জাতীয় বাজেট ২০১৮-১৯-তে একশনএইড বাংলাদেশের প্রস্তাবনা ২০১৮

 

বিগত কয়েক বছরে সরকারের গৃহীত বেশকিছু উদ্যোগ প্রশংসার দাবি রাখে। যেমন জেলা বাজেট ঘোষণা, শিশু বান্ধব বাজেট ও নারীবান্ধব বাজেট প্রতিবেদন, বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর সাথে বাজেটপূর্ব মতবিনিময় সভা ইত্যাদি। তবে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা, ৭ম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা ও রূপকল্প ২০২১ বাস্তবিক অর্থে অর্জন করতে চাইলে এই সব ক্ষেত্রে গুনগত মান রক্ষার বিকল্প নাই।

বিষয় ও খাতভিত্তিক প্রস্তাবনা

১. সামাজিক অবকাঠামো খাত যেমন-শিক্ষা, স্বাস্থ্য, মাতৃ ও শিশু কল্যাণে বরাদ্দ বৃদ্ধি করতে হবে।
২. শিক্ষা, স্বাস্থ্য, মানব সম্পদ উন্নয়ন খাতে নারীদেও অগ্রাধিকার দিয়ে নারী উন্নয়ন নীতিমালা ২০১১ এর আলোকে সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি থাকা আবশ্যক। পাশাপাশি জেন্ডার বাজেট বাস্তবায়নে মন্ত্রণালয় গুলোর কাজের মূল্যায়ন হওয়া জরুরী। নারীর ক্ষমতায়নে আগামী অর্থবছরের বাজেটে নারীদের জন্য সরাসরি উন্নয়ন বরাদ্দ কমপক্ষে ২০ শতাংশ করতে হবে এবং নারী সহিংসতা প্রতিরোধ ও প্রতিকাওে বিশেষ বরাদ্দ থাকতে হবে। জেলা ভিত্তিক জেন্ডার বাজেট প্রণয়ন করতে হবে।
৩. বাজেটের আকারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কৃষিরজন্য বরাদ্দবৃদ্ধি, জলবায়ুপরিবর্তন, কৃষিতে বৈশি^ক প্রতিযোগিতা, কর্মসংস্থান, খাদ্য নিরাপত্তা ইত্যাদি বিষয় বিবেচনায় রেখে জাতীয় বাজেটের ২০ শতাংশ কৃষিতে বরাদ্দ রাখতে হবে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাধ্যমে জলবায়ু সহিঞ্চু স্থায়িত্বশীল কৃষিচর্চার কৌশল ও দক্ষতা বৃদ্ধিতে প্রশিক্ষণ এবং গবেষণাখাতে বরাদ্দ রাখতে হবে। পাশাপাশি প্রকৃত কৃষকদের নিয়ে‘ উৎপাদন ও বিপণন সমবায়’ গঠন করে সমবায়ের মাধ্যমে কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাত করণ শিল্প ও হিমাগার স্থাপন করতে হবে।কৃষি পণ্যের মূল্য নির্ধারণ ও সরকারি-বেসরকারি কৃষিপণ্য ক্রয় পদ্ধতিতে সংস্কার আনতে ‘জাতীয় কৃষিপণ্য মূল্য কমিশন’ গঠন করতে হবে। নারী কৃষকদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি প্রদানের মাধ্যমে ঋণসহ সকল সরকারি জনসেবা ও প্রণোদনায় অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করতে হবে। কৃষি জমির অকৃষিখাতে ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। দেশের মৃতপ্রায় নদীগুলোকে রক্ষা করাএবং নদীর পানি ভিত্তিক সেচ ব্যবস্থাকে পুনরুজ্জীবিত করতে হবে। যে কোনো ধরণের দুর্যোগের ক্ষতির হাত থেকে ক্ষুদ্র কৃষকদের রক্ষার জন্য ‘শস্য বীমা’ চাল ুকরতে হবে।
৪. খাদ্যের অধিকারকে নাগরিকের মৌলিক অধিকার হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি প্রদান করতে হবে।২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে দারিদ্র্য বিমোচন ও দরিদ্র মানুষের সামাজিক সুরক্ষা প্রদান এবং কর্মসংস্থানের বিষয়সমূহ সংশ্লিষ্ট আইন ও নীতিমালা দ্বারা সংরক্ষিত করতে হবে। নগর দরিদ্রদের জন্য সামাজিক সুরক্ষাবলয় তৈরি করা প্রয়োজন। পাশাপাশি আদিবাসী, প্রতিবন্ধী, উপকূল-চর-হাওর অঞ্চলের জনগোষ্ঠীসহ অন্যান্য সুবিধা বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর জন্য জাতীয় বাজেটে সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি থাকা দরকার।
৫. নতুন পে-স্কেলের সাথে সমন্বয় রেখে প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে শ্রমিকের জন্য জাতীয় ন্যূনতম মজুরীর বোর্ড পুন:গঠন ও শক্তিশালীকরনে এই বাজেটে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা থাকা দরকার। শ্রমিক দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য সেক্টর ও কারখানা ভিত্তিক প্রশিক্ষণ প্রদানের লক্ষ্যে- ক) প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট, খ) জেলা পর্যায়ে প্রশিক্ষণ ব্যয়, এবং গ) গবেষণাকার্য পরিচালনায় বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ থাকতে হবে। সেইসাথে শিল্পশ্রমিক (বিশেষত গার্মেন্টস, লেদার ও ট্যানারি শ্রমিক)-দের জন্য পরিবহন ও আবাসন সুবিধা তৈরি করতে বিশেষ তহবিল গঠন করা দরকার।
৬. জাতীয় প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধির জন্য শ্রমঘন শিল্পে সরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা দরকার। বন্ধকৃত সকল রাষ্ট্রীয় কলকারখানা সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার আওতায় অবিলম্বে চালু করা উচিত। বিদ্যূৎ উৎপাদনে পুনঃব্যবহারযোগ্য জ্বালানী খাতে সরকারি বিনিয়োগ ও ভর্তুকি বৃদ্ধি করা দরকার।
৭. অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে চর, উপকূল, হাওড় ও পাহাড়ি এলাকায় বাজেট বরাদ্দ করতে হবে। উচ্চশিক্ষা ও কারিগরী শিক্ষায় বৃত্তিসহ আদিবাসী, দলিত ও প্রান্তিকনারী ও তরুণদের আত্ম-কর্ম সংস্থানের জন্য বাজেটে বরাদ্দ রাখতে হবে।
৮. “প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষাআইন ২০১৩” এবং “নিউরো-ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধী সুরক্ষা ট্রাস্ট আইন ২০১৩” এর বিধি ও জাতীয় কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য বাজেটে অগ্রাধিকার দেয়া প্রয়োজন। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের আতœকর্মসংস্থান, প্রশিক্ষণ এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগের জন্য ঋণ সুবিধার ব্যবস্থা করা দরকার।
কাঠামোগতসংষ্কার প্রস্তাবনা
৯. জনগণের মতামতের ভিত্তিতে বাজেট তৈরি করতে হলে প্রাথমিক স্বাস্থ্য, প্রাথমিক শিক্ষা, কৃষি সম্প্রসারণসহ বেশ কিছু খাত স্থানীয় সরকারের হাতে ন্যস্ত করতে হবে। এজন্য জাতীয় বাজেটের বিকেন্দ্রীকরণ করে এই খাতগুলোর বাজেট প্রণয়ন প্রক্রিয়া জেলাপর্যায় ও এর নিচে নিয়ে আসতে হবে। এজন্য প্রয়োজন জেলা পরিষদকে আরো শক্তিশালী করা এবং এই স্তরে অবিলম্বে নির্বাচনের ব্যবস্থা করতেহবে। সরকার ইতিমধ্যে ৭টি জেলায় জেলা-ভিত্তিক বাজেট বরাদ্দের চিত্র প্রকাশ করেছেন। এটা বাজেটের স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতার মাপকাঠিতে প্রশংসার দাবি রাখে। কিন্তু এখানে জনপ্রতিনিধি ও জনসাধারণের কোন সম্পৃক্ততা না থাকায় এবং কর-কাঠামোর বিকেন্দ্রীকরণ না হওয়ায় প্রকৃত জেলা বাজেটের সুফল মানুষ পাবে না। এজন্য ২০১৮-১৯বাজেটে জনঅংশগ্রহণমূলক জেলাভিত্তিক বাজেট প্রণয়নের রূপরেখা ঘোষণা করা দরকার।
১০. জাতীয় সংসদে বাজেট আলোচনার সময়সীমা আরো বাড়ানো উচিত। সংসদ সদস্যগণ যাতে দীর্ঘ সময় নিয়ে সংসদে বাজেট আলোচনায় অংশ নিতে পারেন এবং স্বাধীনভাবে পক্ষে কিংবা বিপক্ষে মতামত দিতে পারেন সেজন্য ‘কার্যপ্রণালীবিধি’তে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা প্রয়োজন।
১১. গত কয়েকবছর থেকে আমাদের পরোক্ষ করের আওতা বেড়ে যাচ্ছে। যার চাপ প্রান্তিক ও দরিদ্র মানুষের উপর পড়ছে। আমাদের সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা হলো পরোক্ষ করের আওতা হ্রাস করা হোক। এক্ষেত্রে কর্পোরেট করের মাধ্যমে অর্থায়নের কথা ভাবা যেতেপারে।