প্রাক-বাজেট নাগরিক সভা শ্রম ও কর্মসংস্থান ২০১৮

 

স্থানঃ শিক্ষা ও গবেষণা ইন্সটিটিউট

তারিখঃ ০৪ মে, ২০১৮।

অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন একশনএইড বাংলাদেশ এর ডিরেক্টর আসগর আলী সাবরি। সাবরী ভাই আলোচনার উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলেন। এরপর আবদুল্লাহ শাহরিয়ার ভাইকে বক্তব্য দেয়ার জন্য অনুরোধ করেন।

শাহরিয়ার ভাই বলেন, ২০১৫ সালের লেবার ফোর্সসার্ভে অনুযায়ী ৬ কোটি ৮০ লক্ষ শ্রমিক আছে। সেবা, শিল্প ও কৃষি খাতে শ্রমিকদের বরাদ্দ সম্পর্কে বলেন। বাজেটে শ্রমিকদের জন্য খুব কম বরাদ্দ রয়েছে। এটা নিয়ে খুব কম কথা বলা হয়। এখানে আলচনার মাধ্যমে অনেক সুপারিশ পাওয়া যাবে। যা শ্রমিকদের অধিকার আদায়ে কাজে লাগবে।

এরপর সিকান্দার আলী মিনা ভাই শ্রম ও কর্মসংস্থান বাজেট ২০১৭-১৮ খুব সংক্ষিপ্ত ভাবে তুলে ধরেন। তিনি, ২০১৭-১৮ সালের শ্রমিকদের বাজেটে বরাদ্দ ও অংশগ্রহণ বিভিন্ন তথ্যের মাধ্যমে তুলে ধরেন।

এরপর আবুল কালাম আজাদ ভাই শ্রমিকদের বাজেট নিয়ে কথা বলেন। তিনি প্রবাসী শ্রমিকদের সম্পর্কে বলেন, যেসকল প্রবাসী শ্রমিক রক্ত পানি করে দেশে টাকা পাঠায় , আমাদের রেমিটেন্স বাড়ে। কিন্তু এই টাকা তাদের পরিবারের কতটুকু উপকারে আসে তা কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারেনা। তিনি ট্যানারি বুড়িগঙ্গা থেকে সাভারে সরানোর ফলে শ্রমিকদের যাতায়াতের যে সমস্যা সেগুলো সম্পর্কে বলেন।

প্রবাসে, প্রবাসী শ্রমিকদের সুবিধার জন্য প্রতিনিধি আছেন, যিনি সকল প্রবাসী শ্রমিকদের সুযোগ সুবিধা দেখবেন। কিন্তু মালয়েশিয়ায় শ্রমিকরা কেউ মারা গেলে তাদের মরদেহ সরাসরি দেশে আনা অনেক সমস্যার। তাদের নেপালের পাসপোর্ট নিয়ে সেখানে নিতে হয় তারপর দেশে আনতে হয়। এটা অনেক দুঃখ জনক।

এরপর সাবরী ভাই আলোচনায় অংশগ্রহণকারীদের থেকে শ্রমিকদের বাজেটের জন্য সুপারিশ করার অনুরোধ জনান।

অংশগ্রহণকারীদের সুপারিশমালাঃ

১। শ্রম ও কর্মসংস্থানের বিষয়গুলো তুলে ধরে আলোচনা করা।

২। শ্রমিকদের জন্য হাসপাতালের, ডরমেটরি/আবাসন ও ডেকেয়ার-এর ব্যবস্থা করতে হবে। ফ্যাক্টরি বা গার্মেন্টস স্থানান্তর করলে শ্রমিকদেরও সেখানে আবাসন ও পরিবহণের ব্যবস্থা করতে হবে।

৩। প্রাতিষ্ঠানিক ও অ-প্রাতিষ্ঠানিক শ্রমিকদের জন্য রেশনিং এর ব্যবস্থা করতে হবে।

৪। বর্তমানে চুক্তিভিত্তিক বা আউট-সোর্সসিং এর মাধ্যমে শ্রমিক নিয়োগ দেয়া হচ্ছে। বিমানে ৫০% এর মত চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়া হচ্ছে। বাজেটে এই বিষয়গুলো নিয়ে কি চিন্তা করা হচ্ছে।

৫। গ্লোবাল সাপ্লাই চেইনের কারণে নারী শ্রমিকদের অংশগ্রহণ বাড়ছে। তাঁদের নিরাপত্তা ও আবাসন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। শ্রমিকদের জন্য কিছু সামাজিক সুরক্ষা ছিল, সেটা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এই সুযোগ ও সুবিধাগুলো যাতে বন্ধ না হয় সেই দিকে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।

৬। আত্মনির্ভরশীল জাতি গড়ে তোলার জন্য শ্রমিকদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষতা বাড়িয়ে মানব সম্পদে গড়ে তুলতে হবে।

৭। দেশ থেকে দক্ষ শ্রমিক বিদেশে যায়, কিন্তু তাঁদের প্রশিক্ষণ ও সার্টিফিকেট না থাকার কারণে, ভাল কাজ পায় না। যার ফলে, আমাদের দেশে রেমিটেন্সের হার কমে যায়। ভারত ও নেপালের একজন শ্রমিক বিদেশে গেলে তার দক্ষতার সার্টিফিকেট থাকে, নিজ রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি থাকে, তারা ভাল কাজ পায় ও যার কারণে তাঁদের রেমিটেন্সের হার আমাদের থেকে বেশি। এই জন্য মাননীয় মহাপরিদর্শকের কাছে আবেদন করেন, “বিদেশে কর্মরত শ্রমিকদের যথাযথ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সার্টিফিকেট ও স্মার্টকার্ডের মাধ্যমে পরিচয়পত্র দিয়ে স্বীকৃতি দিয়ে রেমিটেন্স বাড়ানোর সুযোগ করে দেয়া।

৮। শ্রমিকদের রেশন এর ব্যবস্থা করতে হবে।

৯। শিল্প অঞ্চলে শ্রমিকদের ছেলেমেয়েদের সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার ব্যবস্থা করে দিতে হবে। শ্রমিকদের ছেলেমেয়েদের জন্য প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ পর্যন্ত উপবৃত্তির ব্যবস্থা করতে হবে।

১০। ২০১৩ সালে শ্রম আইন সংশোধন করার পরেও শ্রম আইন প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে না, সেটা প্রতিষ্ঠা করার জন্য যথাযথ উদ্যোগ নেয়া।

১১। বাংলাদেশে যাদের জন্য বাজেট তাঁদের কোন ধরনেরই সম্পৃক্ততা দেখা যায় না, তাই বাংলাদেশের বাজেটকে গন্ত্রান্তিক বাজেট বলা যাবেনা। শ্রমিক ইউনিয়নের মাধ্যমে শ্রমিকদের সাথে কথা বলে, কৃষক নেত্রীবৃন্দ ও নারী নেত্রীদের সাথে বসে, তাঁদের প্রয়োজনীয়তা অনুযায়ী বাজেট প্রণয়ন করা উচিত।

১২। কৃষি, গার্মেন্টস এবং প্রবাসীদের দ্বারা দেশের বেশীরভাগ অর্থনীতি পরিচালিত হচ্ছে। সরকারের পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যদি গুরুত্বপূর্ণ হয় তবে, অর্থনীতির চালিকা শক্তি হিসাবে শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং প্রবাসী মন্ত্রণালয়ও একই গুরুত্ব পাওয়ার কথা কিন্তু তা হচ্ছে না। তাই, এই মন্ত্রনালয়ের প্রতিও বিশেষ নজর ও বরাদ্দ দেয় উচিত।

১৩। শ্রম আইন প্রতিষ্ঠার জন্য শিল্প অঞ্চলগুলোতে শ্রম দপ্তর ও শ্রম আদালত তৈরি করতে হবে। এগুলো বস্তবায়নের জন্য বাজেটের বরাদ্দ বেশি দরকার।

১৪। ট্রেড ইউনিয়ন তৈরি করতে গেলে শ্রমিকদের ছাটাই করে দেয়া হয়। এর জন্য ট্রেড উনিয়ন ও এর মাধ্যমে শ্রমিকরা যাতে তাঁদের অধিকার পায় তার ব্যবস্থা করা। ট্রেড ইউনিয়ন গড়ে তোলা।

১৫। মঙ্গার সময় কৃষি শ্রমিকদের গ্রামেই বিকল্প কাজের ব্যবস্থা করা। গ্রামে ধান মাড়াইয়ের কাজ মেশিনের মাধ্যমে করার ফলে কৃষি শ্রমিকরা কজ হারাচ্ছে। এর বিকল্প কাজের ব্যবস্থা গ্রামে তৈরি করা।

১৬। শ্রম আইন বাস্তবায়ন করে শ্রমিকের কাছে যাতে পৌছাতে পারে সেজন্য শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রনালয়কে আরও সম্বৃধি করতে হবে। এই মন্ত্রণালয়ের বাজেট আরও বাড়াতে হবে।

১৭। যেসব নারী শ্রমিক বিদেশে যাচ্ছে শ্রম দিতে, তারা যখন তাঁদের কাজের চুক্তি শেষ করে দেশে ফিরে আসে তখন অনেকেই কাজ পান না, দুর্বিষহ দিনযাপন করেন। তারা যেন কাজ করে খেতে পারে, সে ব্যবস্থা করতে বাজেটে তাঁদের জন্য বরাদ্দ রাখতে হবে।

১৮। অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে নারী শ্রমিকদের অংশগ্রহণ বেশি। প্রচুর নারী শ্রমিক গনপরিবহনে প্রতিদিন যাতায়াত করে। নারীর নিরাপত্তা বৃদ্ধিতে সচেতনতা বাড়াতে হবে। গনপরিবহনে যাতে নারীরা নিরাপদ ভাবে যাতায়াত করতে পারে, সেজন্য থোক বরাদ্দ রাখতে হবে।

১৯। নারী শ্রমিকদের সন্তানদের দেখাশোনা করার জন্য ডেকেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে নারী শ্রমিকরা ঝরে না পড়ে।

২০। শ্রমিক আহত বা নিহত হবার পর শ্রমিকরা যাতে ন্যায্য ক্ষতিপূরণ পায় সরকারি পর্যায়ে তার ব্যবস্তা দ্রুত করা। হামিদা আপা বলেন, ইনস্যুরেন্স থাকলে শ্রমিকরা তাদের ক্ষতিপূরণ যথাযথ সময়ে পাবে। তাই , সরকারী ও বেসরকারি ভাবে ইনস্যুরেন্সের ব্যবস্থা রাখা।

২১। প্রত্যেকটি ইউনিয়নে তালিকার মাধ্যমে ভূমিহীন কৃষকদের রেশনিং পদ্ধতির আওতায় আনতে হবে।

২২। সরকারের আরও ৮-১০ টি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় আছে। বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়, পরিবহণ মন্ত্রনালয়, রেলওয়ে মন্ত্রণালয় এরকম আরও কয়েকটা মন্ত্রণালয় আছে, সেখানেও অনেক শ্রমিক কাজ করে। তাঁদের নিয়েও আমাদের চিন্তা করতে হবে ও বলতে হবে।

২৩। জাতীয় মজুরী কমিশন এখনো ঘোষণা হয় নি। সকল শ্রমিকদের নুন্যতম মজুরীর ব্যবস্থা করতে হবে ও এই মজুরী কমিশন সংশোধন করতে হবে। ১৮ হাজার টাকা করতে হবে নিম্নতম মজুরী। পে-স্কেল, জিডিপি, মাথাপিছু আয় সব কিছু মাথায় রেখে এটা নির্ধারণ করতে হবে।

২৪। শ্রমিকদের সেক্টর অনুযায়ী মজুরীর পরিমাণ ভিন্ন হয়ে থাকে। এটার সমতা আনা।

২৫। শ্রমিকের নিজস্ব অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য Welfare Attitude Skill এর ব্যবস্থা করার জন্য সরকারের কাছে প্রস্তাবনা করছি।

২৬। কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের উপ-মহা পরিচলক, জনাব মাহফুজুর রহমান ভূঁইয়া জাতীয় নুন্যতম মজুরী ঘোষণা করা হবে সে ব্যপারে বলেন। এছাড়া তিনি বলেন, আগামী বছরের মধ্যে শ্রম সেক্টর থেকে শিশু শ্রম মুক্ত এবং ২০২১ সালের মধ্যে পুর দেশ থেকে শিশু শ্রম মুক্ত করা হবে।

২৭। তিনি আরও বলেন, সরকার মালিকদের জমি দেয়, কিন্তু মালিকরা তার শ্রমিকদের জন্য আবাসন এর ব্যবস্থা করেনা। এটা মালিকদের দায়িত্ব। সরকার আইন তৈরি করবে, প্রেশার দিবে, বাস্তবায়ন মালিক পক্ষ করবে।

২৮। আমাদের পাটকল গুলো এতো সম্বৃধ ছিল। বর্তমানে এই পাটকলগুলো পুনরব্যবস্থাপনার মাধ্যমে আবার চালুকরলে অর্থনৈতিক আয় বাড়বে ও শ্রমিকদের কল্যাণ হবে।

২৯। প্রাক-বাজেট আলোচনায় শ্রমিকদের অংশগ্রহণের ব্যবস্থা করা, সংসদীয় পর্যায়ে এটা যেকোনো কমিটির মাধ্যমে তুলে ধরতে হবে। এই কমিটিতে শ্রমিকরা থাকবেন, অর্থনীতিবিদরা থাকবেন।

৩০। কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরকে আরও শক্তিশালী করার জন্য পরিদর্শক বৃদ্ধি করতে হবে। ৬৪ টি জেলতেই এই অধিদপ্তরের অফিস থাকতে হবে।

৩১। শ্রমিকদের জন্য সুচিকিৎসার ব্যবস্থা থাকতে হবে। এর জন্য হাসপাতাল করার কথা বলা হচ্ছে, হাসপাতাল করা না গেলেও শ্রমিকদের একটা হেলথ কার্ড দেয়া হবে, যার মাধ্যমে তারা যেকোনো সরকারি বা বেসরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে চিকিৎসার সুযোগ পাবে।

সবশেষে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের  মহাপরিদর্শক, মোঃ সামছুজ্জামান ভূঁইয়া বলেন, মধ্যমেয়াদী বাজেটের মাধ্যমে তারা এক বছরে কি করবে না করবে, সেটার টাকা নির্ধারণ করে ফেলেন। যার ফলে কোন নতুন প্রকল্প গ্রহণ করলেও ফান্ডিংএর সমস্যা হয় না। আর দূরদর্শী বাজেটের মাধ্যমে ৩ বছরে কি কি করবেন সেটা নির্ধারণ করেন।

তিনি আরও বলেন, শ্রমিকদের স্মার্ট কার্ড দিয়েছেন, যার মাধ্যমে শ্রমিকরা বিভিন্ন সুবিধা পাবে। ট্যানারি সরানো হয়েছে বিসিকের মাধ্যমে। ট্যানারি অনেক বড় শিল্প, এটার সুস্ঠ পরিকল্পনা করতে পারে নাই, যার কারণে ট্যানারি শ্রমিকদের আবাসনের ও যাতায়াতের কোন ব্যবস্থা তারা নিতে পারে নাই। এই জন্য কারখানার মালিকদেরও উদ্যোগ নেয়া উচিত।

তিনি আরও বলেন, নারায়ণগঞ্জে শ্রমিকদের জন্য হাসপাতাল করা হচ্ছে, নারীদের জন্য ডরমেটরি বালুরঘাটে এবং টঙ্গীতে করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। অকুপেশনাল হেলথ সেন্টার তৈরি করা হচ্ছে রাজশাহীতে।

তিনি যখন থাইল্যান্ডে গিয়েছিলেন তখন সেখানে বেকারদের জন্য জব সেন্টার দেখেছেন। এই জব সেন্টারের মাধ্যমে ঐ দেশের বেকাররা কাজ পেয়ে থাকে। তিনি চিন্তা করছেন, আমাদের দেশেও এমনটি খোলার কথা।

শ্রমিকদের সকল ধরনের সুবিধা দিতে চাইলে সরকারের পাশাপাশি মালিক পক্ষের পদক্ষেপ বেশি জরুরী।