সেবা খাতগুলোতে বাজেট বরাদ্দ বাড়ছে না, অনেক ক্ষেত্রে নিম্নগামী।
বাজেট কেন্দ্রীয়ভাবে প্রণীত হয় বলে, এখানে অঞ্চলভিত্তিক অগ্রাধিকারমূলক চাহিদাগুলোকে খুব একটা গুরুত্ব দেয়া হয়না বলে বাজেটের সুষম বণ্টন হয়না। এছাড়া বরাদ্দকৃত বাজেটের যথাযথ ও কার্যকর বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাব থাকায় জনগণ যে সরকারি সেবা প্রতিষ্ঠান থেকে যে ধরনের সেবা পাওয়ার কথা তা পায় না। দেখা যায়, স্বাস্থ্যসেবার জন্য সরকারিভাবে গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপ সম্পর্কে সকল মানুষের তথ্যে অভিগম্যতা না থাকায় সাধারণ জনগণ সেবা প্রাপ্তি থেকে নিয়মিত বঞ্চিত হচ্ছে। স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তির চাহিদা শ্রেণী-লিঙ্গ-বর্ণ-ধর্ম নির্বিশেষে সকলের। সরকারি অর্থের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মধ্যে দিয়ে দরিদ্র ও বঞ্চিত জনগণ যাতে তাদের প্রাপ্য সেবা পায় সেজন্য রাষ্ট্রকেই দায়িত্ব নিতে হবে।

 

স্বাস্থ্যখাতে রুগ্ন বাজেট
জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ টাকার অংশ বাড়লেও মূল বাজেট ও জিডিপি অনুপাতে বাড়েনি। গত কয়েক বছর ধরে জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ মোট বাজেটের তুলনায় ও জিডিপি’র শতকরা হার কমেছে। বর্তমান সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে এসেছে ২০০৯ সালে, ক্ষমতায় আসার পর ২০০৯-১০ সালে যে বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছিল তাতে স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ ছিল মোট বাজেটের ৬.২ শতাংশ এবং জিডিপির ০.৯০ শতাংশ; আর সেখানে সর্বশেষ ২০১৮-১৯ বাজেটে স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ ধরা হয়েছে মোট বাজেটের ৫.০ শতাংশ এবং জিডিপির ০.৯ শতাংশ। প্রকৃতপক্ষে স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ টাকার অঙ্কে বাড়লেও মোট বাজেট ও জিডিপি’র অনুপাতে সেই পরিমাণ হতাশাব্যাঞ্জক।


সূত্র: বাজেটের সংক্ষিপ্তসার, অর্থ মন্ত্রণালয়

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খরচ: সরকারি খরচ সর্বনিম্ন এবং ব্যক্তিপর্যায়ে খরচ সর্বোচ্চ
সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে স্বাস্থ্যখাতে রোগীর নিজস্ব অর্থ খরচ সবচেয়ে বেশি এবং এই খরচ ক্রমেই বাড়ছে। বর্তমানে দেশের মোট স্বাস্থ্যব্যয়ের মাত্র ২৩ শতাংশ বহন করে সরকার, ১৯৯৭ সালে সরকারের অংশ ছিল ৩৭%। বেসরকারী এনজিও ও স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানগুলো ৩% এবং দাতা সংস্থাগুলো ৭% পর্যন্ত ব্যয় বহন করে থাকে। আন্তর্জাতিক মানদন্ডে বাংলাদেশের মাথাপিছু স্বাস্থ্যব্যয় (সরকারি, বেসরকারি এবং ব্যক্তিগত) সর্বনি¤œ পর্যায়ে রয়েছে। যা মাত্র ২৭ ডলার। যেখানে ভারতে ৬১ ডলার এবং মালয়েশিয়ায় ৪১০ ডলার। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে স্বাস্থ্য সেবায় মান উন্নয়নের জন্য এই খাতে ব্যয় হওয়া আবশ্যিক ৪০ ডলার। স্বাস্থ্য খাতে ন্যূনতম ব্যয়ে বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে আছে। লক্ষণীয় বিষয় হলো: এই দেশগুলোর মধ্যে মোট স্বাস্থ্যব্যয়ের সরকারি ব্যয় বাংলাদেশে সবচেয়ে কম (২৩%)। যেখানে ভারতে ৩৩% এবং নেপালে ৪০%। অপরদিকে স্বাস্থ্যখাতে ব্যক্তিগত পর্যায়ে ব্যয়ে বাংলাদেশ সর্বোচ্চ (৬৩.৩%), ভারত ৫৭.৩% এবং নেপাল ৪৯.২%।


তথ্য সূত্র:Bangladesh National Health Accounts 1997-2012, Ministry of Health and Family Welfare, Gov of Bangladesh

বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাত: জনবল সংকট ও দূরাবস্থা
বাংলাদেশে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মাপকাঠি অনুযায়ী জনসংখ্যা অনুপাতে প্রয়োজনীয় সংখ্যক জনবলের ও অভাব রয়েছে। আবার এই জনবলের মধ্য রয়েছে আনুপাতিকভাবে ভারসাম্যের অভাব। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে প্রতি ১০,০০০ জনের জন্য স্বাস্থ্যকর্মী প্রয়োজন কমপক্ষে ২৩ জন। সেখানে বাংলাদেশে রয়েছে মাত্র ৫.৮ জন। যেখানে চিকিৎসক ও নার্সের অনুপাত হবে ১.৩; বাংলাদেশে চিকিৎসক নার্সের আনুপাতিক হার ০.৬।

সার্কভুক্ত দেশসমূহের তুলনামূলক চিত্র: প্রতি ১০,০০০ জনে স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যার অনুপাত:

তথ্য সূত্র: HRH data sheet, MoHFW, GoB, 2014

যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত চিকিৎসা সাময়িকী ল্যান্ডসেটের তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা দানকারীদের ৯৪% অদক্ষ। চিকিৎক তৈরীর সব প্রতিষ্ঠান মানসম্মত নয়। সেইসাথে রয়েছে সরকারি হাসপাতালগুলোতে শূণ্য পদ পূরণের বিলম্ব ও বিন্যাসে বৈষম্য। অপরদিকে যেসকল জেলা সমূহে দারিদ্রতার মাত্রা বেশী সেসব জেলা স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দে এখনো পিছিয়ে আছে। যেসব জেলায় ধনী মানুষের বসতি বেশী সেসব জেলায় সরকারি ব্যয়ও বেশী। মোট স্বাস্থ্য বাজেটের ৪১% ব্যয় হয় ঢাকা জেলায়, চট্রগ্রাম জেলায় ব্যয় হয় ১৮%। সবচেয়ে কম ব্যয় হয় সিলেট ও বরিশাল বিভাগে মাত্র ৪% ও ৫%।

স্বাস্থ্যখাতে বাজেট প্রণয়ন প্রক্রিয়া সম্পূর্ণভাবে কেন্দ্রীভূত
বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতে বাজেট প্রক্রিয়া কেন্দ্রীভূত। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রণীত বিধিমালা অনুসারে উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ও তার নিচের প্রতিষ্ঠানসমূহে স্বাস্থ্য বাজেট নির্ধারিত হয়। এখানে জেলার সিভিল সার্জন কার্যালয়ের কোনো ভূমিকা নেই। সুযোগ নেই স্থানীয় চাহিদার আলোকে নতুন কোন খাত অন্তর্ভুক্তির বা কোন খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির। দেশের উপকূল, চরাঞ্চল, হাওড় ও দুর্গম পার্বত্যাঞ্চল যেখানে দুর্বল যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে সরকারি চিকিৎসা কেন্দ্রে সেবা নেয়ার সুযোগ সীমিত, সেখানে অঞ্চলভিত্তিক চিকিৎসা সেবা বা উপযোগী বাহনের কোন ব্যবস্থা নেই। অপরদিকে ঐতিহ্যবাহী লোকজ অভিজ্ঞতা ও চিকিৎসা পদ্ধতি কাজে লাগানোর বিষয়ে বরাদ্দের ক্ষেত্রে জাতীয় বাজেট সম্পূর্ণভাবে উদাসীন।
এছাড়াও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন জনগোষ্ঠী ও ক্রমবর্ধমান প্রবীণ জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবার বিষয়টি জাতীয় বাজেটে উপেক্ষিত। বাংলাদেশে ৬০ বছরের বেশি বর্তমান জনসংখ্যা ৯.৮ মিলিয়ন (৬.৫% মোট জনসংখ্যার)। যা আগামী ২০২৬ সনে হবে ১৮.২ মিলিয়ন। বাজেটে প্রবীণ স্বাস্থ্য সেবা খাতে সুস্পষ্ট দিক নির্দেশনা থাকা উচিত। এজন্য কমিউনিটি ক্লিনিকে কর্মরত সকল স্বাস্থ্যকর্মীর ফিজিওথেরাপি প্রশিক্ষণ ও সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।

চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশ সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা অর্জনে ইতোমধ্যে অনেকখানি সফলতা অর্জন করেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু ২০০০ সালে ছিল ৬৫.৩ বছর যা বর্তমানে ৭২.০০ বছরে উন্নীত হয়েছে। পরিবার পরিকল্পনা সুবিধা পেয়ে থাকে ৭৩%; শিশুদের টিকা দানের অর্জন ৯৭%; অত্যাবশ্যকীয় ঔষধ সুবিধার আওতায় আনা হয়েছে ৬৫% মানুষকে; মাতৃমূত্যু হার ২০১৮ সালে প্রতি একলাখে ১৭২ জন যা ২০১৫ সালে ছিল ১৮১ জন; প্রতি ১ হাজারে নবজাতকের মৃত্যু ২০১৫ সালে ছিল ২০, যা ২০১৮ সালে কমে হয় ১৭ জন। ৫ বছরের নিচে শিশুমৃত্যূর হার প্রতি হাজার জনে ২০০০ সালে ছিল ৮৮ জন, যা ২০১৬ সালে ৩০ জনে নেমে এসেছে।
স্বাস্থ্যসেবা যাদের প্রয়োজন তারা তা সব সময় সমানভাবে পায় না। ধনী-গরিবের মধ্যে স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে বিশেষ করে বেসরকারি পর্যায়ে ব্যবধান করছে। বেসরকারি পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা অন্য সব পণ্যের মতোই যেন কেনা-বেচার ব্যাপার। অথচ এরসাথে মানুষের বাঁচা-মরা, রোগ পরবর্তী জীবন যাপনের সম্পর্ক রয়েছে। কেও সঠিক চিকিৎসা না পেলে অনেক ক্ষেত্রে আজীবন পঙ্গুত্ব বরণ করতে হয়; তখন তারা অন্যের এবং সমাজের বোঝা হয়ে দাঁড়ায়।
আমাদের দেশে সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ইউনিয়ন পর্যায় থেকে শুরু করে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে। সরকারি স্বাস্থ্যসেবা বিনামূল্যে সরবরাহ করা হলেও সাম্প্রতিক সময়ের এক গবেষণা অনুযায়ী দেশে স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের জন্য ৬৪% খরচই পকেট হতে বহন করতে হয়। ইতোপূর্বে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের ২০০৬-২০০৭সালের একটি জরিপেও দেখা গেছে, স্বাস্থ্যসেবা নিতে গেলে প্রধান খরচ (৬৪%) জনগণই বহন করে, ২৬% সরকার বহন করে এবং বাকী ছিটে ফোটা বহন করে এনজিও, প্রাইভেট সেক্টর, ইন্সুরেন্স কোম্পানী ইত্যাদি (মোঃ আসাদুল ইসলাম, স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিট, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়)।
প্রতিরোধ ও প্রতিকারমূলক কার্যক্রম গ্রহণের মাধ্যমে সবার জন্য সর্বত্র সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব। শুধুমাত্র প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে এ লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব নয়। প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসাবে নিরাপদ ও পুষ্টিমান সম্পন্ন খাদ্য, সুস্থ পরিবেশ, দূষণমুক্ত পানি ও বায়ু, মাদক ও তামাকের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ, মাঠ, পার্ক, জলাধার, হাঁটার পথ ব্যবহার উপযোগিতার নিশ্চয়তা বিধান করতে হবে। প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা হিসাবে আধূনিক যন্ত্রপাতি সম্বলিত প্রয়োজনীয় সংখ্যক হাসপাতাল ও ডায়াগনোস্টিক সেন্টার স্থাপন, চিকিৎসক, সেবিকা, প্যারামেডিক্স ও অন্য সহযোগি নিয়োগ, তাদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে মানসম্মত দক্ষ জনশক্তিতে রুপান্তর করতে হবে। এছাড়াও জনগণকে সচেতন করতে হবে।
স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে বিভিন্ন শ্রেণীর জনগোষ্ঠীর মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর অধিকাংশের মধ্যে স্বাস্থ্য সচেতনতার অভাব রয়েছে।চিকিৎসার জন্য সামান্য খরচের সামর্থ্যটুকুও অনেকের নেই। তাই নিরুপায় হয়ে চিকিৎসককে এড়াতে গিয়ে তারা হাতুড়ে ডাক্তার, কবিরাজ, ঔঝা-বৈদ্য এমনটি ভূঁয়া পীরদের কাছে অপচিকিৎসার শিকার হচ্ছে।

সুপারিশ:

১. বাংলাদেশের স্বাস্থখাতে বাজেট প্রণয়নে কেন্দ্রীভূত প্রক্রিয়া থেকে সরে আসতে হবে। জেলা পর্যায়ের সমন্বয় ও স্থানীয় চাহিদার আলোকে বাজেট প্রণয়ন প্রক্রিয়া শুরু কতে হবে;
২. স্বাস্থ্যখাতে সকল শূণ্যপদ অনতিবিলম্বে পূরণ করতে হবে। প্রত্যন্ত ও পার্বত্য অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবার দিকে সরকারের নজর দিতে হবে। চরাঞ্চলের জন্য প্রয়োজনীয় ‘রিভার এম্বুলেন্স’ প্রদান করতে হবে;
৩. স্বাস্থ্য বাজেটের বরাদ্দকৃত অর্থের অসমতা দূর করতে হবে। অঞ্চলভিত্তিক চাহিদা ও প্রয়োজনেরভিত্তিতে বাজেট বরাদ্দ প্রদান করতে হবে। সারাদেশে দক্ষ চিকিৎসকের সূষম বন্টন এবং অধিক সংখ্যক নার্স তৈরির উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে;
৪. চিকিৎসকদের নিয়মিত কর্মস্থলে উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে; এর সাথে সাথে স্বাস্থ্যখাতে সকল প্রকার অপচয়, অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতি দূর করতে হবে। ওষুধ শিল্পের মান ও মূল্য উভয়ই নিয়ন্ত্রণ করতে হবে;
৫. স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে লোকজ জ্ঞান ও চিকিৎসকদের মূল্যায়ন ও উৎকর্ষ সাধনে যথাযথ বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে;
৬. সকল পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের মান উন্নয়ন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণে প্রতিটি হাসপাতালে ব্যবস্থাপনা কমিটির সভা সচল ও নিয়মিত করতে হবে;
৭. ব্যক্তি পর্যায়ে ও সরকারি পর্যায়ে চিকিৎসা ব্যয়ের অসমতা দূর করতে হবে;
৮. টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ও প্রেক্ষিত পরিকল্পনার আলোকে এবং সকলের জন্য মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকারকে বাস্তবসম্মত পথ নির্দেশিকা ঘোষণা করা এবং সম্ভব হলে সকলের জন্য সরকারিভাবে স্বাস্থ্য বীমার ব্যবস্থা চালু করতে হবে।