শ্রম ও কর্মসংস্থান বাজেট ২০১৭-১৮ ২০১৮

দারিদ্র্য বিমোচন ও স্থায়িত্বশীল উন্নয়নের পূর্বশর্ত হচ্ছে গুনগতমানসম্পন্ন শোভন কাজ সৃষ্টি করা। আমাদের দেশে কর্মস্থলে শ্রমিকের নিরাপত্তাহীনতা, ন্যূনতম মজুরীর অভাব, সামাজিক সুরক্ষার ঘাটতি শ্রমপরিস্থিতিকে নাজুক করে তুলেছে। আইটিটিউসি’র প্রতিবেদনে বাংলাদেশের শ্রমঅধিকারের মানকে সর্বনি¤œ তালিকায় রাখা হয়েছে।
বাংলদেশ শ্রমশক্তির জরিপ ২০১৩ অনুযায়ী ২০১৩ সালে ২৩.৪ মিলিয়ন তরুন-তরুনী (বয়স সীমা ১৫ থেকে ২৯) জাতীয় শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণ করে, যাদের মধ্যে ৯.৩ মিলিয়ন তরুনী এবং ১৪ মিলিয়ন তরুন। বর্তমানে দেশের মোট শ্রমশক্তির ৩৮.৫ শতাংশ যুবা। এ তরুন¬-যুবকদের বড় অংশ কর্মহীন; অথচ অনেক বিদেশি বাংলাদেশে কাজ করছে। এর প্রধান কারণ হল চাহিদা ও যোগানে ঘাটতি। আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহ চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে ব্যর্থ হচ্ছে।
আমাদের দেশে সেখানে প্রতিবছর ২০ লক্ষ নতুন মানুষের জন্য কর্ম সংস্থান তৈরি করার কথা । ২০ লক্ষ নতুন কর্মশক্তিতে যোগ গয় তার মধ্যে আমরা সরকারি খাত, বেসরকারি খাত মিলে ১০- ১১ লক্ষ লোকের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ করতে পারি। বাকি ৯ লক্ষ লোক অপ্রাতিষ্ঠানিকখাতে কোন না কোন ভাবে জীবিকা নির্বাহ করছে। অথচ আমাদের দেশে বিভিন্ন সেক্টরে দেশের বাইরে থেকে লোকজন বেশি বেতনে কাজ করছে।
বাংলাদেশে আগামী দশকগুলোতে বাংলাদেশের মোট শ্রমশক্তিতে তাদের অংশগ্রহণ বেড়ে ৬০ শতাংশের কাছাকাছি পৌছাবে এবং এ ধারা ২০৫০ সাল পর্যন্ত চলবে। এটা বাংলদেশের সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিকভাবে লাভবান হওয়ার ক্ষেত্রে বিশাল সুযোগ তৈরি করবে। ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ট তত্ত্ব অনুযায়ী বাংলাদেশে কর্মক্ষম বিশাল জনগোষ্ঠীকে মানব সম্পদে পরিণত করার জন্য প্রয়োজন নীতিগত দক নির্দেশনা ও পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ। এসব বিষয়সমূহ বিবেচনায় নিয়ে শ্রম বান্ধব বাজেট প্রণয়ন করা শ্রমিকের জীবনমান উন্নয়ন, অর্থনৈতিক মুক্তি ও রাষ্ট্রীয় খ্যাতি অর্জনের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।এই সুযোগের সদ্ব্যবহারের জন্য দক্ষতা বৃদ্ধি,স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে কৌশলগত বিনিয়োগের প্রয়োজন রয়েছে। সেকারণে শ্রম ও কর্মসংস্থান বিষয়ে বাজেট বিশ্লেষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে শ্রমিকদের নিম্নতম মজুরি পূণঃনির্ধারণ, কর্ম-পরিবেশ ও শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ইত্যাদির কথা বলা হয়েছে। টেকশই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার ৮ নং লক্ষ্য হিসেবে ‘শোভন কাজ’ অন্তর্ভূক্ত হয়েছে। বিভিন্ন খাতে শোভন কাজের এ এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে গেলে প্রচূর বিনিয়োগ প্রয়োজন। বাংলাদেশে ক্রমবর্ধমান বেকারত টেকসই উন্নয়ন লক্ষমাত্রা অর্জনের অন্যতম চ্যালেঞ্জ। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে জাতীয় বাজেট বিভিন্ন কারণে শ্রম ও শ্রমিক ইস্যুতে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই অর্থবছরেই পোশাক খাতের নিম্নতম মজুরি পর্যালোচনা, পাটনীতি প্রণয়ন, ট্যানারি কারখানা স্থানান্তর পরবর্তী পদক্ষেপ, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি ইত্যাদি বিষয় বিবেচনার প্রয়োজন।

বর্তমান শ্রম ও কর্মসংস্থান পরিস্থিতি
কয়েক বছর ধরেই ৬ শতাংশের বেশি হারে জিডিপি প্রবৃদ্ধি হচ্ছে দেশে। উচ্চপ্রবৃদ্ধতিতে ভর করে সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন হচ্ছে। অর্থনৈতিক এ উন্নতি সত্ত্বেও কাঠামোগত অবনতিতে দেশের শ্রমবাজার। বাংলাদেশ লেবারফোর্স সার্ভে ২০১৩ এর তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে ১৫ বছর বা তার বেশি বয়সী কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা প্রায় ১০ কোটি ৬৫ লক্ষ। এদের মধ্যে অর্থনৈতিকভাবে সক্রিয় শ্রম শক্তির সংখ্যা প্রায় ৫ কোটি ৮১ লক্ষ যার ১ কোটি ৬৮ লক্ষ সক্রিয় নারী শ্রম শক্তি।

সারনি ১: ২০১৩ সালে প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত শ্রম শক্তি (%)

উৎসঃ বাংলাদেশ লেবার ফোর্স সার্ভে ২০১৫

এই বৃহৎ শ্রমশক্তি প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের বিভিন্ন পেশায় জড়িত আছেন।এদের মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক শ্রমিকের সংখ্যা ৭৬ লক্ষ ২১ হাজার এবং অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকের সংখ্যা ৫ কোটি ৪ লক্ষ ৫২ হাজার। অর্থাৎ মোট শ্রম শক্তির শতকরা ৮৬.৯ ভাগ শ্রমিকই নিয়োজিত রয়েছে অপ্রাতষ্ঠানিক খাতে। শ্রম শক্তিতে নারী পুরুষের অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে দেখা যায়, ১৩.৭ শতাংশ পুরুষ ও ৯.৭ শতাংশ নারী প্রাতিষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত আছে। অন্যদিকে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে মোট শ্রমশক্তির ৯০.৩ শতাংশ নারী ও ৮৬.৩ শতাংশ পুরুষ কর্মরত আছেন। অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের এ বিশাল শ্রমশক্তি সরকারি সকল সুযোগ-সহায়তার বাইরে। প্রাতিষ্ঠানিক শ্রমিক মূলতঃ সরকারি বেসরকারি খাতে বিভিন্ন সংস্থায় নিয়মিত শ্রম দিচ্ছেন যার মধ্যে রয়েছে পাট, টেক্সটাইল, গার্মেন্টস, চিনি, কাগজ, ট্যানারি, পরিবহণ ও চা। অন্যদিকে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকরা মূলতঃ গৃহকর্ম, নির্মান, কৃষি, হকার প্রভৃতি কাজে নিয়োজিত।বাংলাদেশ লেবার ফোর্স সার্ভে ২০১৫ অনুযায়ী, দেশে বৃহৎ অর্থনৈতিক খাতে শ্রমশক্তির অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, মোট শ্রমশক্তির সর্বাধিক সংখ্যক নিয়োজিত আছেন কৃষি খাতে (৪৫.১ শতাংশ), এর পর ৩৪.১ শতাংশ শ্রমিক নিয়োজিত আছেন সেবা খাতে এবং ২১.৮৯ শতাংশ আছেন শিল্প খাতে (লেখচিত্র ৫)।

বর্তমান সরকারের বাজেট বরাদ্দের ধারা

জাতীয় আয়ে শ্রমিকদের অংশগ্রহণ বিপুল হলেও উন্নয়ন বরাদ্দে তাদের হিস্যা অপ্রতুলই থাকছে। শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের ক্ষেত্রে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে বরাদ্দ ২৬২ কোটি টাকা যা গতবছর ছিল ৩০৮ কোটি টাকা। বরাদ্দ কমেছে ৪৬ কোটি টাকা। অন্যদিকে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ ছিল ৬৮৬ কোটি টাকা যা২০১৬-১৭ অর্থবছরে ছিল ৫৬০ কোটি টাকা। বরাদ্দ বেড়েছে ২৬ কোটি টাকা (লেখচিত্র ১ ও ২)।

লেখচিত্র১: শ্রমওকর্মসংস্থানখাতেবাজেটবরাদ্দেরধারা(কোটিটাকায়)


লেখচিত্র২:৫বছরেপ্রবাসীকল্যাণওকর্মসংস্থানখাতেবাজেটবরাদ্দেরধারা(কোটি টাকায়)


লেখচিত্র ৩: শ্রম ও কর্মসংস্থান খাতে রাজস্ব ও উন্নয়ন ব্যয় (কোটি টাকায়)

লেখচিত্র ৪: প্রবাসী কল্যাণ ও কর্মসংস্থান খাতে রাজস্ব ও উন্নয়ন ব্যয় (কোটি টাকায়)

তথ্যসূত্রঃ বাজেটের সংক্ষিপ্তসার (বিভিন্ন বছর )

লেখচিত্র ৩ বিশ্লেষণ করে পাওয়া যায় যে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন ব্যয় ১৬৮ কোটি টাকা এবং অনুন্নয়ন ব্যয় ৯৪ কোটি টাকা যা গতবছর ছিল যথাক্রমে ২০৩ কোটি এবং ১০৫ কোটি টাকা। অন্যদিকে লেখচিত্র ৪ বিশ্লেষণ করে পাওয়া যায় যে প্রবাসী কল্যাণ ও কর্মসংস্থান খাতে রাজস্ব ও উন্নয়ন ব্যয় যথাক্রমে ২৮৮ কোটি টাকা এবং ২৩৭ কোটি টাকা।

বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসুচিতে সেক্টর ভিত্তিক বরাদ্দ
বার্ষিক উন্নয়ন পরিকল্পনার মোট ১৭ টি সেক্টরে ২০১৫-১৬, ২০১৬-১৭ এবং ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বরাদ্দ তুলে ধরা হয়েছে। শ্রম ও কর্মসংস্থান সেক্টরে ২০১৬-১৭ তে বরাদ্দ ছিল ৪৮৯.২৮ কোটি টাকা এবং ২০১৬-১৭ তে যা দাঁড়িয়েছে ৫৮০.৭০ কোটি টাকা। গুরুত্বপূর্ণ এই সেক্টরে প্রায় ১০ কোটি মানুষের জন্য মোট এডিপির ০.৩৮ শতাংশ বরাদ্দ রাখা হয়েছে যা খুবই সামান্য (সারনি ২)।শ্রম মন্ত্রণালয়ের গৃহীত প্রকল্প বিশ্লেষণ করে দেখা যায় যে বিনিয়োগ প্রকল্পের পরিমাণ কারিগরি প্রকল্প অপেক্ষা বেশি। এই বিনিয়োগ প্রকল্পগুলোর বেশিরভাগই অবকাঠামো নির্মাণ সংক্রান্ত। অন্যদিকে শ্রম মন্ত্রণালয়ের বেশিরভাগ প্রকল্প পোশাক খাতকে কেন্দ্র করে। ফলশ্রুতিতে অন্যান্য ৪১টি আনুষ্ঠানিক খাত সমানভাবে গুরুত্ব পাচ্ছে না। যেহেতু বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির সুবিধা জনগণ তথা শ্রমিকগোষ্ঠি সরাসরি পান তাই এখানে মন্ত্রণালয় ভিত্তিক এডিপি বিশ্লেষণ জরুরি।

সারনি ২: বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসুচিতে সেক্টর ভিত্তিক বরাদ্দ (কোটি টাকা)

শ্রমজীবী মানুষের কল্যাণে নেয়া সরকারের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে অপর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ
খাতওয়ারি জিডিপি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, জিডিপিতে শিল্পখাতের অবদান সর্বাধিক ১৯.৪৫ শতাংশ, কৃষিখাতের অবদান ১২.৬৪ শতাংশ, পরিবহন খাতের অবদান প্রায় ১২ শতাংশ, এবং নির্মান খাতের অবদান ৭ শতাংশ। বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ক্ষেত্রে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি বৈদেশিক মুদ্রা আয় হয় গার্মেন্টস সেক্টর থেকে এবং প্রবাসিদের পাঠানো রেমিটেন্স থেকে। অথচ প্রবাসি শ্রমিকসহ বিভিন্নখাতে নিয়োজিত এ বিশাল শ্রম শক্তির নেই কোন স্বীকৃতি, নেই কোন মর্যাদা। নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর কাজের পরিবেশ, ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত কর্মঘন্টা অনুসরণের সুযোগ নেই। শ্রমজীবী মানুষের কল্যাণে নেয়া সরকারের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি ও বরাদ্দ অর্থ খুবই অপর্যাপ্ত। বাংলাদেশ অকুপেশনাল সেইফটি, হেলথ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট ফাউন্ডেশন (ওশি) (২০১৬) এর একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেটে সামাজিক সুরক্ষা খাতে ৪৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা থাকলেও এই বরাদ্দের মাত্র ৬ দশমিক ৬৫ শতাংশ শ্রমজীবী মানুষের সামাজিক সুরক্ষায় প্রাক্কলিত ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে। বর্তমানে জাতীয় বাজেটের ৯ দশমিক ১৪ শতাংশ সামাজিক সুরক্ষা এবং ৩ দশমিক ৫৯ শতাংশ সামাজিক ক্ষমতায়ন খাতে ব্যয় করা হয়।

লেখচিত্র ৫- বৃহৎ অর্থনৈতিক খাতসমূহে শ্রমিকের অংশগ্রহণ (%)


উৎসঃ বাংলাদেশ লেবার ফোর্স সার্ভে, ২০১৫

শ্রম মন্ত্রণালয়ের গৃহীত প্রকল্প বিশ্লেষণ করে দেখা যায় যে বিনিয়োগ প্রকল্পের পরিমাণ কারিগরি প্রকল্প অপেক্ষা বেশি। এই বিনিয়োগ প্রকল্পগুলোর বেশিরভাগই অবকাঠামো নির্মাণ সংক্রান্ত। অন্যদিকে শ্রম মন্ত্রণালয়ের বেশিরভাগ প্রকল্প পোশাক খাতকে কেন্দ্র করে। ফলশ্রুতিতে অন্যান্য ৪১টি আনুষ্ঠানিক খাত সমানভাবে গুরুত্ব পাচ্ছে না। যেহেতু বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির সুবিধা জনগণ তথা শ্রমিকগোষ্ঠি সরাসরি পান তাই এখানে মন্ত্রণালয় ভিত্তিক এডিপি বিশ্লেষন জরুরি।

গড় মজুরিতেও এশিয়ার অন্য দেশের তুলনায় পিছিয়ে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ শ্রমশক্তির তথ্য ২০১৫ অনুযায়ী, প্রাতিষ্ঠানিক-অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে লিখিত ও মৌখিক চুক্তি এবং অন্যান্যভাবে কর্মরত ২ কোটি ৩৪ লাখের বেশি শ্রমিক। এর মধ্যে ১ কোটি ৪১ লাখ মৌখিক সম্মতিতে কাজ করছেন। মৌখিক সম্মতিতে কর্মেনিয়োজিতদের মধ্যে আবার ১ কোটি ১০ লাখের বেশি পুরুষ। এছাড়া ৩১ লাখ নারী শ্রমিকও লিখিত চুক্তি ছাড়াই মৌখিক সম্মতিতে কাজ করছেন যা মোট নারী শ্রমিকের ১৬.৪৫%।এদিকে প্রাতিষ্ঠানিক খানে কর্মরত শ্রমিকেরা খুবই সীমিত আইনের সুবিধা পাচ্ছে কিন্তু অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কর্মরত শ্রমিকদের ক্ষেত্রে অনুপস্থিত।

দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে শ্রমওকর্মসংস্থানপ্রবাসীকল্যাণওকর্মসংস্থানখাতে মন্ত্রণালয়ে অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে তুলনামূলক বিচারে বাজেট বরাদ্দ খুবই কম। অর্থবিভাগ থেকে ২০১৬ সালে প্রকাশিত আগামী ৩ বছরের জন্য মধ্যমেয়াদি সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতি-বিবৃতি শীর্ষক প্রতিবেদন দেখা গেছে, ২০১৬-১৭, ২০১৭-১৮ এবং ২০১৮-১৯ অর্থবছরে কর্মসংস্থানের জন্য কর্মপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। যারমধ্যে আত্মকর্মসংস্থান ও ব্যক্তি উদ্যোগের স্বতঃস্ফূর্ত বিকাশকে উৎসাহিত করে বেকারত্ব দূর করা, ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করা ইত্যাদি পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাজেটে এর প্রতিফলন নেই বললেই চলে। বাংলাদেশ অর্থনীতি সমীক্ষা ২০১৫ সালের তথ্যানুযায়ী, বিদেশে পেশাজীবী জনশক্তি প্রেরণের হার ১ শতাংশেরও কম। দক্ষ জনশক্তি প্রেরণের হার ৩৬ শতাংশ, স্বল্পদক্ষ জনশক্তি প্রেরণ করা হয়েছে ৪৭ শতাংশ এবং আধা-দক্ষ জনশক্তি প্রেরণের হার ১৭ শতাংশ। অর্থাৎ মোট জনশক্তি প্রেরণের অর্ধেকেরও বেশি লোক দক্ষ নয়। অভিবাসন খাতের জন্য এই বরাদ্দ মোট বাজেটের মাত্র ০.১৬ শতাংশ। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে বাংলাদেশের সাফল্যের কথা বলা হলেও জাতীয় বাজেটে অভিবাসন খাত খুবই অবহেলিত। বৈদেশিক আয়ের পরিমাণ বছরের পর বছর বাড়লেও আমাদের জাতীয় বাজেটে অভিবাসন খাতে বরাদ্দ বাড়েনি। বাড়েনি অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা। তৈরি পোশাক শিল্পের মাধ্যমে ২০১৫ সালে বিজিএমইএ-এর তথ্যানুযায়ী রপ্তানি আয়ের পরিমাণ প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলার। তবে তুলা, সুতা, কাঁচামাল ইত্যাদির খরচ বাদ দিলে নিট রপ্তানি আয় দাঁড়ায় ১৩ বিলিয়ন। অন্যদিকে প্রবাসীদের পাঠানো বৈদেশিক মুদ্রার পরিমাণ প্রায় ১৫ বিলিয়নেরও বেশি। সেই বিবেচনায় সব দিক থেকে এটিই প্রতীয়মান হয় যে, প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সই আমাদের বৈদেশিক আয়ের প্রধান খাত। এদিকে, বর্তমান প্রতিষ্ঠানগুলোর আধুনিকায়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধি, প্রতিবন্ধী ও নারীবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টির লক্ষ্যে প্রচুর অর্থের প্রয়োজন। অন্যদিকে প্রতিবছর জাতীয় বাজেটের আকার বাড়ার সাথে সাথে প্রতিবন্ধী মানুষদের উন্নয়নের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতাধীন সামাজিক নিরাপত্তা এবং সামাজিক ক্ষমতায়ন খাতেও প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর জন্য বরাদ্দ বাড়ানো হয়। কিন্তু প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর জন্য এই বরাদ্দ দেশের ১ কোটি ৪৫ লক্ষ প্রতিবন্ধী জনসংখ্যার তুলনায় খুবই নগন্য ও অপ্রতুল। প্রতিবন্ধীদের জন্য বিভিন্ন প্রশিক্ষণের বাবস্থা করা এবং তাদেরকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তরিত করা জরুরী।

সুপারিশমালা

  • দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর জন্য (লেস অব ইয়ার আরনিং) মৃত্যুর সময় থেকে চাকরির মেয়াদকাল পর্যন্ত ইনক্রিমেন্ট, মূল্যস্ফীতির ভিত্তিতে মজুরি নির্ধারণ করে ক্ষতিপূরণের জন্য বাজেট বরাদ্দ। শ্রমিকদের জন্য ক্ষতিপূরণের স্থায়ী নীতিমালা তৈরি এবং কার্যকর করা।
  • শ্রমিকদের পেশাগত স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এবং হাসপাতাল স্থাপন করা। মালিকপক্ষ কর্তৃক শ্রমিকদের স্বাস্থ্য বীমা প্রণয়ন করা।
  • দুর্যোগকালীন সময়ে বা কোন দূর্ঘটনা হলে শ্রমিকদের মানসিক স্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে সরকারের বাজেট বরাদ্দ রাখা।
  • নারী কৃষি শ্রমিকের সাংবিধানিক স্বীকৃতি প্রদান। মৌসুমে স্থানান্তরিত শ্রমিকের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিতকরণে কৃষক শ্রমিকের বিধিবিধান তৈরী ও কর্মদক্ষতা উন্নয়নে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা।
  • কৃষকশ্রমিকদের সমবায়ের মাধ্যমে বীজ উৎপাদন, বিপণন, সংরক্ষণের এবং কৃষি উপকরণ সমবায়ের মাধ্যমে বিতরণের ব্যবস্থা করা।
  • রাষ্ট্রীয় পাটকলগুলোকে আবার চালু করে সেগুলোকে আধুনিক করা।
  • জাতীয় মজুরি কমিশন/নিম্নতম মজুরী বোর্ডকে শক্তিশালীকরণ ও পূনর্গঠনে জাতীয় বাজেটে সুনির্দিষ্ট বরাদ্দ রাখা।
  • নারী পুরুষের সমতা আনয়নে বিশেষ উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ ও সুনির্দিষ্ট বরাদ্দ।
  • শ্রমিকদের পেশাগত স্বাস্থ্য সুরক্ষার লক্ষ্যে বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এবং গবেষণার লক্ষ্যে প্রাথমিক পর্যায়ে উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা ইনস্টিটিউট স্থাপন যা পরবতীতে স্থায়ী রূপ দান।
  • শ্রমিকদের জন্য রেশনিং ব্যবস্থা চালুর লক্ষ্যে বাজেটে সুনির্দিষ্ট বরাদ্দ।
  • বেসরকারি খাতের শ্রমিকের আবাসন ব্যবস্থা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সুনির্দিষ্ট বাজেট বরাদ্দ।
  • শ্রমিকদের মাতৃত্বকালীন ভাতা ও অন্যান্য বিষয়গুলো সরাসরি বাজেটে রাখার ব্যবস্থা করা।
  • লেদার সেক্টরের জন্য একটা ন্যূনতম মজুরি আছে কিন্তুতা কার্যকরি নয়, এটি কার্যকর করা।
  • জাতীয় পেনশন স্কিম প্রণয়নের মধ্য দিয়ে সকল শ্রমিকের জন্য পেনশন ব্যবস্থা চালু করা।
  • শ্রমিক দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য সেক্টর ও কারখানাভিত্তিক প্রশিক্ষণ প্রদাণের লক্ষ্যে (ক) প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট, (খ) জেলা পর্যায়ে প্রশিক্ষণ ব্যয়, এবং (গ) গবেষণা কার্য পরিচালনায় বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ।