গণতান্ত্রিক বাজেট কি? ২০১০

গণতান্ত্রিক বাজেট কি?
জাতীয় বাজেট বা জনবাজেট স্বাধীন বাংলাদেশের ১৫ কোটি মানুুষের আশা আকাংখার প্রতিচ্ছবি – এমনটা শুধু ভিশন বা স্বপ্ন নয়, এটা দেশের সকল নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকারের বিষয়। প্রতিটি নাগরিক, জাতিগোষ্ঠি ও অঞ্চলের স্বতন্ত্র ও সম্মিলিত উন্নয়ন ছাড়া কোন ভাবেই জাতীয় উন্নয়ন তথা দারিদ্র বিমোচন সম্ভব নয়। এজন্য দরকার সুষম জাতীয় বিনিয়োগ পরিকল্পনা, যা হতে হবে প্রতিটি জাতিগোষ্ঠি ও অঞ্চলের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ও চাহিদার নিরিখে ন্যায্য ও সামঞ্জস্যপূর্ণ। এক্ষেত্রে সংবিধানের ১৯.১ (ক) অনুচ্ছেদে সুষম জাতীয় উন্নয়ন এবং পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ ব্যবস্থার কথা স্মরণ রাখা দরকার।

বাংলাদেশে বর্তমানে একটি অত্যন্ত কেন্দ্রিভূত সরকার রয়েছে। একটি গ্রামে রাস্তা বানাতে হলে বা একটি প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবা বা শিক্ষার ব্যবস্থা করতে গেলে রাজধানীতে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। প্রতিটি নিয়ন্ত্রণবিধি ঢাকা থেকে শুধু উদ্ভূত নয় তার কার্যকরী প্রয়োগও হয় কেন্দ্র থেকে। কেন্দ্রীয় সরকারে যে ব্যবস্থা তাতে প্রতিটি বিষয় নানা আমলাতান্ত্রিক স্তরে বারবার বিবেচিত হয়ে, অন্ততপক্ষে প্রায় ডজনখানেক ঘাট পেরিয়ে তবে সিদ্ধান্ত গ্রহন সম্ভব হয়। এই ব্যবস্থায় কোন জবাবদিহিতার প্রয়োজন পড়ে না এবং প্রতিটি স্তরে অন্যায় আদায়ের ( ঘুষের) বা হয়রানির সুযোগ পূর্ণোদমে ব্যবহৃত হয়।

সংবিধান মোতাবেক শক্তিশালী স্থানীয় সরকার এখন সময়ের দাবি। গত চার দশকে শক্তিশালী স্থানীয় সরকার বিষয়ক গবেষণা, আলোচনা ও আন্দোলনের মূল প্রতিপাদ্য ছিল প্রশাসনিক বিকেন্দ্রিকরণ। এক্ষেত্রে প্রশাসনিক ক্ষমতার বিকেন্দ্রিকরণের পাশাপাশি জাতীয় বাজেট ও উন্নয়ন পরিকল্পনার বিকেন্দ্রিকরণের বিষয়টি তেমনভাবে উঠে আসেনি কোন নীতি আলোচনায়। অথচ জাতীয় পরিকল্পনা ও উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় সাধারণ নাগরিকের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এবং সংবিধানের ১১, ৫৯ ও ৬০ অনুচ্ছেদের ভিত্তিতে এর জন্য উন্নয়ন পরিকল্পনা ও রাজস্ব/ কর কাঠামোর বিকেন্দ্রিকরণ প্রয়োজন। কেননা আমলানির্ভর ও অতিকেন্দ্রীভূত জাতীয় পরিকল্পনা ও বাজেট প্রক্রিয়ায় সাংসদদের কার্যকরি অংশগ্রহণের সুযোগই যেখানে সীমিত সেখানে সাধারণ নাগরিক ও পেশাজীবীদের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহন নিশ্চিত করা অনেক জঠিল ও কঠিন বিষয়। বাজেট প্রক্রিয়ার ও কাঠামোর বিকেন্দ্রিকরণ ছাড়া তাই কার্যকর জনঅংশগ্রহণ সম্ভব নয়। অন্যদিকে বাজেটসহ নীতি নির্ধারণী প্রক্রিয়ায় দীর্ঘদিন জণগণের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ না থাকার কারণে রাষ্ট্রীয় ক্রিয়াকর্মে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রায় অনুপস্থিত, যার ফলে দূর্নীতি আজ দারিদ্র দূরীকরণে সবচেয়ে বড় কাঠামোগত বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

গণতান্ত্রিক বাজেট আন্দোলন কেন?
কিছুদিন আগেও ’জিনিসপত্রের দাম বাড়লো না কমলো’ এটাই ছিল বাজেট বিষয়ে সাধারণ মানুষের আলোচনার মূল বিষয়। একসময় বাজেট বিষয়ক জ্ঞান ও বিদ্যাচর্চা ছিল শুধু অর্থশাস্ত্র ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্রদের সিলেবাসের বিষয়। শীর্ষ ব্যবসায়ী শ্রেণী ছাড়া বাজেট নিয়ে কাউকে হইচই করতে দেখা যেত না। সরকারি দলপন্থীদের গতানুগতিক অভিনন্দন বাণী আর বিরোধী দলের ঢালাও প্রত্যাখ্যানের মিছিল রাজপথ আর পত্রিকার পাতা অলংকৃত করতো। নব্বইয় দশক পরবর্তি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় উত্তোরণের বিভিন্ন পর্যায়ে জাতীয় বাজেটকে কেন্দ্র করে পেশাজীবি, বুদ্ধিজীবি, বেসরকারি সংস্থা ও নাগরিক সমাজের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহের সৃষ্টি হওয়ায় বাজেটকে কেন্দ্র করে নতুন আলোচনা তৈরির পথ প্রশস্ত হয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় এখন প্রাকবাজেট আলোচনা ও বাজেট প্রতিক্রিয়ায় বিভিন্ন শ্রেণীপেশার মানুষকে সম্পৃক্ত হতে দেখা যাচ্ছে। নারীর বাজেট, কৃষকের বাজেট, প্রতিবন্ধীর বাজেট ইত্যাদি নির্দিষ্ট খাত ভিত্তিক বাজেট প্রস্তাবনা করা হচ্ছে সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্র থেকে, মূলতঃ ক্ষেত্র ভিত্তিক বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধি এসব আলোচনার মূল সুর। বাজেট কেন্দ্রিক এই সকল প্রস্তাবনা ও আলোচনার সবই কেন্দ্রীয় সরকারের শীর্ষ ব্যক্তিদেরকে উদ্দেশ্য করে করা হয়ে থাকে, অথচ এ সকল আলোচনা-প্রস্তাবনা সরকারের শীর্ষ কর্তাব্যক্তিদের কাছে পৌঁছায় কিনা তার যথাযথ সন্দেহ মনে মধ্যে রেখেই সংলাপ চালিয়ে যাচ্ছি আমরা। আর মন্ত্রী মহোদয়দের শীর্ষ ব্যবসায়ী গোষ্ঠি ছাড়া এতসংখ্যক শ্রেণী পেশার মানুষের দাবি শোনার অবকাশ কোথায়! সুতরাং জনআকাংখা ও দাবি সরকারের কাছে পৌঁছাতে হলে বাজেট প্রণয়ন ও বাস্তবায়নকারিকে জনতার কাছাকাছি থাকতে হবে তথা বাজেট প্রক্রিয়ার বিকেন্দ্রিকরণ ও গণতান্ত্রিকরণ করতে হবে। এই উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে গণতান্ত্রিক বাজেট শিরোনামে একটি নাগরিক উদ্যোগ ও তাত্ত্বিক কাঠামো গড়ে তোলার লক্ষ্যে এই প্রয়াস ।

বাজেটকে গণতান্ত্রিক করার এই আন্দোলনে স্থানীয় নাগরিক কমিটি, উন্নয়ন সংগঠন, তৃণমূল সংগঠন, সংবাদমাধ্যম/ গোষ্ঠি ও সমাজের অন্যান্য অগ্রসর চিন্তাধারার মানুষেরা দেশের সকল মানুষের ন্যায্য উন্নয়ন পরিকল্পনার জন্য কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় সরকারের কাছে ওকালতি করতে কাজ করছেন। এটা একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া এবং সে লক্ষ্যে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ লড়াই চালিয়ে যেতে হবে।

গণতান্ত্রিক বাজেটের মূল চেতনা

  • জাতীয় বাজেট প্রণয়নে জনগণের সরাসরি অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।
  • কৌশল হিসেবে জেলা ভিত্তিক বাজেট (প্রাথমিক পর্যায়ে) এবং পর্যায়ক্রমে আইন নির্ধারিত অন্যান্য স্থানীয় সরকার পর্যায়ে বাজেট প্রণয়ন করা।
  • সেক্টরভিত্তিক পদ্ধতি বা বাজেট বরাদ্দ পরিহার করা, বরং জেলা বা আঞ্চলিক বাজেট কাঠামোতে সেক্টরভিত্তিক বাজেট বরাদ্দ রাখা ।
  • জাতীয় বাজেট ও আঞ্চলিক বাজেটের খাত/বিভাগসমূহ আলাদা করা। আঞ্চলিক পর্যায়ে বিকেন্দ্রিকরণের জন্য সম্ভাব্য খাতসমূহ নির্দিষ্ট করা, যেমন – শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নারী, শিশু, কৃষি সম্প্রসারণ, শিল্প, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি।
  • জাতীয় বাজেট ও আঞ্চলিক বাজেটের পরিúূরক খাতগুলো এক্ষেত্রে চিহ্ণিত করা।
  • আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্য ও চাহিদার ভিত্তিতে সম্পদ ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা।
  • কর ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে জেলা/ উপজেলা/ ইউনিয়ন পর্যায়ে বাজেট বরাদ্দ করা।
  • সুষম জাতীয় উন্নয়ন নিশ্চিত করার জন্য অধিকতর দারিদ্র প্রবণ অঞ্চলকে অগ্রাধিকার দেয়া।
  • আঞ্চলিক ও জাতিগত বৈষম্য বিবেচনা করা।
  • সাংসদদের কার্যকরি অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।
  • জাতীয় সংসদে জেলা/ অঞ্চল ভিত্তিতে বিস্তারিত আর্থিক বিবরণী প্রকাশ করা।
  • প্রতিবেশ পরিবেশ বিবেচনায় বাজেটকে বিবেচনা করা ও অন্যান্য ক্রাইটেরিয়া/ সূচক নির্দিষ্ট করা।
  • আঞ্চলিক বাজেটের জন্য শুধু লজিস্টিকস্ নয়, সেবার মান উন্নত করার জন্য কর্মসূচি নেয়া। ব্যবস্থাপনা ও কার্যকরি জনবলকে অন্যতম বিবেচনা হিসেবে নেওয়া।
  • বাজেটে অধিকারভোগি বা উপকারভোগির মতামতের প্রতিফলন করা।
  • বাজেট প্রক্রিয়ায় জনগনকে সম্প্রক্ত করার জন্য কার্যকরি ইলেক্ট্রনিক সরকার ব্যবস্থা (ই-গভার্নেন্স) চালু করা।