প্রাক বাজেট মতবিনিময় সভার প্রতিবেদন ২০১৯

কর্মসংস্থান সৃষ্টি, অসমতা দূরীকরণ, গণপরিসেবার মান বৃদ্ধিতে জাতীয় বাজেট কি ভূমিকা রাখছে? শীর্ষক মতবিনিময় সভা

স্থান: সিরডাপ মিলনায়তন, ঢাকা।
তারিখ : ০৭ এপ্রিল ২০১৯
সময় : সকাল ১০.০০ – ১.০০
সভাপ্রধান: জনাব আবুল কালাম আজাদ, সহ-সভাপ্রধান, গণতান্ত্রিক বাজেট আন্দোলন।
মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন: জনাব মনোয়ার মোস্তফা, নির্বাহী পরিষদ সদস্য, গণতান্ত্রিক বাজেট আন্দোলন।
সঞ্চালনা: ফারাহ্ কবির, কান্ট্রি ডিরেক্টর, একশনএইড বাংলাদেশ।

আজসকাল ১০.০০গণতান্ত্রিক বাজেট আন্দোলন প্রাক বাজেট মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয়। সভা সঞ্চালনার দায়িত্ব পালন করেন ফারাহ্ কবির, কান্ট্রি ডিরেক্টর, একশনএইড বাংলাদেশ এবং সভা প্রধান হিসেবে উপস্থিত ছিলেন আবুল কালাম আজাদ, সহসভাপতি, গণতান্ত্রিক বাজেট আন্দোলন। সঞ্চালক সবাইকে শুভেচ্ছা জানান এবং মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনের জন্য জনাব মনোয়ার মোস্তফাকে অনুরোধ করেন। জনাব মনোয়ার মোস্তফা আলোচনাপত্র উপস্থাপন করেন। পরবর্তীতে সঞ্চালক প্যানেল আলোচকদের মধ্য থেকে রোকেয়া কবির, নির্বাহী পরিচালক, নারী প্রগতি সংঘ কে অনুরোধ করেন, তিনি জেন্ডার বাজেট নিয়ে কাজ করে আসছেন ১৯৯৮-৯৯ সাল থেকে। নারীর প্রতি বৈষম্য নিরসনে এবং বাজেটে নারীদের জন্য বরাদ্দ বাড়ানোর ব্যাপােের জোর দেন। নারীদের মেন্সস্ট্রুয়াল ম্যানেজমেন্টের জন্য সঠিক ব্যবস্থাপনা নেই যার কারনে বাল্য বিবাহ বৃদ্ধি পায়। তিনি এই খাতে বাজেটে বরাদ্দ রাখার কথা বলেন। নারী শ্রমিকদের সামাজিক নিরাপত্তায় শিক্ষা, স্বাস্থ্য , গণপরিবহন থেকে বৃদ্ধকালীন পেনশন ইত্যাদি ক্ষেত্রে বরাদ্দ বাড়াতে হবে। জনগণের ট্যাক্সের টাকা অপচয় না করে পানিতে না ফেলে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে সরকারকে অনুরোধ জানান। সঞ্চালক জনাব রাজেকুজ্জামান রতন, সাধারন সম্পাদক, সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্ট- কে তার বক্তব্য রাখার জন্য অনুরোধ জানান। তিনি বাংলাদেশ জিডিপিতে প্রথম সারিতে রয়েছে কিন্তু তা আসলে কতটা কার্যকর তা নিয়ে আলোকপাত করেন। গত বছর শিক্ষা খাতে বাজেটে বরাদ্দ হয়েছিল ২ শতাংশ কিন্তু নেপালে ৩.৭ শতাংশ, ভারত ৩.৮ শতাংশ, ভিয়েতনাম ৫.৭ শতাংশ, মালদ্বীপ ৫.২ শতাংশ এবং পাকিস্তান ২.৬ শতাংশ বরাদ্দ করে। স্বাস্থ্য খাতে .৯ শতাংশ বরাদ্দ করা হয় যা অন্যান্য দেশের তুলনায় কম। কৃষি ও শিল্প খাতে বাজেট বরাদ্দের অবস্থা আরো খারাপ। দুর্বল স্বাস্থ্যের কারনে শ্রমিকদেও উৎপাদনশীলতা বাড়ছে না। কৃষিতে ১ টাকা বিনিয়োগ করলে ১৯ টাকা ফেরত আসে। কিন্তু এই খাতে বরাদ্দ বাড়ানো হচ্ছে না।

এই পর্যায়ে সঞ্চালক অংশগ্রহণকারীদের মধ্য থেকে তাদের মতামত প্রদানের জন্য অনুরোধ জানান। জনাব মোহসিন আলী, নির্বাহী পরিচালক, ওয়েভ ফাউন্ডেশন বলেন, বাজেট প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক সিদ্ধন্ত এবং জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। ধনী ব্যবসায়ীর মতামতকে যেভাবে প্রাধান্য দিতে হবে তেমনি, অভিবাসীদের এবং শ্রমিকদের মতামতকেও গুরুত্ব দিতে হবে। সরকারের রাজনৈতিক ইশতেহার বাস্তবায়নে বাজেটকে কাজে লাগাতে হবে। বাজেট প্রণয়ণ প্রক্রিয়ায় স্থানীয় সরকার এবং কেন্দ্রিয় সরকারের কাছে কি থাকবে তা নিয়ে দাবী তোলার বিষয়ে গণতান্ত্রিক বাজেট আন্দোলনকে আহ্বান জানান। বস্তি উন্নয়ন নিয়ে কাজ করেন ফাতেমা বলেন, ঢাকায় প্রায় ৪০ লক্ষ বস্তিবাসী রয়েছে। সিটি কর্পোরেশন এর বস্তি উন্নয়ন সেল রয়েছে কিন্তু তারা সেই অফিস থেকে কোনো সহযোগিতা পান না। তিনি এই বছরের বাজেটে বস্তিবাসীর উন্নয়নে আলাদা বরাদ্দের দাবী জানান। আশিক ইকবাল, ডেপুটি ডিরেক্টর, চাইল্ড রাইটস ডিপার্টমেন্ট, সেইভ দা চিলড্রেন বলেন, জনসংখ্যার ৪৫ শতাংশই শিশু এবং শিশুরা বাজেটের অধীনে কিন্তু তাদের অংশগ্রহণও গুরুত্ব পায় না বাজেটে বরাদ্দের ক্ষেত্রে। ইউনিয়ন পরিষদের বাজেট প্রক্রিয়ায় জনগণকে সম্পৃক্ত করা হয় এবং তিনি ইউনিয়ন পরিষদের বাজেট বাড়ানোর জন্য সুপারিশ করেন।নাগরিক উদ্যোগ থেকে নাদিরা দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার জন্য বাজেটে সরকারের যথাযথ বরাদ্দ রাখার সুপারিশ জানান।দলিত সংগঠনের পক্ষ থেকে রাজু তাদের জন্য বাজেটে বরাদ্দের ব্যাপারে দাবী জানান। ২০১০-১১ সালের বাজেটে প্রথমবারের মতো ১০ কোটি টাকা দলিতদের উন্নয়নে বরাদ্দ করা হয়েছিল এবং তার পরবর্তী বছরের বাজেটে তা আর পাওয়া যায়নি। তাই তিনি বাজেটে পুনরায় দলিতদের জন্য বরাদ্দ এবং পরবর্তীতে তা বহাল রাখার দাবী জানান।

সঞ্চালক আবারো প্যানেল আলোচকদের মধ্য থেকে ইঞ্জিনিয়ার মোঃ নুরুল্লাহ, অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী, এলজিইডি কে তার বক্তব্য রাখার অনুরোধ জানান। তিনি বাজেট বিষয়টি কিভাবে পরিচালিত হয় এবং বাজেট সমন্বয়ের ব্যাপারে আলোকপাত করেন। তিনি গণতান্ত্রিক বাজেট আন্দোলনের সদস্যদেরকে সমস্যা বিশ্লেষন করে সেই ইস্যুতে বাজেট প্রণয়ন করার জন্য সুপারিশ করতে বলেন।ফিরোজা বেগম, নির্বাহী পরিচালক, বাঁচতে শেখো নারী বলেন নারীদের কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বাজেটে পর্যাপ্ত বরাদ্দ রাখা উচিত এবং বাজেট বন্টন সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়িত হতে হবে। প্যানেল আলোচক রোকেয়া রফিক, নির্বাহী পরিচালক, কর্মজীবি নারী বলেন, গার্মেন্টস শ্রমিকদের বাসস্থান, নিরাপত্তা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিউট্রিশন ইত্যাদি বিষয়ে বাজেট কিভাবে বিবেচনা করছে তা পর্যবেক্ষন করতে হবে। গার্মেন্টস এর বয়স্ক নারীদের জন্য বাজেটে বরাদ্দ রাখার ব্যপারে সুপারিশ করেন। হাসিনুল ইসলাম চুন্নু, নির্বাহী পরিচালক, সচেতন, রাজশাহী বলেন জুন মাসে সরকার বাজেট ঘোষনার আগে আমরা বাজেট নিয়ে কিছু প্রোগ্রাম করি কিন্তু তা কার্যকর কোনো ভূমিকা রাখে না। কিন্তু আমরা যদি চলমান প্রোগ্রাম অব্যাহত রাখতে পারি তাহলে বাজেটে জনগণের আশা আকাঙ্খা প্রতিফলিত হবে বলে তিনি মনে করেন।সালাউদ্দিন বাবলু, এস এ টিভি থেকে বলেন, জিডিপির মাত্র ১৭ শতাংশ হলো বাজেট। আমাদের অর্থনীতি মূলত কৃষি, রপ্তানি, রেমিটেন্স এর উপর দাড়িয়ে আছে। এই তিন ক্ষেত্রেই জনগণ ভর্তুকি দিচ্ছে। তাই বাজেটের সাথে প্রাইস পলিসিটা বিশ্লেষন করা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন। প্যানেল আলোচক ডা. রশীদ-ই-মাহবুব, সভাপতি, স্বাস্থ্য অধিকার আন্দোলনএবং সাবেক সভাপতি, বিএমএ বাজেট নিয়ে আলোচনায় বলেন কমিউনিটি চিকিৎসার সুফল বিশ্বব্যপি প্রচার করছে সরকার। এর মাধ্যমে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত হয়েছে বলা হচ্ছে। কিন্তু দরিদ্র মানুষ চিকিৎসার ৬৭ শতাংশ খরচ নিজের পকেট থেকে ব্যয় করছে। তাই এই সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে আমাদের চিন্তা চেতনা দিয়ে সরকারের সাথে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারি কি না। আব্দুর রাজ্জাক, সাধারন সম্পাদক, ইমারত নির্মাণ শ্রমিক ইউনিয়ন বাংলাদেশ নির্মান শ্রমিকদের কর্মস্থলে স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা বিধান উন্নয়নে বাজেটে বরাদ্দের দাবী জানান।

সবশেষে, সঞ্চালক বাজেটের সুষম বন্টন নিশ্চিত করার আশা ব্যক্ত করেন। সঞ্চালনাকারি সভাপ্রধান আবুল কালাম আজাদ, সহ-সভাপ্রধানকে তার সমাপনি বক্তব্য প্রদান করার আহ্বান জানান। তিনি বাজেট শুধুমাত্র আয়-ব্যয়ের হিসাব নয় এবং বাজেট আন্দোলন জনমানুষের মনে উৎসাহ তৈরি করতে পেরেছে। মানুষ এখন বুঝতে পারছে যে আমি ভ্যাট ট্যাক্স দিচ্ছি তা কোথায় খরচ হচ্ছে এবং কিভাবে খরচ হচ্ছে। পঞ্চবার্ষিকি পরিকল্পনা অনুযায়ী বাজেট প্রণয়ন করতে হবে। তিনি সকলকে ধন্যবাদ জানিয়ে সভার সমাপ্তি ঘোষনা করেন।

প্রতিবেদন প্রস্তুতকারী

হাছিনা খানম
আইন কর্মকর্তা
সেইফ্টি এন্ড রাইটস সোসাইটি
১৪/২৩ বাবর রোড (৫ম তলা), ব্লক- বি
মোহাম্মদপুর, ঢাকা- ১২০৭