জাতীয় বাজেট ও স্বাস্থ্যখাত ২০১৮

স্বাস্থ্য অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মানবাধিকার এবং সর্বজনীনভাবে স্বীকৃত মানব উন্নয়নের সূচক। ২০১১ সালে অনুষ্ঠিত ৬৪তম বিশ্ব স্বাস্থ্য এসেম্বলিতে ২০৩২ সালের মধ্যে সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়ে বাংলাদেশ অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে। এছাড়া জাতিসংঘ গৃহীত স্থায়িত্বশীল উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় (এসডিজি) সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষাকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। স্থায়িত্বশীল উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার ৩য় লক্ষ্যে সকল বয়সের মানুষের জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। অন্যদিকে সপ্তম-পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায়ও সবার জন্য স্বাস্থ্যের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করা হযেছে। বাংলাদেশগত কয়েক বছরে স্বাস্থ্য-বিষয়ক বেশকিছু সূচকে অসাধারণ সাফল্য দেখিয়েছে। বিশেষ করে সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ৪ ও ৫ অর্জনে বাংলাদেশ অনেকের কাছেই অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত। পাঁচ বছরের কম বয়সের শিশু মৃত্যুহার রোধে বাংলাদেশ লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। গত কয়েক বছরে গড় প্রত্যাশিত আয়ুষ্কাল ৬৫ থেকে বেড়ে ৭২ বছর হয়েছে। কিন্তু ঠিক একই সময়ে স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে জনগণ ও স্বাস্থ্য পেশাজীবীদের মধ্যে দূরত্ব ও মনোমালিন্য বেড়েছে। এখনো দেশের অধিকাংশ জনগণ মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা অর্জন থেকে বঞ্চিত।বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবায় সরকারি বরাদ্দের ঘাটতি, ব্যক্তি পর্যায়ে অত্যধিক ব্যয়, সুশাসনের অভাব, স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তিতে গ্রাম-শহর, ধনী-দরিদ্র অসম সুযোগ ও বঞ্চনা সকলের জন্য মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তিতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। এর সাথে রয়েছে স্বাস্থ্যসেবায় জনবল সংকট ও এর বিন্যাসে আঞ্চলিক বৈষম্য; রয়েছে অবকাঠামো, আধুনিক যন্ত্রপাতি, জবাবদিহিতা ও ব্যবস্থাপনার সংকট।

স্বাস্থ্যখাতে রুগ্ন বাজেট
বর্তমান সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে এসেছে ২০০৯ সালে, ক্ষমতায় আসার পর ২০০৯-১০ সালে যে বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছিল তাতে স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ ছিল মোট বাজেটের ৬.২ শতাংশ এবং জিডিপির ০.৯০ শতাংশ আর সেখানে সর্বশেষ ২০১৭-১৮ বাজেটে স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ ছিল ৫.২শতাংশ এবং জিডিপির ০.৯৪ শতাংশ । প্রকৃতপক্ষেস্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ টাকার অঙ্কে বাড়লেও মোট বাজেট ও জিডিপি’র অনুপাতে সেই পরিমাণ নিতান্তই হতাশাব্যঞ্জক (লেখচিত্র ১)। বর্তমান অর্থবছরে স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ বিগত বছরের তুলনায় কিছুটা বেড়েছে এটাই কিছুটা হলেও একমাত্র আসার বাণী।

লেখচিত্র ১. স্বাস্থ্যখাতে জাতীয় ব্যয়: মোট বাজেট ও জিডিপি’র শতকরা হার

যেখানে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, একটি মানসম্মত স্বাস্থ্য ব্যবস্থা চালাতে হলে স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ জিডিপি’র ৫ শতাংশ হওয়া উচিত সেখানে বাংলাদেশে প্রায় এক যুগ ধরে এই স্বাস্থ্যখাতে বাজেট বরাদ্দ প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। বর্তমান কর-জিডিপি অনুপাতের তুলনায় এটা অবাস্তবায়নযোগ্য মনে হলেও বরাদ্দের স্বল্পতা একটা উদ্বেগের বিষয়।
স্বাস্থ্যখাতে উন্নয়ন ও অনুন্নয়নমূলক ব্যয়ের মধ্যেও রয়েছে ব্যাপক পার্থক্য(লেখচিত্র ২)। বিগত অর্থবছরের তুলনায়২০১৭-১৮অর্থবছরে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে অনুন্নয়ন ব্যয় বেড়েছে ৩,০৮৩কোটি টাকা, সেখানে উন্নয়ন ব্যয় বেড়েছে মাত্র ২,০০০কোটি টাকার মত। সর্বসাকুল্যে দেশের ১৬ কোটি মানুষের জন্য স্বাস্থ্যখাতে মোট বরাদ্দ ১৭,৪৮৬ কোটি টাকা, সেক্ষেত্রে মাথাপিছু বরাদ্দ পড়ে প্রায় ১,০৯৩ টাকা।

লেখচিত্র ২. স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দকৃত বাজেটের গতিপ্রকৃতি (কোটি টাকা)

বাংলাদেশে স্বাস্থ্য ব্যয়ের হালচিত্র
সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে স্বাস্থ্যখাতে রোগীর নিজস্ব অর্থ ব্যয় সবচেয়ে বেশি এবং এ ব্যয় ক্রমেই বাড়ছে। বর্তমানে দেশের মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের মাত্র ২৩% বহন করে সরকার; ১৯৯৭ সালে সরকারের অংশ ছিল ৩৭%। বেসরকারি এনজিও ও স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানগুলো ৩% এবং দাতা সংস্থাগুলো অবস্থাভেদে ৭% পর্যন্ত ব্যয় বহন করে থাকে। আন্তর্জাতিক মানদ-ে বাংলাদেশে মাথাপিছু স্বাস্থ্য ব্যয় (সরকারি, বেসরকারি এবং ব্যক্তিগত) সর্বনি¤œ পর্যায়ে রয়েছে, যা মাত্র ২৭ ইউএস ডলার, যেখানে ভারতে ৬১ ইউএস ডলার এবং মালয়েশিয়ায় ৪১০ ইউএস ডলার । লক্ষণীয় বিষয় হল, মোট স্বাস্থ্যব্যয়ে সরকারি ব্যয় বাংলাদেশে সবচেয়ে কম (২৩%), যেখানে ভারতে ৩৩% এবং নেপালে ৪০%। অপরদিকে স্বাস্থ্যখাতে ব্যক্তিপর্যায়ে ব্যয় বাংলাদেশে সর্বোচ্চ (৬৩.৩%) যেখানে ভারতে ৫৭.৩% এবং নেপালে ৪৯.২%। গত ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৭ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হেলথ ইকোনমিকস ইউনিট প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ ন্যাশনাল হেলথ অ্যাকাউন্টস ১৯৯৭-২০১৫’ শীর্ষক প্রতিবেদনে স্বাস্থ্য ব্যয়ের এমন তথ্যই দেয়া হয়েছে।বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যানুযায়ী, দৈনিক আয় যাদের ৩.১ ডলার, অতিরিক্ত স্বাস্থ্য ব্যয়ের কারণে দারিদ্র্যের কবলে পড়ছে তাদের ৪.০৮ শতাংশ। কাজেই অতিরিক্ত স্বাস্থ্য ব্যয়ের কারণে চরম দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাচ্ছে দেশের ৪.৫ শতাংশ মানুষ।

বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাত: জনবল সংকট, অসমতা ও দুরাবস্থা
বাংলাদেশে একদিকে জনসংখ্যা অনুপাতে প্রয়োজনীয় সংখ্যক জনবলের অভাব রয়েছে, অপরদিকে এ জনবলের মধ্যে রয়েছে আনুপাতিকভাবে ভারসাম্যের অভাব। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, প্রতি ১০,০০০ জনে স্বাস্থ্যকর্মী থাকা প্রয়োজন কমপক্ষে ২৩ জন, বাংলাদেশে সেখানে রয়েছে মাত্র ৫.৮ জন। যেখানে চিকিৎসক নার্সের অনুপাত হবে ১:৩; বাংলাদেশে চিকিৎসক নার্সের অনুপাতিক হার ০.৬। যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত চিকিৎসা সাময়িকী ল্যানসেটের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবাদানকারীদের ৯৪% অদক্ষ। চিকিৎসক তৈরির সব প্রতিষ্ঠান মানসম্মত নয়। সেই সাথে রয়েছে সরকারি হাসপাতালগুলোতে শূন্য পদ পূরণে বিলম্ব। এখনও সারাদেশে প্রায় সাত থেকে আট হাজার শূন্য পদ রয়েছে। দেশে বর্তমানে গ্রাম পর্যায়ে ৪৫০০ ধাত্রী নিযুক্ত রয়েছে যা মাত্র ১% মাতৃসুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারে। এর সাথে রয়েছে বাংলাদেশে সরকারি স্বাস্থ্যখাতে জনবল সংকট ও এর বিন্যাসে বৈষম্য। যেসব জেলায় ধনী মানুষের বসতি বেশি সেসব জেলায় সরকারি ব্যয়ও বেশি। মোট স্বাস্থ্য বাজেটের ৪১ শতাংশ ব্যয় হয় ঢাকা জেলায় এবং চট্টগ্রাম জেলায় ১৮ শতাংশ। সবচেয়ে কম ব্যয় হয় সিলেট ও বরিশাল বিভাগে মাত্র ৪ ও ৫ শতাংশ যথাক্রমে । এটি একদিকে যেমন দুর্বল সরকারি ব্যবস্থাপনাকে নির্দেশ করে অন্যদিকে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতে দুর্নীতির চিত্রকেও তুলে ধরে।

বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতের দুরাবস্থা এবং প্রধান প্রতিবন্ধকতাসমুহ
সরকার একদিকে যেমন সরকারি হাসপাতালের দক্ষতা বাড়াতে পারছে না, অন্যদিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা বাবদ ব্যয়। সরকারি হাসপাতালে আলট্রাসনোগ্রাফি অব অ্যাবডোমেন করতে খরচ পড়ে ৪৫০ টাকা আর বেসরকারি হাসপাতাল বা ডায়গোনস্টিক সেন্টারে নেয় ১২০০ থেকে ১৬০০ টাকা। উপরন্তু, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রিপোর্ট অনুযায়ী উপজেলা বা গ্রামাঞ্চলে পদায়িত ডাক্তারদের ৩০ শতাংশই কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকেন। কর্মস্থলে নিরাপত্তার অভাব, বাসস্থান ও অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধার সংকট এর পেছনে প্রধান কারণ বলে উঠে এসেছে সংস্থাটির প্রতিবেদনে।
স্বাস্থ্যখাতে বাজেট প্রণয়ন প্রক্রিয়া সম্পূর্ণভাবে কেন্দ্রীভূত
বাংলাদেশে স্বাস্থ্যখাতে বাজেট প্রণয়ন প্রক্রিয়াকেন্দ্রীভূত। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রণীত বিধিমালা অনুসারে উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ও তার নিচের প্রতিষ্ঠানসমূহে স্বাস্থ্য বাজেট নির্ধারিত হয়। এখানে জেলার সিভিল সার্জন কার্যালয়ের কোন ভূমিকা নেই। সুযোগ নেই স্থানীয় চাহিদার আলোকে নতুন কোন খাত অন্তর্ভুক্তির বা কোন খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির। দেশের উপকূল, চরাঞ্চল, হাওড় ও দুর্গম পার্বত্যাঞ্চল যেখানে দুর্বল যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে সরকারি চিকিৎসা কেন্দ্রে সেবা নেয়ার সুযোগ সীমিত, সেখানে অঞ্চল ভিত্তিক চিকিৎসা সেবা বা উপযোগী বাহনের কোন ব্যবস্থা নেই। অপরদিকে ঐতিহ্যবাহী লোকজ অভিজ্ঞতা ও চিকিৎসা পদ্ধতি কাজে লাগানোর বিষয়ে বরাদ্দের ক্ষেত্রে জাতীয় বাজেট সম্পূর্ণভাবে উদাসীন।

সুপারিশমালা
১. বাংলাদেশে স্বাস্থ্যখাতে বাজেট প্রণয়নে কেন্দ্রীভূত প্রক্রিয়া থেকে সরে আসতে হবে। জেলা পর্যায়ের সমন্বয় ও স্থানীয় চাহিদার আলোকে বাজেট প্রণয়ন প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে;
২. প্রাতিষ্ঠানিকভাবেস্বাস্থ্য বাজেট ব্যবহারের সক্ষমতা বৃদ্ধিসহ পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ প্রদান করতে হবে;
৩. স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ অনুযায়ী, একটি দেশের মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের অন্তত ৬৮ শতাংশ বহন করার কথা সরকারের, বাংলাদেশকে এর কিছুটা হলেও বাস্তবায়ন করতে হবে;
৪. অঞ্চলভিত্তিক চাহিদা ও প্রয়োজনের ভিত্তিতে বাজেট বরাদ্দ প্রদান করতে হবে। সারাদেশে শূন্যপদ অনতিবিলম্বে পূরণ,দক্ষ চিকিৎসকের সুষম বন্টন এবং অধিক সংখ্যক নার্স তৈরির উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে;
৫. প্রত্যন্ত ও পার্বত্য অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবার দিকে নজর দিতে হবে এবং এর জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে;
৬. নির্যাতিত শিশু ও নারীদের চিকিৎসা ব্যয় সরকারিভাবে বহন করার জন্য বাজেট বরাদ্ধ রাখতে হবে;
৭. কর্মস্থলের উপস্থিতির প্রতিবন্ধকতা দূরীকরণের ব্যবস্থা গ্রহণ করে চিকিৎসকদের নিয়মিত কর্মস্থলে উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে; এর সাথে সাথে স্বাস্থ্যখাতের সকল প্রকার অপচয়, অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতি দূর করতে হবে;
৮. ওষুধ শিল্পের মান ও মূল্য উভয়ই নিয়ন্ত্রণ করতে হবে;
৯. স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে লোকজ অভিজ্ঞতা ও চিকিৎসকদের মূল্যায়ন ও উৎকর্ষ সাধনে যথাযথ বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে;
১০. স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের মান উন্নয়ন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণে হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভা সচল ও নিয়মিত করতে হবে কমিটির সভাপতির অনুপস্থিতিতে মনোনীত ব্যক্তির মাধ্যমে সভা পরিচালনা করতে হবে;
১১. টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা আলোকে এবং সকলের জন্য মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকারকে বাস্তবসম্মত পথ নির্দেশিকা ঘোষণা করা এবং সকলের জন্য সরকারিভাবে স্বাস্থ্য বীমার ব্যবস্থা চালু করতে হবে।