বৈষম্য কমাতে জাতীয় বাজেটে স্পষ্ট নির্দেশনা চাই ২০১৯

‘অর্থনৈতিক ন্যায্যতা’ সামাজিক-রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার পূর্বশর্ত। সমাজে ‘অর্থনৈতিক ন্যায্যতা’ প্রতিষ্ঠার জন্য বিদ্যমান বৈষম্য নিরসনের কার্যকর নীতি ও কর্মসূচির বাস্তবায়ন প্রয়োজন। সুবিবেচনাপ্রসূত রাজস্ব-নীতি যেমন বৈষম্যের লাগাম টেনে ধরতে পারে, তেমনি হঠকারি অগণতান্ত্রিক নীতি-কৌশল বৈষম্য বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। সরকারের আয়-ব্যয়ের ধরণ তথা বাজেট প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের বৈশিষ্ট্যের ওপর ও নির্ভর করে বৈষম্যের হ্রাস-বৃদ্ধি। বাংলাদেশের সংবিধানসহ সরকারের বিভিন্ন নীতি-পরিকল্পনায় বৈষম্য নিরসনের বিষয়ে অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়েছে।
সমাজে বৈষম্যের বিভিন্ন দিক রয়েছে; সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক। বয়স, জেন্ডার, এথনিসিটি, মেজরিটি-মাইনরিটি হলো সমাজ-সংস্কৃতিসৃষ্ট বৈষম্য। আয়-সম্পদের বৈষম্যের ফলে ধনী-দরিদ্রের সৃিষ্ট হয়। বৈষম্যের এ উভয়দিক পরস্পরের পরিপূরক। উন্নয়ন আলোচনায় আয় ও সম্পদ বন্টন বৈষম্যের বিষয়টি সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয়। আমাদের এ সংক্ষিপ্ত আলোচনা এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে।

বাংলাদেশে বৈষম্যের চালচিত্র
আমাদের দেশে গত দুই-দশক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার গত দুইদশক ধরে ৫% এর বেশি। বেশ কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশ ৬% শতাংশের বেশি হারে জিডিপির প্রবৃদ্ধি অর্জন করে চলছে। অপরদিকে আশংকাজনক হারে আয় ও সম্পদ বন্টন বেষম্য বৃদ্ধি পাচ্ছে।
লেখচিত্র :জিডিপি প্্রবৃদ্ধিরশতকরাহার, ২০১০-২০১৭

সূত্র: বাংলদেশ অর্থনৈতিকসমীক্ষা, ২০১৮

অর্থনীতিতে আয়-বৈষম্য পরিমাপের সবচেয়ে বহুল ব্যবহূত পরিমাপক হলো- জিনিসহগ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) পরিচালিত ‘খানাআয়-ব্যয়জরিপ ২০১৬’-এ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী জিনিসহগ ২০১০ সালের ছিল ০. ৪৬৫; ২০১৬ সালে এটা বেড়ে দাড়িয়েছে ০.৪৮৫। যেসব দেশের ‘জিনিসহগ’ ০.৫ অতিক্রম করে সেসব দেশকে উন্নয়ন তত্ত্বে উচ্চ আয়-বৈষম্যের দেশ হিসেবে অভিহিত করা হয়। বাংলাদেশ এর কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। উল্লেখ্য যে, সরকারি উদ্যোগে কখনো সম্পদ বৈষম্য পরিমাপ করা হয় না। তবে কয়েক বছর আগে সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি)’র উদ্যোগে সম্পদ বৈষম্য পরিমাপের চেষ্টা করা হয়। সেখানে দেখা যায়, বাংলাদেশে সম্পদ বৈষম্যের ক্ষেত্রে ‘জিনিসহগ’ ০.৭৪। অর্থাৎ বলা যায়, সম্পদ বৈষম্যের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ইতিমধ্যেই উচ্চ বৈষম্যের স্তরে পৌঁছে গেছে।
সরকারের নিজস্ব পরিসংখ্যানসহ বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে বাংলাদেশে ক্রমবর্ধমান আয় ও সম্পদ বৈষম্যের চিত্র উঠে এসেছে। সর্বশেষ খানা আয়-ব্যয় জরিপের তথ্য বিশ্লেষণ থেকে দেখা যায়, ২০১০ সালে দেশের ১০ শতাংশ উচ্চবিত্ত ধনাঢ্য ব্যক্তির দখলে মোট আয়ের ৩৫. ৮৪ শতাংশ। ২০১৬ সালে বেড়ে দাড়িয়েছে ৩৮.১৬ শতাংশ। অন্যদিকে দেশের ১০ শতাংশ দরিদ্র মানুষ ২০১৬ সালে মোট আয়ের মাত্র ১.১ শতাংশের মালিক হতে পেরেছে; যেখানে ২০১০ সালেতারা মোট আয়ের ২ শতাংশের মালিক ছিল। এটাই প্রমান করে একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর হাতে যে আয় ও সম্পদ পুঞ্জীভূত হয়ে যাচ্ছে।
২০১০ সালের তুলনায় ২০১৬ সালে ওপরের দিকের ৫ শতাংশ পরিবারের আয় বৃদ্ধি পেয়েছে ৮৮.১ শতাংশ; অন্যদিকে একই সময়ে নীচের দিকের ৫ শতাংশ পরিবারের আয় নেমে গেছে ৫১.৩ শতাংশ। নীচ ও ওপরের দিকের এই পার্থক্য ১২১.৩ গুন। লন্ডন ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘ওয়েল্থএক্স’র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ‘অতিধনী’ লোকের সংখ্যা বৃদ্ধির হার বিশ্বে সর্বোচ্চ। এ দেশে ৩ কোটি ডলার বা ২৫০ কোটি টাকার সম্পদ রয়েছে এমন মানুষের সংখ্যা বেড়েছে ১৭.৩ শতাংশ হারে।
প্রগতিশীল কর ব্যবস্থার অনুপস্থিতি, সম্পদের ওপর কর ধার্য না করা এবং সরকারি ব্যয়ের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার নির্ণয়ে সমস্যা সামগ্রিকভাবে বৈষম্য পরিস্থিতিকে চরম অবস্থার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

সারণী১ : খানা পর্যায়ে আয় বন্টনের শতকরা হার এবং জিনিসহগ

সূত্র :খানাআয়-ব্যয়জরিপ ২০১৬

ক্রমবর্ধমান আয় ও সম্পদেও বৈষম্য দারিদ্র্য হ্রাসের হারকে ক্রমেই শ্লথ করে ফেলছে।বাংলাদেশে ২০১০ থেকে ২০১৬ মেয়াদে প্রতিবছর গড়ে ১ দশমিক ২ শতাংশ হারে দারিদ্র্য কমেছে।এর আগের পাঁচবছর (২০০৫-১০) মেয়াদে দারিদ্র্য হ্রাসের হার ছিল প্রতিবছর ১.৭ শতাংশ।

আয় ও সম্পদ বৈষম্য কমাতে সুপারিশ

  • বাজেটে প্রগতিশীল কর ব্যবস্থার প্রবর্তন করতে হবে। ধনীদের কাছ থেকে উচ্চ হারে কর আহরণ; শুধু আয় নয় সম্পদের ওপরও করারোপ করতে হবে।
  • দরিদ্র্যদের আরো বেশি বেশি নগদ অর্থ দিতে হবে: ‘ডাইরেক্ট ট্রান্সফার’ বাড়াতে হবে, বিশেষ করে বয়স্ক ভাতার সংখ্যা ও পরিমাণ, পেনশন স্কীম এবং দরিদ্র্য নারীদের আরো সুযোগ সুবিধা প্রদান। তাছাড়া শিক্ষা-স্বাস্থ্য-পরিবহন ইত্যাদি খাতে বরাদ্দ/সাবসিডি দিতে হবে।
  • সর্বব্যাপী ঘুষ-দুর্নীতি কমাতে হবে।এটা মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির পাশাপাশি সম্পদের বৈষম্যও সৃষ্টি করে।
  • সর্বোপরি বৈষম্য কমাতে হলে ‘উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান’ সৃষ্টি করতে হবে। যেহেতু আমাদের অর্থনীতি বেসরকারিখাত নির্ভর, তাই বেসরকারিখাতে বিনিয়োগ বাড়ানো ও আপাতত: শ্রমঘনে উদ্যোগে কর্মসংস্থান সৃষ্টির ব্যবস্থা করতে হবে।