শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধিতে বরাদ্দ বাড়ানো দরকার ২০১৯

ভূমিকা
জাতীয় অগ্রগতি ও বিকাশের ক্ষেত্রে শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। ক্রমবিকাশমান জ্ঞান ও দক্ষতার সন্নিবেশ না ঘটানো গেলে কোনো ধরনের অর্জন কিংবা তা ধরে রাখা সম্ভব নয়। টেকসই উন্নয়নের ক্ষেত্রে শিক্ষায় পরিকল্পিত বিনিয়োগের বিষয়টি আজ সর্বজনস্বীকৃত।
শিক্ষাস্থায়িত্বশীল উন্নয়নের চালিকাশক্তি-এ ভাবনাকে বিবেচনায় নিয়ে জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য ৪-এ ২০৩০ সালের মধ্যে সকলের জন্য একসঙ্গে সমমানের শিক্ষা নিশ্চিত ও সবার জন্য জীবনভর শিক্ষার সুযোগ উন্মুক্ত করার প্রত্যয় ঘোষণা করা হয়েছে। এ ঘোষণার আলোকে এবং রাষ্ট্র বাংলাদেশের বিগত সময়ের অর্জন, ব্যর্থতা ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে মানসম্মত ও একীভূত শিক্ষার জন্য আমাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। আমরা দেখেছি, এরই মধ্যে বেশ কিছু ক্ষেত্রে অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষায় বিদ্যালয়ে ভর্তির হার ২০১৭ সালের তথ্য অনুযায়ী ৯৭.৯৭ শতাংশে পৌঁছেছে; নারী শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে এ হারআরও বেশি, ৯৮.২৯%।
সকলের জন্য শিক্ষার সুযোগ এবং বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া রোধ করতে সরকার ১ম থেকে ৯ম শ্রেণি পর্যন্ত সকল শিক্ষার্থীর জন্য বিনামূল্যে বই বিতরণ করছে। ব্যাপক সংখ্যক শিক্ষার্থীকে বৃত্তি ও উপবৃত্তি দেয়া হচ্ছে। এ বছরই এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর খালি থাকাপদে হাজার হাজার শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হয়েছে। বিভিন্ন শ্রেণির জন্য উপকরণ হিসাবে শিক্ষা সহায়িকাপ্রদান করা হচ্ছে। নতুন স্কুল ভবন নির্মাণ, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণসহ দারিদ্র্যপীড়িত অঞ্চলে মিড-ডে মিলের প্রচলন অব্যাহত আছে। পরীক্ষাভীতি কমাতে ১ম থেকে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পরীক্ষা তুলে দিয়ে দৈনন্দিন উপস্থিতি ও শ্রেণিকক্ষে তৎপরতার ভিত্তিতে মূল্যায়ন পদ্ধতি প্রচলনের চিন্তা চলছে।
এখন চ্যালেঞ্জ হলো- এ অর্জনসমূহ ধরে রাখার পাশাপাশি সকল শিশুর জন্য মানসম্মত ও একীভূত শিক্ষা নিশ্চিত করা।যদিও গত কয়েক বছরের বাজেটে শিক্ষাখাতেশতকরা বরাদ্দের পরিমাণ ক্রমান্বয়ে কমতে দেখা যাচ্ছে।২০১৭-১৮ অর্থবছরে শিক্ষাখাতে ৫৩ হাজার ৫৪ কোটি টাকা বরাদ্দ দিলেও তা মোট বাজেটের মাত্র ১১.৪১ শতাংশ।এই হার আগের দুই বছরের চেয়ে কম। আমাদের প্রত্যাশা, আগামী অর্থবছরের বাজেটে সরকার বিভিন্ন অঙ্গীকার, জাতীয় লক্ষ্যমাত্রা ও আন্তর্জাতিক মানদ-কে বিবেচনায় নিয়ে বরাদ্দেরপরিমাণ বাড়াবেন, যা জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এর পূর্ণ বাস্তবায়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি, মানব সক্ষমতা উন্নয়ন, দারিদ্র্য বিমোচন, সামাজিক বৈষম্য নিরসনসহ Sustainable Development Goal (SDGs)র ৪র্থ লক্ষ্য অর্থাৎ `Education 2030’ ’ -র নির্ধারিত ৭টি টার্গেট অর্জনে সহায়ক হবে।

জাতীয় বাজেটে শিক্ষায় বরাদ্দ – মোট বাজেট এবং জিডিপি’র তুলনায় ক্রমান্বয়ে কমছে
চলতি অর্থবছরে শিক্ষাখাতে বরাদ্দের পরিমাণ টাকার অঙ্কে বেশি দেখালেও আনুপাতিক হারে এর পরিমাণ হতাশাজনক। উন্নত বিশে^র দেশগুলোতো বটেই ভারত-পাকিস্তান, নেপালের মতো দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোও জিডিপির যত অংশ শিক্ষায় ব্যয় করে, বাংলাদেশ তার চেয়েও অনেক কম করে।
বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী প্রাথমিকে ঝরে পড়ার হার ও ছাত্র-শিক্ষক অনুপাত কমিয়ে আনার সফলতার কথা উল্লেখ করেছেন। উপবৃত্তি পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা আগের চেয়ে ৫০ লক্ষ বাড়ানোর কথাও জানিয়েছেন। প্রায় দেড় হাজার গ্রামে নতুন স্কুল নির্মাণ এবং ২৬ হাজার বেসরকারি স্কুলকে সরকারি করার কথা বলেছেন; বলেছেন ১১টি জেলায় প্রাথমিকের শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপনের কথা। মাধ্যমিকে তথ্য-প্রযুক্তি শিক্ষা এবং মাল্টিমিডিয়া উপকরণ ব্যবহার করে শিক্ষার্থীদের দক্ষ করতে সরকারি উদ্যোগের কথাও এসেছে। এসেছে কারিগরি, মাদ্রাসা ও ভোকেশনাল শিক্ষাকে যুগোপযোগী করার চিন্তাও।
মোটাদাগে, শিক্ষা খাতের অবকাঠামো উন্নয়নে সরকারের অগ্রাধিকারের বিষয়টিই অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতা থেকে লক্ষ্য করা গেছে। এ বিষয়টি যতখানি গুরুত্বপূর্ণ, গুণগত ও মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করা তার চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। সরকারের উচিত শিক্ষকদের সর্বাধুনিক প্রশিক্ষণের বিষয়টিতে আরও অনেক বেশি নজর দেওয়া। উচ্চশিক্ষায় সরকারের যা ব্যয় তার বেশিরভাগই চলে যাচ্ছে শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতায়; গবেষণায় তুলনামূলকভাবে কিছুই থাকছে না।
অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যে যে সকল অর্জন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করা হয়েছিল তা নিঃসন্দেহে প্রশংসাযোগ্য ও ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গীর প্রতিফলন। তারপরও বলতেই হচ্ছে, এ বাজেট বরাদ্দে শিক্ষা বাজেটে জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এর বাস্তবায়নে সরকারি অগ্রাধিকারের বিষয়টি প্রতিফলিত হয়নি। তার জন্য যে হারে বরাদ্দ বাড়ানো প্রয়োজন, গত কয়েক বছরের বাজেটে তা দেখা যাচ্ছে না। ‘সবার জন্য গুণগত শিক্ষা’নিশ্চিতের বিষয়েও সুস্পষ্ট দিক-নির্দেশনা নেই।
আমাদের বাজেট বরাদ্দ ও এর বাস্তবায়নের পুরো বিষয়টি সাধারণত কেন্দ্র থেকেই পরিচালিত হয়। এক্ষেত্রে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ও প্রতিষ্ঠানগুলোর করণীয় থাকে খুবই কম। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শিক্ষার্থীদের বৃত্তি-উপবৃত্তির ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকারের ব্যবস্থাপনাকে কাজে লাগানো হচ্ছে। সামনের বাজেটগুলোতে বিদ্যালয়ের অবকাঠামো নির্মাণ, শিক্ষক-কর্মকর্তা নিয়োগ ও প্রশিক্ষণের দীর্ঘসূত্রিতা কমাতে এই ব্যবস্থাপনাকে কাজে লাগানো যায় কিনা, সরকার তা ভেবে দেখতে পারে। ভেবে দেখতে পারে অভিভাবক ও স্থানীয় জনগণকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে আরও কার্যকরভাবে কী করে যুক্ত করা যায়, তাও।

লেখচিত্র: শিক্ষাখাতে বাজেট বরাদ্দ ¬- মোট বাজেট ও জিডিপি’র শতকরা হার


তথ্যসূত্র: বাজেটের সংক্ষিপ্তসার ( বিভিন্ন বছর ) ও লেখকের নিজস্ব হিসাব

 

প্রস্তাব

  • বাজেট বরাদ্দের ক্ষেত্রে শিক্ষা খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। এ লক্ষ্যে ২০১৯-২০২০ অর্থবছরে শিক্ষাখাতে মোট বাজেটের ন্যূনতম ১৮% বরাদ্দ দেয়ার সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব করছি এবং পর্যায়ক্রমে ১-২% বৃদ্ধি করে ন্যূনতম সময়ের মধ্যে ২০%-এ উন্নীত করার দাবি করছি।
  • বরাদ্দকৃত অর্থের যথাযথ ও কার্যকর ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে পরীক্ষামূলকভাবে জেলা ও উপজেলাভিত্তিক শিক্ষা পরিকল্পনা, অর্থায়ন ও বাস্তবায়ন শুরু করার দাবি করছি।
  • শিক্ষকতা পেশায় মেধাবীদের আকৃষ্ট এবং তাদের পেশাজীবিতা উন্নয়নের লক্ষ্যে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা তৈরি, চারবছর মেয়াদী কোর্স প্রচলন, শিক্ষকদের জন্য যুগোপযোগী বেতন কাঠামো প্রণয়ন, বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগ এবং নিয়োগের পূর্বে তাদের প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা এবং এর জন্য জন্য প্রয়োজনীয় বরাদ্দ রাখা।
  • শিক্ষা উপবৃত্তির টাকার পরিমান মাথাপিছু ১০০ থেকে বৃদ্ধি করে কমপক্ষে ৩০০ টাকায় উন্নীত করতে হবে।
  • বিজ্ঞান শিক্ষায় অধিক শিক্ষার্থী আকৃষ্ট করার লক্ষ্যে প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে লাইব্রেরি সম্প্রসারণের পাশাপাশি বিজ্ঞানাগার, কম্পিউটার ল্যাব ইত্যাদি স্থাপনাসহ সহজ ভাষার বিজ্ঞান পুস্তিকা সরবরাহ করে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণের জন্য যথাযথ বরাদ্দ প্রদান করার জন্য সুপারিশ রাখছি।
  • এটি আনন্দের বিষয় যে, উচ্চশিক্ষায় বিশেষ করে টেকনিক্যাল ও ভোকেশনাল শিক্ষা, চিকিৎসা শিক্ষা, প্রকৌশল শিক্ষাসহ শিক্ষার বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু সে তুলনায় আবাসন, যাতায়াত সুবিধাসহ জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো বাড়ছে না। সামনের অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে এ ধরনের উচ্চতর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে আবাসনসহ নারী শিক্ষার্থীবান্ধব প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দের প্রস্তাব করছি।
  • Draft School Feeding Policy অনুযায়ী ২০২১ সালের মধ্যে দেশের প্রত্যন্ত ও পিছিয়ে পড়া অঞ্চল বিশেষ করে চর, হাওর, চা বাগান, পার্বত্য ও আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চল এবং নগরীর বস্তি এলাকার সকল প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মিড-ডে মিল কর্মসূচি সম্প্রসারণ করা।
  • সকল ধরণের প্রতিবন্ধী শিশুর জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষাব্যবস্থাসহ তাদের উপযোগী প্রয়োজনীয় ভৌত অবকাঠামো এবং প্রতিবন্ধীবান্ধব শিক্ষা উপকরণের জন্য প্রয়োজনীয় বরাদ্দ প্রদান করা।
  • বিশ^বিদ্যালয়সহ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে গবেষণাকে উৎসাহিত করতে এ খাতে বরাদ্দ উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বাড়ানো।