কৃষিবাজেট ২০১৯-২০ : কৃষককের জন্য সেই খুদকুড়ো ২০১৯

বর্তমান সরকার তার তৃতীয় মেয়াদের প্রথম জাতীয় বাজেট ঘোষণা করেছে। এটি তাদের প্রথম মেয়াদের ২০০৯-১০ অর্থবছরের প্রথম বাজেটের তুলনায় ৩৬২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ২০১৯-২০ অর্থবছরের জন্য ৫ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব করা হয়েছে।

বাংলাদেশ মূলত: একটি কৃষিপ্রধান দেশ এবং কৃষি এখানকার অর্থনীতির অন্যতম কর্মকান্ড।  অর্থমন্ত্রী বাজেট বক্তৃতায় বলেছেন,  দেশের শ্রমশক্তির ৪২ ভাগ কৃষি সাথে জড়িত।  বিশ্বব্যাংকের হিসাব মতে, দেশের প্রায় ৮৭ ভাগ গ্রামীণ মানুষের আয়ের উৎস কৃষি; এবং শহরে বসবাসকারীদের মধ্যেও ১১ শতাংশ মানুষ সরাসরি কৃষিকাজে যুক্ত।  তাই, জাতীয় বাজেটে কৃষিখাতের বরাদ্দ, নীতি-প্রস্তাবনা ও কর্মসূচি ইত্যাদি বিষয়গুলো পরিবীক্ষণ এবং পর্যালোচনা করা খুবই জরুরি।

প্রথমত: বিগত কয়েক বছর থেকে ফিবছর জাতীয় বাজেটর আকার বাড়লেও কৃষি এবং তৎসংশ্লিষ্ট খাতের বাজেট ক্রমহ্রাসমান।  ২০১০-১১ অর্থবছর থেকে ২০১৯-২০ অর্থবছর পর্যন্ত বাজেটের সামগ্রিক আকার ৩০৭.৮৯ শতাংশ বাড়লেও পক্ষান্তরে এই সময়কালে ১১৮.৮৪ শতাংশ। হিস্যা হিসেবে দেখা যায়, ২০০৯-১০ অর্থবছরে সরকারে কৃষিতে মোটে বাজেটের ১০.৯ শতাংশ কৃষিখাতে বরাদ্দ দিয়েছিলো আর ২০১৯-২০ অর্থবছরে তা কমে ৫.৪ শতাংশে এসে দাঁড়িয়েছে।  ফলে এটা খুব স্পষ্ট যে, দেশের সবচেয়ে বড় ব্যক্তিখাত হওয়া শর্তেও বাজেটে খাতভিত্তিক বরাদ্দের দিকে তাকালে দেখা যায় কৃষিখাতের গুরুত্ব স্বীকৃত নয়।

বছরপ্রতি কৃষি আকার বাড়লেও শুধুমাত্র কৃষি মন্ত্রনালয়ের বাজেটের দিকে তাকালে দেখা যাবে প্রতি বছর আনুপাতিক হারে কৃষি মন্ত্রনালয়ের জন্য বরাদ্দও কমছে।  এই বছর শুধুমাত্র কৃষি মন্ত্রনালয়ের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১৪,০৫০ কোটি টাকা, যা গত অর্থবছরের বরাদ্দ ২.৯ শতাংশের চেয়েও কমে তা মাত্র ২.৭ শতাংশের এসে ঠেকেছে।  একইভাবে, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতেও কৃষি মন্ত্রনালয়ের জন্য বরাদ্দ কমেছে। গেল অর্থ বছরে এই মন্ত্রনালয়ের জন্য বাজেট ছিলো মোটি এডিপি ১.১ শতাংশ আর এই বছর তা কমে ০.৯ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

ভর্তুকিকে কৃষিখাতে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।  বিগত বছরগুলো ধারাবাহকতায় এই বছরের বাজেটেও সার-ডিজেল বাবদ ৯০০১ কোটি টাকা কৃষি ভর্তুকি রাখা হয়েছে।  কিন্তু, সরকারের সার-ডিজেল বাবদ ভর্তুকি আদতেই ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের সমর্থন যোগান কিনা, নাকি বড় কৃষক এবং মহাজনদের লাভবান করে তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ২০১৩-১৪ অর্থবছর থেকে পরবর্তী বছরগুলো কৃষি ভর্তুকিরে পরিমাণ ৯০০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখলেও বাস্তবে দেখা যায় প্রতি অর্থবছরই প্রস্তাবিত বাজেটের তুলনায় সংশোধনীতে বাজেটে ভর্তুকির পরিমাণ কমে যাচ্ছে। যার মানে দাঁড়ায়, ভর্তুকি বাবদ বরাদ্দ থাকলেও তা যথাযথভাবে খরচ না করতে পারা খুবই দুঃখজনক ।

এই বছর কৃষকরা ধানের মূল্য না পাওয়া এবং ধান কাটার সময় শ্রমিকের মজুরির হার নিয়ে ব্যাপক আলোচনার কারণে সরকার চাল আমদানির ওপর শুল্ক ২৫ শতাংশ, রেগুলেটরি ডিউটি ২৫ শতাংশ ও একইসঙ্গে এসব পণ্যে ৫ শতাংশ অগ্রিম আয়কর আরোপ করে চাল আমদানিতে মোট ৫৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছিলো। এবারের বাজেটেও ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে এই কথা প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, চাল রপ্তানির ওপর ২০ শতাংশ প্রণোদনা দেওয়ার কথা হয়েছে। কিন্তু, এই প্রণোদনায় মিল মালিকরাই লাভবান হবেন। কারণ ক্ষুদ্র-প্রান্তিক কৃষক পর্যায়ে ধান/চাল সংরেক্ষণের ব্যবস্থা না থাকায় এবং চাষের সময়কার ঋণ শোধ করতে গিয়ে ফসল ওঠার সাথে সাথে ধান বিক্রি করে ফেলে এবং তা মজুতদারের গোলায় চলে যায় এবং তারাই এই প্রণোদনার সুযোগ নিয়ে চাল রপ্তানি করে থাকে। ফলে সরকারের এই উদ্যোগ কৃষক পর্যায়ে সরাসরি কোন প্রভাব ফেলবে না বরং মিল মালিকদের লাভবান করবে ।

এছাড়াও, কৃষিকাজে ব্যবহৃত ‘হার্ভেস্টিং মেশিনারিজ’ আমদানির ক্ষেত্রে শুল্ক হ্রাসের প্রস্তাব করা হয়েছে। কিন্তু, কারা এই মেশিনারিজের সুবিধা পাবেন, ক্ষুদ্র-প্রান্তিক কৃষকদের ঘরে কী করে ধানকাটা আর মাড়াইয়ের যন্ত্র পৌঁছবে, তারা কী আসলেই এইসব যন্ত্রাদি কি প্রক্রিয়ায় কিনবে, নাকি এই ভর্তুকির সুফল ধনী কৃষক আর যন্ত্রের ব্যবসায়ীরা পাবেন তার কোন নির্দেশনা এই বাজেটে দেওয়া হয়নি। ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের পক্ষ থেকে সরকারের কাছে কৃষিশ্রমিকের-মজুরি সহায়তা, কৃষিপণ্যের মূল্য সহায়তা, শষ্য সংরক্ষণ সহায়তা, মওসুমভিত্তিক শষ্যঋণ প্রদানের দবিগুলো বহু পুরানো, অথচ সরকার চাইলেই ফিবছর কৃষি ভর্তুকির অব্যবহৃত বরাদ্দ থেকেও কৃষকদের এই সকল সহায়তা প্রদান করা সম্ভব।

সরকার বিভিন্ন ক্ষেত্রে আলাদাভাবে ভর্তুকি দেওয়ার চেষ্টা করলেও এই সকল বরাদ্দ প্রকৃত কৃষকদের কাছে কতখানি যাচ্ছে তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। তাই সরাসরি কৃষকদের ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে নগদ অর্থে ভর্তুকি প্রদান করাই হতে পারতো সবচেয়ে স্বচ্ছ ও যুক্তিসঙ্গত ব্যবস্থা। এবং বাজেটে এই ধরণের নীতি-প্রস্তাবনা ও কর্মসূচি থাকা প্রয়োজন ছিলো।

প্রতি বছর বন্যা, পাহাড়ি ঢল, ঘূর্ণিঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে কৃষকেরা ক্ষতির সম্মুখিন হতে হয়। এবারের বাজেটে একটি ভালো খবর হলো, পরীক্ষামূলক প্রকল্প হিসেবে শস্যবীমা চালু করার ঘোষণা এসেছে। কিন্তু, এই ব্যাপারে বিস্তারিত কিছু বলা হয়নি। কতো কৃষক এর আওতায় আসবেন, এটি ফলে কী কৃষকরা শুধু প্রিমিয়াই দিবেন- কিভাবে বীমা অর্থ পাওয়া যাবে- কারা রেগুলেট করবে সে সম্পর্কে কিছুই বলা হয়নি। ফলে এই উদ্যোগ সত্যিকারার্থে কৃষকদের কতখানি সুরক্ষা দিবে তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে।

এই মওসুমে ধান/চাল ক্রয় নিয়ে এত আলোচনা হলেও ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটে ধানচাল ক্রয়ের বিষয়ে বিশেষ কোন উদ্যোগের কথা বলা হয়নি। বরং চলতি অর্থ বছরের তুলনায় ৪০ হাজার মেট্রিক টন বাড়তি উৎপাদনের লক্ষ্য নিয়ে আগামি বছর ৩ কোটি ৫৩ লাখ মেট্রিক টন ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করলেও চাল সংগ্রহের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে মাত্র ৫ হাজার ৯৩৯ কোটি টাকা, যা গত বছরের তুলনায় ৮৩ কোটি টাকা কম। ফলে, আগামি বছরও ধান সংগ্রহের ক্ষেত্রে সরকার কৃষকদের কি ধরণের সুরক্ষা দিতে তা নিয়ে সংশয় থেকে যাচ্ছে।

সরকার ২০১৯ সালের সরকারের মন্ত্রী পরিষদ বাংলাদেশের কৃষি ব্যবস্থাকে টেকসই করার লক্ষ্যে ‘জাতীয় জৈব কৃষিনীতি’ প্রণয়ন করেছে। কিন্তু, বাজেটে এই নীতিমালা বাস্তবায়নে কোন বরাদ্দ রাখা হয়নি। একই সাথে ২০১৯-২৮ জাতিসংঘ খাদ্য ও কৃষি সংস্থা পারিবারিক কৃষি দশক ঘোষণা করেছে এবং তারজন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে বিনিয়োগ বৃদ্ধির সুপারিশ থাকলেও এই বাজেটে তারজন্য কোন বরাদ্দ রাখা হয়নি। একই সাথে প্রতিনিয়ত কৃষিজমি হ্রাস পেলেও এই বাজেটে কৃষিজমি সুরক্ষার জন্য কোন নির্দেশনা বা কর্মসূচি নেই।

বিশ্বব্যাংক প্রতিবেদন ২০০৮ অনুসারে কৃষির উৎপাদন ১ শতাংশ বাড়লে দারিদ্র্যের হার ০.৫ শতাংশ হ্রাস পায়। অর্থনীতির অন্যান্য খাতে উৎপাদন বৃদ্ধির তুলনায় কৃষিখাতে উৎপাদন বৃদ্ধি দারিদ্র্য বিমোচনে দ্বিগুণ কার্যকর; আমাদের দেশের অভিজ্ঞতায় দেখা যাচ্ছে স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত যেমন দেশে খাদ্যশস্যের উৎপাদন ৩.১ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেয়েছে সেই সাথে সাথে দেশে দারিদ্র্য হ্রাস বছরে গড়ে ১.৪ শতাংশ হারে হ্রাস পেয়েছে।  কিন্তু, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কৃষিখাতে বাজেট বরাদ্দ কমে যাওয়ার ফলে দারিদ্র্য বিমোচন কতখানি স্থায়িত্বশীল হবে তাও বিচেনায় নিতে হবে।

কৃষি বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। কর্মসংস্থান, খাদ্য নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য কৃষির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হলেও প্রস্তাবিত ‍কৃষিবাজেটটি খুবই গদবাঁধা এবং বিগত বাজেটের ধারাবাহিকতা মাত্র। দেশের মোট জনসংখ্যার ৬৩ শতাংশ মানুষের জীবিন-জীবিকা সুরক্ষায় প্রস্তাবিত বাজেটটি আদৌ কোন সুফল বয়ে আনবে কীনা সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।

নুরুল আলম মাসুদ

সম্পাদক

খাদ্য নিরাপত্তা নেটওয়ার্ক (খানি)