গণতান্ত্রিক বাজেট আন্দোলন কেন? ২০১২

জাতীয় বাজেটের বিকেন্দ্রীকরণ, জনঅংশগ্রহণ ও জেলা বাজেট

  • বাজেট মানে সম্ভাব্য আয়-ব্যয়ের হিসাব। বাজেট সাধারণত কোন পরিবার, ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান বা দেশের জন্য করা হয়ে থাকে। পরিবারের আয় ও ব্যয়ের সমন্বয় সাধনের জন্য পরিবারের প্রধান ব্যক্তি যেমন একটা বাজেট তৈরি করেন তেমনি রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের সমন্বয় সাধনের জন্য রাষ্ট্র বাজেট প্রণয়ন করে থাকে। পার্থক্য হলো যে, পরিবারের ক্ষেত্রে আয় বুঝে খরচের একটা বাজেট করা হয় আর রাষ্ট্র ব্যয় অনুযায়ী আয়ের খাত চিহ্নিত করে।
  • বাজেটের অর্থ সংগ্রহ করা হয় ১. রাষ্ট্রের নাগরিকের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ করের মাধ্যমে ২. সাধারন জনগণের নামে দেশ-বিদেশ থেকে ঋণ এর মাধ্যমে। এ সবই জনগণের অর্থ। এ অর্থ ব্যয় করা হয় জনগণেরই প্রয়োজনে। অতএব কোন খাতে কত টাকা ব্যয় হওয়া উচিত, তা জনগণের মতামতের ভিত্তিতে ঠিক করা উচিত।
  • রাষ্ট্রের মালিক হলো জনগণ। জনগণ যত বেশি আগ্রহ নিয়ে বাজেট বোঝার চেষ্টা করবে এবং তাদের মতামত প্রকাশ করবে, বাজেটে ততই তাদের ইচ্ছা-অনিচ্ছার প্রতিফলন ঘটার সুযোগ থাকবে। একইসাথে রাষ্ট্রীয় বাজেট জনগণের বাজেটে পরিনত হতে থাকবে। বাজেট যারা তৈরি এবং বাস্তবায়নের কাজ করেন তারা জনতার যত কাছাকাছি থাকবেন বাজেট এর সুফল তত কার্যকরীভাবে মানুষের কাছে পৌঁছাবে।
  • বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে জাতীয় বাজেট তৈরি একটি কারিগরি বিষয় এবং আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়া। এখানে সাধারণ শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণ তো দূরে থাক, সংসদসদস্যসহ স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের অংশগ্রহণের কোন প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ নাই। শুধু জুন মাস আসলে সাংবিধানিক নিয়মের কারণে বাজেট অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয় এবং কিছু সংখ্যক সংসদসদস্য স্থানীয় কিছু দাবিকে সংসদে তুলে ধরার চেষ্টা করেন।
  • গণতান্ত্রিক বাজেট আন্দোলনের লক্ষ্য হলো, জাতীয় বাজেট প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে কেন্দ্রনির্ভর আমলাতান্ত্রিক জাতীয় বাজেটের পরিবর্তে তৃণমূল মানুষের অংশগ্রহণ ও অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে জনমূুখী বাজেট তৈরীর জন্য সামাজিক আন্দোলন জোরদার করা।
  • বাংলাদেশে বর্তমানে একটি অত্যন্ত কেন্দ্রীভূত সরকার রয়েছে অর্থাৎ প্রায় সব সিদ্ধান্ত কেন্দ্র বা রাজধানী ঢাকা থেকে নেয়া হয়। এমনকি একটি গ্রামের কোন রাস্তা বানাতে হলে রাজধানী ঢাকা থেকে তার সিদ্ধান্ত নিতে হয়। কোন কোন ক্ষেত্রে ডজনখানেক ঘাট পেরিয়ে তবে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হয়। উপজেলা/ থানার কর্মকর্তা জেলায় তার বড় সাহেবের কাছে প্রস্তাব রাখলে তা নানা ঘাট ঘুরে প্রস্তাব যায় ঢাকায়। সেখানেও কোন ক্ষেত্রে ৩ পর্যায়ে কখনো ৪ বা ৫ স্তরে ঘুরে সিদ্ধান্ত হয়।
  • বাংলাদেশ সংবিধানের একাধিক অনুচ্ছেদ (যেমন ৮৯ [২], ৯০ [২] ও ৭০) ও জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালী বিধি’র একাধিক ধারার (যেমন ১১১[৩]) কারনে সংসদসদস্যগণও কার্যকরভাবে বাজেট আলোচনায় অংশগ্রহণ করতে পারেন না কিংবা অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। সাধারণ নাগরিক কিংবা ইউনিয়ন, উপজেলা এবং জেলা পরিষদ থেকে নির্বাচিত প্রতিনিধিগণও জাতীয় বাজেট বিষয়ক কোন আনুষ্ঠানিক আলোচনায় অংশ নিতে পারেন না। সুতরাং বাংলাদেশ সংবিধানের পরিবর্তন হওয়া দরকার।
  • বাংলাদেশের সংবিধানে বলা আছে যে, স্থানীয় পর্যায়ে- স্থানীয়ভাবে নির্বাচিত প্রতিষ্ঠান কর আরোপ, বাজেট প্রস্তুত, উন্নয়ন সম্পর্কিত পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকবে। একইসাথে উক্ত প্রতিষ্ঠান নিজস্ব তহবিল রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করে থাকে । এছাড়া সংবিধানের ১৯(১)এ পিছিয়েপড়া জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ ব্যবস্থার কথা এবং ১১, ৫৯ ও ৬০ অনুচ্ছেদে উন্নয়ন পরিকল্পনা ও রাজস্ব/ কর কাঠামোর বিকেন্দ্রীকরণের কথা সুস্পষ্টভাবে বলা আছে।
  • এলাকার চাহিদা অনুসারে সঠিক সমস্যা চিহ্নিত করার জন্য ওয়ার্ড, ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা পর্যায় থেকে পরিকল্পনা ও বাজেট তৈরীর কাজ শুরু করা দরকার। এতে করে জাতীয় বাজেটের মাধ্যমে বিভিন্ন এলাকার চাহিদা অনুযায়ী উন্নয়ন নিশ্চিত হবে।
  • কৃষকদের কাছে মানসম্পন্ন বীজ ও সার সরবরাহ এবং বিষমুক্ত কৃষি শস্য উৎপাদনকে উৎসাহ প্রদান করা এবং নারী কৃষককে স্বীকৃতি দিয়ে কৃষিকার্ডের মাধ্যমে কৃষি উপকরণ, ভর্তুকি, ঋণ ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা প্রদান করতে সরকারকে প্রভাবিত করার জন্য জেলা পরিষদের বলিষ্ঠ ভূমিকা দরকার।