করপোরেট ট্যাক্স ফাঁকি আর প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ওপর ভ্যাটের বোঝা

বিগত কয়েক দশকে আর্থ-সামাজিক বিভিন্ন সূচকে বাংলাদেশ অনেকাংশে এগিয়েছে নি:সন্দেহে। উর্ধ্ব দারিদ্রের হার সরকারি হিসেবে ৩১.৫ শতাংশে নেমে এসেছে। প্রাথমিক স্বাস্থ্য ও পুষ্টি, প্রাথমিক শিক্ষা, মাতৃমৃত্যু রোধ ইত্যাদি বেশ কয়েকটি ক্ষেত্রে আমাদের অগ্রগতি উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এখন দৃষ্টান্ত বটে। কিন্তু আকাক্সক্ষার মাপকাঠিতে এগুলো যথেষ্ট নয়। দেশে এখনো অনেক মানুষ অনাহারে – অর্ধাহারে -অপুষ্টিকর খাবার খেয়ে দিন কাটায়, ফুটপাতে বা খোলা আকাশের নীচে রাত পার করে। সিডর-আইলা-মৌসুমী বন্যা এসব দুর্যোগে সর্বশান্ত অসংখ্য মানুষ এখনো ফিরে পায়নি তার নিরাপদ জীবন। স্বাধীন জাতি হিসেবে আমাদের দায়িত্ব এসকল সমস্যার আমূল উৎপাটন। রাষ্ট্রের দায়িত্ব দারিদ্র্য বিমোচন, আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন, সামাজিক নিরাপত্তা খাতে জাতীয় বাজেটের সিংহভাগ বরাদ্দ করা এবং অনুৎপাদনশীল ও বিলাসী খাতে বরাদ্দ কমিয়ে গণসেবাখাতে প্রগতিশীল বরাদ্দ প্রদান করা। কিন্তু আমরা দেখে আসছি যে, বছরের পর বছর ধরে রাজস্ব ঘাটতির দোহাই ও অন্যান্য কারণ দেখিয়ে জাতীয় বাজেটে দরিদ্র ও মেহনতি মানুষের জন্য ন্যায্য ও পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ করা হচ্ছে না। অপরদিকে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার জন্য ৮০’র দশক থেকে আজ অবধি কোন যথাযথ মূল্যায়ন ছাড়াই প্রায় একপাক্ষিকভাবে রাষ্ট্রীয় সাহায্য-সহায়তা, পরিবহন-যোগাযোগ ও অন্যান্য খাতে ভর্তুকি ও কর রেয়াতি সুবিধা প্রদান করা হচ্ছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের হিসাব অনুযায়ী ট্রান্সফার প্রাইসিং-এর উপর শক্ত মনিটরিং এর অভাবে প্রতিবছর প্রায় ৯০৮ কোটি টাকা বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে দেশের বাইরে চলে যায়। যার ফলে বাংলাদেশ প্রতিবছর ৩১ কোটি টাকা কর রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। আরো বৃহত্তর ক্ষেত্র যেমন গণসেবাখাত বিশেষত: টেলিযোগাযোগ ও জ্বালানি খাতে বিদেশি কোম্পানিকে প্রদত্ত ভর্তুকি ও সাহায্যের সমমূল্যে বাংলাদেশ গড়ে প্রায় প্রতি বছর পদ্মা বহুমূখী সেতুর মতো মহাপ্রকল্প নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়ন করতে পারে। শুধু শিক্ষাখাতে এই পরিমাণ বরাদ্দ নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশ আগামী পাঁচ বছরে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাখাতে শতভাগ অন্তর্ভুক্তি ও মানসম্মত শিক্ষা অর্জন করতে পারে।

সুতরাং আমাদের দাবি:
১. অবিলম্বে ঢালাও করপোরেট ট্যাক্স ইনসেন্টিভ বাতিল করতে হবে;
২. দেশীয় ও বিদেশি কোম্পানির করপোরেট ট্যাক্স ফাঁকি বন্ধ করতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। এক্ষেত্রে কোন ধরণের দলীয় বা রাজনৈতিক প্রভাব যাতে সক্রিয় না হয়ে ওঠে তার জন্য সরকারকে আস্থাশীল ভূমিকা নিতে হবে;
৩. দরিদ্র-মেহনতি মানুষের উপর বিশেষত: নারী, প্রতিবন্ধী, আদিবাসী, দলিত ও অন্যান্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর উপর পরোক্ষ কর/ ভ্যাটের বোঝা হ্রাস করতে নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের উপর ভ্যাট কমাতে হবে;
৪. করপোরেট ট্যাক্স ফাঁকি ও ইনসেন্টিভ রোধ থেকে অর্জিত রাজস্ব; দারিদ্র্য বিমোচন/ কর্মসংস্থান, সামাজিক নিরাপত্তা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পানীয় – এসব মৌলিক গণসেবাখাতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ব্যয় করতে হবে।

মেহনতি জনতার স্বার্থে গণতান্ত্রিক বাজেট আন্দোলন কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত