স্থানীয় সরকারমুখি ও অংশগ্রহণমূলক ‘জেন্ডার বাজেট’ চাই ২০১৯

চিররঞ্জন সরকার

বর্তমান বিশ্বে নারীর ক্ষমতায়নকে আর্থসামাজিক উন্নয়নের সূচক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। নারীর ক্ষমতায়ন কিংবা নারীর অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার জন্য অপরিহার্য নিয়ামক হচ্ছে, নারীর উন্নয়ন ও ক্ষমতায়নের জন্য পর্যাপ্ত আর্থিক বরাদ্দ। বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে নারীরা যেহেতু অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বিবিধ সুবিধাবঞ্চিত, সেহেতু সামগ্রিক উন্নয়ন কর্মকা-ে তাদের একীভূত করার জন্য প্রয়োজন আলাদা আর্থিক বরাদ্দ।
জেন্ডার বাজেট মানে হলো নারী ও পুরুষের মধ্যে যে ফারাক আছে, তা চিহ্নিত করা। কিন্তু নারীরা পিছিয়ে আছে বলে নারীর বিষয়টি বেশি আলোচিত হয়। জেন্ডার বাজেট কিন্তু নারীর জন্য আলাদা কোনো বাজেট নয়, বরং এটি একটি পদ্ধতি যার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় হিসাব-নিকাশের সাহায্য জাতীয় বাজেটের জেন্ডার-সংবেদনশীলতা বিশ্লেষণ করা যায়। জেন্ডার বাজেটের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে, সরকারের বিভিন্ন প্রকল্পের জেন্ডার সংবেদনশীলতা চিহ্নিত করে বাজেটে সম্পদের যথাযথ বণ্টনের মাধ্যমে নারী-পুরুষের সমতা বৃদ্ধি বা অসমতা হ্রাস করা।

জেন্ডার বাজেট শুধু টাকার হিসাব নয়। এ বাজেটের মূল উদ্দেশ্য জেন্ডার বা লৈঙ্গিক সমতার বিষয়টিকে রাষ্ট্রের সব ধরনের কার্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা। বাজেটে এমনভাবে বরাদ্দ প্রদান করা, যাতে নারী ও পুরুষের মধ্যে বিদ্যমান বৈষম্য দূর করা সম্ভব হয়।

জাতীয় বাজেটে নারীর হিস্যা
জেন্ডার বাজেট প্রতিবেদনে ২০১৩-১৪ অর্থবছর থেকে শুরু হয়। ২০১৭-১৮ অর্থবছর থেকে সরকার জেন্ডার বাজেট প্রতিবেদনে ৪৩টি মন্ত্রণালয়কে অন্তর্ভুক্ত করে এবং ৩ টি গুচ্ছে ভাগ করে প্রতিবেদন তৈরি করে-
১. নারীর ক্ষমতায়ন ও সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি কৌশলের অধিনে রয়েছে ৯ টি মন্ত্রণালয়;
২. উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং শ্রমবাজার ও আয়বর্ধক কাজে নারীর অধিকতর অংশগ্রহণ নিশ্চিত কৌশলের অধীনে আছে ৯টি মন্ত্রণালয়; এবং
৩. সরকারি সেবা প্রাপ্তিতে নারীর সুযোগ বৃদ্ধি করার কৌশলের অধিনে রয়েছে ২৫ টি মন্ত্রণালয়।
২০১৮-১৯ অর্থবছরের জেন্ডার বাজেট প্রতিবেদনে লক্ষ্য করা যায় যে, গতবছরের প্রস্তাবিত ও সংশোধিত বাজেটের তুলনায় এ বছরের প্রস্তাবিত বাজেটে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন ও অনুন্নয়ন বাজেট উভয়ক্ষেত্রে নারীর হিস্যা টাকার অংকে ও তার শতকরা হারেও বেড়েছে।
সারণী ১: মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রনালয়ে নারীর জন্য বরাদ্দ বাজেট (কোটি টাকায়)

সারণী ২-এ দেখা যাচ্ছে, বিগত পাঁচ বছরে মোট বাজেটের তুলনায় এবং জিডিপি’র হিসাবে নারী উন্নয়নে বরাদ্দের শতকরা হার প্রায় একই রয়েছে, যথাক্রমে ২৯% ও ৫% এর বেশি; যা চাহিদার তুলনায় অপর্যাপ্ত।

সারণী ২: গত ৫ অর্থবছরে মোট বাজেটের তুলনায় নারী উন্নয়নে বরাদ্দের শতকরা হার (%)


সুত্র: জেন্ডার বাজেট প্রতিবেদন ২০১৮-১৯

বিগত বছরগুলোর বাজেট পর্যালোচনায় দেখা যায়, গত পাঁচ বছরে নারী উন্নয়নে বরাদ্দ দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। যেখানে ২০১৩-১৪ অর্থবছরে জেন্ডার বাজেটে বরাদ্দ ধরা হয়েছিল ৫৯ হাজার ৭৫৬ কোটি টাকা। সে তুলনায় ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বরাদ্দ বেড়েছে ৭৭ হাজার ৯৮৬ কোটি টাকা।
বাজেটে বরাদ্দ বাড়লেও যে প্রক্রিয়ায় জেন্ডার বাজেট প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন হচ্ছে তা মোটেও নারী-পুরুষ সমতা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে যথেষ্ট সহায়ক হচ্ছে না। অথচ জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষমাত্রা (এসডিজি’র) ৫ নম্বর লক্ষ্য হচ্ছে জেন্ডার সমতা অর্জন এবং সকল নারীর ক্ষমতায়ন। এই এসডিজি বাস্তবায়নে সরকার বদ্ধপরিকর।
সরকার জেন্ডারবান্ধব বাজেট করলেও বাস্তব অগ্রগতি নিয়ে কোনো তথ্য নেই। নজরদারির অভাবে বাজেট বরাদ্দের কতটুকু বাস্তবায়িত হচ্ছে, নারীর জীবনে কোন কোন ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হলো, তার কোনো তথ্য নেই। জেন্ডার বাজেট নিয়েও ধারণাগত অস্পষ্টতা আছে।
সরকারি জনসেবায় দরিদ্র নারীদের প্রবেশগম্যতাকে তাদের উন্নয়নের একটি ধাপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। জনসেবার পরিকল্পনা এবং বিতরণ পর্যায়ে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং নাগরিকদের অংশগ্রহণ খুবই সীমিত, কিছু কিছু ক্ষেত্রে নেই বললেই চলে। সবকিছু বিবেচনা করে নারীদের কার্যকরী অংশগ্রহণের মাধ্যমে জেন্ডার বাজেট প্রণয়নের দাবি গত কয়েক বছর ধরেই উচ্চারিত হচ্ছে। জেন্ডারকে মূল ধারায় আনতে সরকারের নানামুখী উদ্যোগ থাকা সত্ত্বেও কর্মকর্তাদের অদক্ষতার কারণে জেন্ডার বাজেট বাস্তবায়নে সমস্যা হচ্ছে।
নারী ও পুরুষের মধ্যে অসমতা দূর ও নারীর ক্ষমতায়নকে নিশ্চিত করতে হলে জেন্ডার বাজেট প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আমাদের সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবগুলো তুলে ধরতে চাই।

প্রস্তাব

  • সংখ্যাতাত্ত্বিকের পাশাপাশি গুণগত বিশ্লেষণ: বাজেট বিশ্লেষণের যে ৩টি স্বীকৃত পদ্ধতি রয়েছে তার সংখ্যাতাত্ত্বিক বিশ্লেষনের পাশাপাশি গুণগত বিশ্লেষণ করার জন্য পরিমাপক নির্ধারণ করা উচিত। বিশেষত জেন্ডার বাজেট প্রতিবেদনে, সংখ্যাতাত্তিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে বরাদ্দ দেখানোর পাশাপাশি সেই বরাদ্দকৃত বাজেট আসলে নারীর কোন স্ট্র্যাটেজিক জেন্ডার চাহিদা পূরণ করছে এবং তার অগ্রগতি কতটুকু হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত বিশ্লেষণ থাকতে হবে।
  • নারীর সক্রিয় অংশগ্রহণে জেন্ডার বাজেটিং: নারীর পুর্ণ রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে হবে স্থানীয় সরকার পর্যায় থেকেই। জেন্ডার বাজেটিং প্রক্রিয়ায় নারীর অংশগ্রহণ শুধু কাগজে-কলমে ও সংখ্যায় নয়, বরং সক্রিয়ভাবে নিশ্চিত করতে হবে।
  • নারী-সহায়ক প্রকল্প বৃদ্ধি: কেবলমাত্র সেফটি নেট প্রকল্প কিংবা ক্ষুদ্রঋণ ভিত্তিক কর্মসূচিতে নারীর উন্নয়ন সীমাবদ্ধ না রেখে বৃহত্তর নারী সমাজের ক্ষমতায়ন ও জাতীয় উন্নয়ন কর্মকা-ে নারীর অংশগ্রহণ সহায়ক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
  • স্থানীয় সরকারের মাধ্যমে জেন্ডার বাজেট প্রণয়ন: স্থানীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ে নারীদের সমস্যা চিহ্নিত করে সেসব সমস্যা সমাধানে ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে স্থানীয় সরকারের মাধ্যমে আলাদা জেন্ডার বাজেট প্রণয়ন করা।
  • নারীর মতামত গ্রহণ: নারী লক্ষীভূূত উন্নয়ন প্রকল্পগুলো নির্বাচনে এবং প্রণয়নে নারীর মতামতকে প্রাধান্য দিতে হবে এবং নারীর প্রয়োজন সঠিকভাবে নির্ণয় করে নারী লক্ষীভূত প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে।
  • নারীদের প্রকল্প পরিচালক হিসেবে নিয়োগ: নারীর জন্য বরাদ্দকৃত বাজেটীয় অর্থের দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে এবং দক্ষ বা বাস্তবায়নের জন্য নারী লক্ষীভূত প্রকল্প এবং জেন্ডার সংবেদনশীল প্রকল্পগুলোর পরিচালক হিসাবে নারীকে নিয়োগ দিতে হবে।
  • মনিটরিং ও অডিটিং: জেন্ডার বাজেট বাস্তবায়নে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় ও এনজিও এবং বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিদের সমন্বয়ে মনিটরিং সেল গঠন করা দরকার। এই সেলের কাজ হবে জেন্ডার বাজেটিং এ প্রতি কর্মসূচির জন্য মনিটরিং এবং বড় প্রজেক্টের জন্য অডিটিং এর ব্যবস্থা করা।
  • গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো: জেন্ডারভিত্তিক/নারী-পুরুষ ভেদে আলাদা তথ্য/উপাত্ত সংগ্রহ, সংরক্ষণ, বিশ্লেষণ, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়নে আরও কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। সরকারি পরিসংখ্যানে নারীর অমূল্যায়িত শ্রমকে অন্তর্ভুক্তি করার লক্ষ্যে বিআইডিএস, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ইত্যাদি সংগঠনে সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে এবং এ জন্য বাজেটের বরাদ্দ বাড়াতে হবে।
  • জেলাভিত্তিক বাজেট প্রণয়ন প্রক্রিয়া কার্যকর করা: জেলাভিত্তিক বাজেট প্রণয়ন প্রক্রিয়া কার্যকর করতে হবে। সেখানে স্থানীয় চাহিদাভিত্তিক নারীদের জন্য প্রকল্প গ্রহণ করা যেতে পারে। মাতৃস্বাস্থ্যের ভাতার পরিধি ও পরিমাণ বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। প্রত্যন্ত এলাকার স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার জন্য ভ্রাম্যমাণ ক্লিনিক তৈরির উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
  • মন্ত্রণালয়ভিত্তিক জেন্ডার বাজেট সেল গঠন: এখন প্রায় সব মন্ত্রণালয়ে নারীদের জন্য আলাদা বরাদ্দ রাখা হচ্ছে। কিন্তু ফল সেভাবে আসছে না। এর কারণ কার্যক্রমের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব। অনেক দেশে মন্ত্রণালয়গুলোতে নারী বাজেট সেল রয়েছে। সেরকম আমাদের দেশের মন্ত্রণালয়গুলোতেও যদি থাকত তাহলে কাজগুলো আরও গোছানো হতো এবং নারীরা আরও উপকৃত হতো। এই সেলগুলোর দায়িত্বই হতো জেন্ডার বাজেটিংয়ে নারীর চাহিদাগুলোকে সঠিকভাবে নিরূপণ করে চিহ্নিত করা। যার প্রতিফলন বাজেট বরাদ্দতে আসতে পারেÑএই পুরো প্রক্রিয়াটির দায়িত্বে এই সেল থাকতে পারে। বাজেটে বরাদ্দকৃত অর্থ যথাযথ ভাবে খরচ হচ্ছে কি-না বাস্তবায়ন পর্যায়ে তা মনিটর করা এবং অর্থবছর শেষে কতটুকু চাহিদা পূরণ হলো তা বিশ্লেষণ করে দেখা যাতে এর প্রতিফলন পরবর্তী বাজেটে আসতে পারে।