জন-বাজেট সম্মিলন: ঢাকা ঘোষণা ২০১৫

 

বাংলাদেশ নামের এই স্বাধীন ভূ-খন্ডের বয়স আর পাঁচ বছর বাদে ৫০ এ উপনীত হবে। এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে বিগত দেড় দশক ধরে সামাজিক উন্নয়নের বিভিন্ন সূচকে বাংলাদেশ তাৎপর্যপূর্ণ সাফল্য অর্জন করেছে। বিশেষ করে প্রাথমিক শিক্ষায় ভর্তি, মাতৃ ও শিশু মৃত্যুর হার হ্রাস, নারীর অগ্রগমন ইত্যাদি ক্ষেত্রে উন্নতি প্রশংসার দাবি রাখে। সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতা বৃদ্ধি ও দরিদ্র মানুষের জীবনমান উন্নয়নে নানামূখী উন্নয়ন কর্মসূচি দারিদ্রের হার কমানোর পাশপাশি সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় অগ্রগতিতে ভূমিকা রাখছে।

কিন্তু শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করা, শিক্ষানীতির পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন, উপযুক্ত ও মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা সাধারণ মানুষের দোর গোড়ায়ায় নিয়ে যাওয়া, নারীর প্রতি সহিংসতা রোধ, নারী নীতির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন, আদিবাসী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে উন্নয়নের মূলধারায় নিয়ে আসাসহ নানা ধরণের আর্থ-রাজনৈতিক সমস্যা সমাধানে সরকার চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার বৃদ্ধি করা, ভূমি-সংস্কারসহ সম্পদের ন্যায় সঙ্গত বন্টন, ইতোমধ্যে অর্জিত সামাজিক অগ্রগতির ধারাবাহিকতা রক্ষা করা, আভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণে দক্ষতা বৃদ্ধি, সরকারি বিনিয়োগের ক্ষেত্র সন্ধানে অগ্রাধিকার নির্ধারণ, ব্যয়ের গুণগত মান নিশ্চিত করা ইত্যাদি বিষয়গুলো সরকারের সামনে প্রধানতম বিবেচ্য হিসেবে হাজির হয়েছে।

বলাবাহুল্য, বাংলাদেশের মতো বিকাশমান অর্থনীতিতে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ পরিকল্পনায় ধারাবাহিকতা, দূরদর্শীতা, দক্ষতা ও যথার্থতার অভাব উন্নতির চাকাকে পিছন থেকে টেনে রেখেছে। এককেন্দ্রিক (ইউনিটারি) শাসনব্যবস্থায় নির্বাচিত স্থানীয় সরকারের আইনগত বিকাশ ঘটলেও অর্থনৈতিক ক্ষমতার একচেটিয়া দখল কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে। ফলে বিনিয়োগ পরিকল্পনায় আশানুরূপ স্থায়ীত্বশীলতা, দক্ষতা ও যথার্থতা তৈরি হয়নি। অপরদিকে জাতীয় বাজেটের মতো অতিকেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তগ্রহণ প্রক্রিয়ায় দেশের ‘মালিকদের‘ ‘আনুষ্ঠানিক‘ কোন সুযোগ না থাকায় স্থানীয় বাস্তবতা ও অগ্রাধিকারের সাথে কেন্দ্রীয় বাজেটের বিস্তর পার্থক্য দৃশ্যমান। সেজন্য বাজেটে জনগণ ও নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সরাসরি অংশগ্রহণ এবং আর্থিক বিকেন্দ্রীকরণ এখন সময়ের দাবী।

জাতীয় বাজেট ২০১৫-১৬ বিভিন্ন কারণেই বৈশিষ্ট্যপূর্ণ। ৭ম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার (২০১৫/১৬ – ২০১৯/২০) ১ম অর্থবছর হলো ২০১৫-১৬, যে পরিকল্পনায় বাংলাদেশকে মধ্য আয়ের দেশে পরিনত করার রূপকল্প গ্রন্থিত হয়েছে। পাশাপাশি সহ¯্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্য পরবর্তী টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য (এসডিজি) বাস্তবায়নের ১ম বছর এটি। মহাজোট সরকারের দ্বিতীয় মেয়াদে মধ্যমেয়াদী ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা বা রূপকল্প বাস্তবায়ন হবে এই সময়ে।

সার্বিক প্রেক্ষাপটে উন্নয়ন বাজেটসহ জাতীয় পরিকল্পনায় অংশভাগিদের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ ও বাজেটের বিকেন্দ্রীকরণ কাঠামো এবং এ বিষয়ে জাতীয় সংসদের প্রত্যক্ষ ভূমিকা পালনের বিষয়গুলি বিস্তারিত পরিসরে আলোচনায় আনার লক্ষ্যে গণতান্ত্রিক বাজেট আন্দোলন, জাতীয় পরিকল্পনা ও বাজেট সম্পর্কিত সংসদীয় ককাস এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার অন বাজেট এন্ড পলিসি যৌথভাবে আজ ২৩ মে, ২০১৫ (শনিবার) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জন-বাজেট সম্মিলন ২০১৫ আয়োজন করেছে। দেশের ৪৫ টিরও অধিক জেলা থেকে আগত বিভিন্ন পেশা ও বৈশিষ্ট্যের মানুষের অংশগ্রহণে জন-বাজেট সম্মিলন ২০১৫ থেকে সরকারের কাছে অগ্রাধিকারভিত্তিক নি¤œবর্ণিত দাবী পেশ করা হলো।

কাঠামোগত সংস্কার বিষয়ক দাবী

  • জাতীয় সংসদে বাজেট আলোচনার সময়সীমা আরো বাড়ানো উচিত। সংসদ সদস্যগণ যাতে দীর্ঘ সময় নিয়ে সংসদে বাজেট আলোচনায় অংশ নিতে পারেন এবং স্বাধীনভাবে পক্ষে কিংবা বিপক্ষে মতামত দিতে পারেন সেজন্য ‘কার্যপ্রণালী বিধি’তে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনতে হবে।
  • বাজেটে জনমতামতের কার্যকরী প্রতিফলন ঘটাতে ৭ম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সকল শ্রেণি-পেশার মানুষকে সম্পৃক্ত করতে হবে। কর্মসংস্থান বান্ধব প্রবৃদ্ধি অর্জন ছাড়া মধ্য আয়ের দেশে পৌছাঁনো সম্ভব নয়। এজন্য ৭ম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় সামাজিক অবকাঠামো ও দক্ষ জনবল সৃষ্টির জন্য সুনির্দিষ্ট টার্গেট থাকতে হবে। সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে ৭ম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বিনিয়োগের হিসাব (কস্টিং) নির্ধারণ করতে হবে।
  • জনগণের মতামতের ভিত্তিতে বাজেট তৈরি করতে হলে প্রাথমিক স্বাস্থ্য, প্রাথমিক শিক্ষা, কৃষি সম্প্রসারণ সহ বেশকিছু খাত স্থানীয় সরকারের হাতে ন্যস্ত করতে হবে। এজন্য জাতীয় বাজেটের বিকেন্দ্রীকরণ করে এই খাতগুলোর বাজেট প্রণয়ন প্রক্রিয়া জেলা পর্যায় ও এর নীচে তথা উপজেলা, ইউনিয়ন, পৌরসভা পর্যায়ে নিয়ে আসতে হবে। এজন্য প্রয়োজন জেলা পরিষদকে আরো শক্তিশালী করা এবং এই স্তরে অবিলম্বে নির্বাচনের ব্যবস্থা করা ।
  • সরকার ২০১৪-১৫অর্থবছরে ৭টি জেলায় জেলা-ভিত্তিক বাজেট বরাদ্দের চিত্র প্রকাশ করেছেন। এটা বাজেটের স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতার মাপকাঠিতে প্রশংসার দাবি রাখে। কিন্তু এখানে জনপ্রতিনিধি ও জনসাধারণের কোন সম্পৃক্ততা না থাকায় এবং কর-কাঠামোর বিকেন্দ্রীকরণ না হওয়ায় প্রকৃত জেলা বাজেটের সুফল মানুষ পাচ্ছেনা। এজন্য ২০১৫-১৬ বাজেটে জনঅংশগ্রহণমূলক জেলাভিত্তিক বাজেট প্রণয়নের রূপরেখা ঘোষণা করতে হবে। ইউনিয়ন পরিষদের মুক্ত বাজেটে উত্থাপিত জনচাহিদার ভিত্তিতে জেলা বাজেট প্রণয়ন করতে হবে।
  • কর আহরণ প্রক্রিয়ার অটোমেশন করতে হবে। কর কাঠামোর বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে। আভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের দক্ষ জনবল বৃদ্ধি করতে হবে। শ্রমজীবী ও দরিদ্র মানুষের উপর পরোক্ষ করের বোঝা কমাতে হবে। বহুজাতিক কোম্পানির মুনাফা পাচার রোধ ও ঢালাও কর রেয়াতি সুবিধা পুনর্বিবেচনা করতে হবে। কর্পোরেট আয়কর হার বৃদ্ধি করতে হবে। অপরদিকে সাধারণ উদ্যোক্তাদের জন্য কর রেয়াতি সুবিধার সম্প্রসারণ করতে হবে। নারী, আদিবাসী সহ সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর জন্য কর রেয়াতি সুবিধা বৃদ্ধি করতে হবে।

খাতভিত্তিক দাবী

শিক্ষা

  • শিক্ষানীতির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নসহ জাতীয় বাজেটে ধাপে ধাপে আগামী চার বছরে বাজেটের ২০ শতাংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে এবং বৈষম্যমূলক শিক্ষাব্যবস্থা নিরুৎসাহিত করতে পদক্ষেপ নিতে হবে।
  • প্রশিক্ষিত শিক্ষক ও শিক্ষা মান নিশ্চিত করতে সম্মানজনক বেতন কাঠামো নির্ধারণ করতে হবে।
  • পাশাপাশি একীভূত শিক্ষা বাস্তবায়নে কাঠামোগত সংস্কার, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, আদিবাসী ভাষায় শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা, ব্রেইল পাঠ্যপুস্তক ও শিক্ষা সহায়ক উপকরণ বিতরণ কার্যক্রমের জন্য পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ রাখতে হবে। বাংলা ইশারা ভাষার প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ ও প্রসারের জন্য বিশেষ প্রকল্প চালু করতে হবে।

 

জনস্বাস্থ্য

  • জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্যখাতকে মৌলিক সেবাখাত হিসেবে অগ্রাধিকার দিতে হবে। অতিদুর্বল রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগের বৃত্ত থেকে বেরিয়ে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় আমুল সংস্কার আনতে হবে। আনুপাতিক হারে চিকিৎসক, নার্স, টেশনিসিয়ানের সংখ্যা বৃদ্ধি করতে হবে। এজন্য চিকিৎসা সংক্রান্ত প্রশিক্ষণ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিফট্ ও সংখ্যা বৃদ্ধি করতে হবে।
  • স্থানীয় জনচাহিদা অনুযায়ী স্বাস্থ্য বাজেট প্রণয়ন করতে হবে। স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর জন্য বৈষম্যমূলক বরাদ্দ রদ করতে হবে। ইউনিয়ন ও উপজেলা পরিবার কল্যাণ ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসক অনুপস্থিতি কমাতে যথাপোযুক্ত ব্যবস্থা ঘোষণা করতে হবে।
  • স্বাস্থখাতে ব্যক্তিগত ব্যয় ৬৩.৩% থেকে অন্তত: অর্ধেকে নামাতে না পারলে স্বাস্থ্যখাতের যেটুকু অর্জন হয়েছে তা ম্লান হয়ে যাবে। এজন্য আন্তর্জাতিক মানদন্ড অনুযায়ী আগামী পাঁচ থেকে সাত বছরে স্বাস্থ্যখাতে সরকারি বিনিয়োগ ৪.৫ শতাংশ থেকে বাজেটের ১৫ শতাংশে উন্নীত করতে এখনই ব্যবস্থা নিতে হবে।

 

খাদ্য ও কৃষি

  • সাধারণ জনগণের খাদ্য অধিকার নিশ্চিতকরণে খাদ্য অধিকার বিল সংসদে উত্থাপন করতে হবে। খাদ্যমূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ ও খাদ্যে ভেজাল প্রতিরোধে যথাক্রমে টিসিবি ও বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষকে ক্ষমতায়িত করতে হবে। দক্ষ জনবল বৃদ্ধি করতে হবে। খাদ্যমান ও পুষ্টি গবেষণায় রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ ও প্রণোদনা বৃদ্ধি করতে হবে।
  • সার, বীজ, সেচসহ কৃষি উপকরণে ভর্তূকী প্রদানের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় সহায়তা আরো বৃদ্ধি করতে হবে এবং এই ভর্তূকির সুবিধা যাতে সরাসরি নারী কৃষক সহ প্রকৃত ক্ষুদ্র কৃষক পায় তার জন্য বাস্তব সম্মত পদক্ষেপ নিতে হবে। সেজন্য অনতিবিলম্বে কৃষি ভর্তূকি মোট জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করতে হবে।
  • নারী কৃষি শ্রমিককের জন্য রাষ্ট্রীয় সেবা ও অর্থনৈতিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। কৃষক কার্ডে নারী কৃষকের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে ।
  • যে কোনো ধরণের দুর্যোগের ক্ষতির হাত থেকে রক্ষার জন্য ক্ষুদ্র কৃষকদের শস্য বীমার আওতায় আনতে হবে। উৎপাদিত কৃষি পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হবে এবং ক্ষুদ্র উৎপাদকের জন্য বিপণন প্রক্রিয়ায় সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। সরকার-উৎপাদক-ভোক্তা সমন্বয়ে মূল্য কমিশন গঠন করতে হবে। আলু সহ অন্যান্য খাদ্য সংরক্ষণে হিমাগারের সংখ্যা বাড়াতে হবে।
  • কৃষি আদালত স্থাপন করে কৃষকের জন্য আইনী সুবিধা নিশ্চিত করতে বাজেটে সুনির্দিষ্ট রূপরেখা ঘোষণা করতে হবে। কৃষিপণ্যের চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদন ব্যবস্থাপনা নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে।
  • ধান ক্রয়ের ক্ষেত্রে সরকার নির্ধারিত মিলারের কাছে কৃষকেরা ধান বিক্রি নিশ্চিত করতে হবে। সঠিক মূল্য নিশ্চিত করতে মাঠ পর্যায়ে সরকারের প্রতিনিধির উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে এবং ধানের দাম সরাসরি কৃষকের ব্যাংক একাউন্টে ট্রান্সফার করতে হবে।
  • ভূমি জরীপ আধূনিকীকরণ ও ডিজিটাইজেশন, ভূমি ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন ও ভূমি সংস্কারে সরকারকে অগ্রণী ভূমিকা নিতে হবে।
  • জাটকা মাছ নিধন রোধসহ সমুদ্রগামী মৎস্যজীবীদের দুর্যোগজনিত পুনর্বাসন কর্মসুচিতে বাজেটে বরাদ্দ বাড়াতে হবে। হাওড়-বাওড়, বিল অঞ্চলে পরিকল্পিত মৎসচাষে উৎসাহিত করতে মৎসজীবীদের প্রণোদনা ও সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
  • পোল্ট্রি শিল্প ও প্রাণীসম্পদ খাত উন্নয়নে উপযুক্ত গবেষণার পরিধি বৃদ্ধি করতে হবে। এখাতের বিকাশে রাষ্ট্রীয় প্রণোদনা বৃদ্ধি করতে হবে।

শ্রম, কর্মসংস্থান ও শিল্পায়ন

  • নতুন পে-স্কেলের সাথে সমন্বয় রেখে প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে শ্রমিকের জন্য জাতীয় ন্যূনতম মজুরীর বোর্ড গঠন ও বাস্তবায়নে এই বাজেটে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা থাকতে হবে। নারী পুরুষের মজুরী বৈষম্য নিরসনে শ্রম আইনের বিধিমালা চূড়ান্ত করা ও বাস্তবায়ন প্রয়োজন। সেইসাথে শিল্পশ্রমিক (বিশেষত গার্মেন্টস শ্রমিক)-দের জন্য পরিবহন ও আবাসন সুবিধা তৈরি করতে বিশেষ তহবিল গঠন করতে হবে। নির্মান ও পরিবহন শ্রমিকসহ মজদুরদের আবাসনের জন্য বাজেট বরাদ্দ দিতে হবে।
  • নিরাপদ অভিবাসন ও শোভন বৈদেশিক কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে বৈদেশিক কর্মসংস্থান বিষয়ক দীর্ঘমেয়াদী কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে। পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ অভিবাসন এবং পেশায় নিয়োজিত হওয়া রোধে উপকূল অঞ্চলে জাতীয় কর্মসৃজন প্রকল্পের গভীরতা ও আওতাবৃদ্ধিসহ স্থানীয় সরকার ও জনগণের অংশগ্রহণে শক্তিশালী পরিবীক্ষণ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। পাচারকৃতদের ফিরিয়ে এনে উপযুক্ত পূনর্বাসনের স্কীম হাতে নিতে হবে।
  • জাতীয় নিশ্চিত কর্মসংস্থান আইন প্রণয়ন করতে এখনই উদ্যোগ নিতে হবে। অতি দরিদ্র মানুষের জন্য গ্রুপ বীমার ব্যবস্থা চালু করতে হবে এর প্রিমিয়াম রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে পরিশোধ করতে হবে। গৃহশ্রমিকদের সুরক্ষায় কার্যকর নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে। বিত্তহীণদের বিশেষ করে হরিজন সম্প্রদায়ের জন্য সরকারি জমি বরাদ্দ ও বেতন বাড়াতে হবে।
  • জাতীয় প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধির জন্য শ্রমঘন শিল্পে সরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা দরকার। পাটকল, চিনিকলসহ বন্ধকৃত রাষ্ট্রীয় কলকারখানা সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার আওতায় অবিলম্বে চালু করা উচিত। এক্ষেত্রে মৌসুমের আগেই পাট, আখ ইত্যাদি ক্রয়ে অর্থছাড় করতে হবে। রাষ্ট্রীয় কারখানার দক্ষ জনবল, বিএমআরই ও নতুন প্রযুক্তির জন্য পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ করতে হবে। অবিলম্বে শ্রমিকরদের বকেয়া বেতন, ওভারটাইম ইত্যাদি পরিশোধ করতে হবে।
  • শিল্পনীতি এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট নীতিসমূহের মধ্যে প্রয়োজনীয় সমন্বয় করতে হবে। শিল্পনীতি বাস্তবায়নে রাষ্ট্রীয় ও ব্যক্তিখাতের বিনিয়োগ কিভাবে এবং কোন খাতে/ উপখাতে হবে তা সুস্পষ্ট করতে হবে। ভিন্ন ভিন্ন শিল্পখাত ভিত্তিক পৃথক এবং সমন্বিত পরিকল্পনা নিতে হবে। বন ও কৃষিজমি দখল ও অপরিকল্পিত শিল্পায়ন রোধ করতে আইন নির্ধারিত পরিকল্পিত শিল্প এলাকা নির্ধারণ করতে হবে।
  • ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের উন্নয়নে সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণ ও কারিগরি সহায়তা প্রদান করতে হবে। এজন্য এসএমই ফাইন্ডেশন, পিকেএসএফসহ সকল তফসিলি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য পারফর্মেন্স টার্গেট নির্ধারণ করতে হবে। কর্মসংস্থানবান্ধব এ শিল্পের উন্নয়নে কর অবকাশসুবিধা, রপ্তানি ভর্তুকি ও অবকাঠামোগত সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।
  • পোশাকশিল্প ছাড়াও চামড়াশিল্প, কৃষিভিত্তিক ফল, সব্জি ও অন্যান্য খাদ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্পের উন্নয়নে নীতি সহায়তা দিতে হবে। পাশাপাশি সোশ্যাল ও এনভায়রমেন্টাল কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করতে কারখানা, শ্রম ও ইমারতনির্মাণ পরিদর্শকসহ অন্যান্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের কঠোর পরিবীক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে।

নারী উন্নয়ন

  • বাজেটে নারীর জন্য বরাদ্দ বৃ্িদ্ধ করতে হবে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, মানবসম্পদ খাতে নারীদের অগ্রাধিকার দিয়ে ‘নারী উন্নয়ন নীতিমালা ২০১১’ -এর আলোকে সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি প্রণয়ন করতে হবে। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির ন্যুনতম ৫০ শতাংশ নারী উন্নয়নে বরাদ্দ রাখতে হবে।
  • শুধূমাত্র প্রতিবেদন দিলেই হবে না, বৃহত্তর নারী সমাজের অংশগ্রহণে প্রকৃত জেন্ডার বাজেট প্রণয়ন করতে হবে। জেন্ডার বাজেটে নারীর অমূল্যায়িত সেবামূলক কাজের অর্থনৈতিক ও সামাজিক গুরুত্বকে প্রাধান্য দিতে হবে।
  • নারী মুক্তিযোদ্ধাদের অর্থনৈতিকভাবে পূনর্বাসন করতে হবে।
  • নির্যাাতিতা নারী, প্রবীণদের পূনর্বাসনের জন্য বাজেট বরাদ্দ রাখতে হবে।
  • নারী নির্যাতন রোধে আইনী ও বিচারিক প্রক্রিয়া দ্রুততম করতে হবে। দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। পাশাপাশি নারীবান্ধব গণপরিবহন ব্যবস্থা, পাবলিক প্লেস, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সাংস্কৃতিক অঙ্গন, সরকারি-বেসরকারি কর্মস্থল নিশ্চিত করতে সকল অংশভাগিদের অংশগ্রহণে জাতীয় টাস্কফোর্স গঠন করতে হবে।
  • ঢাকা, চট্টগ্রামসহ প্রতি জেলায় কর্মজীবী নারীদের পর্যাপ্ত আবাসন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে প্রকল্প প্রণয়ন করতে হবে।

প্রতিবন্ধীর অধিকার ও সুরক্ষা

  • প্রতিবন্ধী মানুষের সংখ্যার অনুপাতে সুষম বাজেট বরাদ্দ করতে হবে।
  • প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন ২০১৩” এবং “নিউরো-ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধী সুরক্ষা ট্রাস্ট আইন ২০১৩” এর বিধি ও জাতীয় কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য বাজেটে অগ্রাধিকার দেয়া প্রয়োজন। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং কমিউনিটি ক্লিনিকসহ সকল স্তরে রেফারেল পদ্ধতি নিশ্চিতকরণে পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ করতে হবে ।
  • প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের আতœকর্মসংস্থান, প্রশিক্ষণ এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগের জন্য সহজ শর্তে ঋণ সুবিধার ব্যবস্থা করতে হবে।

আদিবাসী

  • আদিবাসী জন-জরিপের মাধ্যমে প্রকৃত সংখ্যা নিরূপন করতে হবে । সংখ্যানুপাতে আদিবাসীদের জন্য বাজেট বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে। জাতীয় বাজেটে পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তি এবং আদিবাসী সম্পর্কিত রাষ্ট্রীয় নীতি ও চুক্তি প্রতিফলিত হতে হবে ।
  • উচ্চ শিক্ষা ও কারিগরী শিক্ষায় বৃত্তিসহ আদিবাসী নারী ও তরুণদের আত্ম-কর্ম সংস্থানের জন্য বাজেট বরাদ্দ রাখতে হবে।
  • সমতলের আদিবাসীদের জন্য বৈষম্যহীণ বাজেট বরাদ্দ করতে হবে।

প্রান্তিক জনগোষ্ঠী

  • দলিত, হরিজন জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন ও তাদের সামাজিক নিরাপত্তা এবং মৌলিক চাহিদা পূরনে রাষ্ট্রীয় সেবা ও বাজেট বৃদ্ধি করতে হবে। রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজে নিয়োজিত হরিজন জনগোষ্ঠীর চাকুরী নিয়মিত করা প্রয়োজন। বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কর্মক্ষম দলিত ও হরিজন জনগোষ্ঠীর দক্ষতা বৃদ্ধি ও আয়বর্ধনমূলক কর্মকান্ডে সহায়তার জন্য বাজেটে সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি থাকা দরকার।
  • যৌনকর্মী, যৌনদাসী, হিজড়া, রুপান্তরকামীদের সমাজের মূল ¯্রােতধারায় নিয়ে আসতে কার্যকর ও বাস্তবসম্মত উন্নয়ন উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে এবং উন্নয়ন পরিকল্পনা অনুযায়ী বাজেট বরাদ্দের সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা থাকতে হবে।

যুব উন্নয়ন

  • যুব ও ক্রিড়া বাজেট পৃথকভাবে বিভক্ত করে উপস্থাপন করতে হবে।
  • বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাক্রমে কারিগরি শিক্ষাকে অন্তর্ভূক্ত করতে হবে। কারিগরি শিক্ষা শিক্ষকদের প্রশিক্ষন প্রতিষ্ঠান থাকতে হবে। কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়ন্ত্রনের জন্য কারিগরি শিক্ষা কমিশন সৃষ্টি করতে হবে। শিক্ষা খাতে বরাদ্দের ৩০ শতাংশ কারিগরি শিক্ষায় বরাদ্দ করতে হবে। বর্তমান কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন করতে হবে এবং গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত উপকরণ বরাদ্দ করতে হবে।
  • জেলাভিত্তিক কৃষি ও মৎস্য কারিগরি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতে হবে। কারিগরি শিক্ষায় পর্যটন শিল্পভিত্তিক প্রশিক্ষন নিশ্চিত করতে হবে।

পরিবেশ, নগরায়ন, যোগাযোগ ও ভৌত অবকাঠামো

  • জলবায়ু পরিবর্তন জনিত অভিঘাত মোকাবেলায় দেশের পরিবেশগত অঞ্চল বিশেষত: উপকূলীয় অঞ্চল, সুন্দরবনসহ অন্যান্য বনাঞ্চল, নদী,খাল হাওড় ও অন্যান্য জলাভূমি, বরেন্দ্র অঞ্চল, পার্বত্য অঞ্চল সংরক্ষণ উন্নয়নে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে এবং গুরুত্ব অনুযায়ী বাজেটে বরাদ্দ করতে হবে। জলবায়ু ট্রাস্ট ফান্ড ব্যবহারে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।
  • যানজট ও পরিবেশ সংরক্ষণে রাজধানীসহ প্রধান প্রধান শহরে ব্যাপক আকারে গণপরিবহনের সংখ্যা বৃদ্ধি করতে হবে। পাশাপাশি গণপরিবহন হিসেবে মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদে রেল নেটওয়ার্কের উপর জোর দিতে হবে।
  • পরিবেশ দূষণ কমাতে রাজধানীসহ প্রধান প্রধান শহরে নগর বনায়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হবে।
  • রাজধানী, চট্টগ্রামসহ অন্যান্য শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনে ড্রেনেজ ব্যবস্থার সংস্কার করতে হবে। পাইপলাইনে সরবরাহকৃত পানির নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ ও বিশুদ্ধতা নিশ্চিত করতে হবে। সুয়ারেজ লাইনের সংস্কার করতে হবে।
  • বিদ্যূৎ উৎপাদনে ক্রমান্বয়ে আমদানি নির্ভর, ব্যয়বহুল ও পুরনো প্রযুক্তির (কয়লা বা জীবাশ্ম জ্বালানী ভিত্তিক) পরিবর্তে পুনঃব্যবহারযোগ্য জ্বালানীখাতে সরকারি বিনিয়োগ ও ভর্তুকি বৃদ্ধি করতে হবে।
  • স্বল্প ও মধ্যবিত্তের আবাসন ও পরিকল্পিত নগরায়নে নগর উন্নয়ন অধিদপ্তর, বিভিন্ন নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ/ রাজউক সহ স্থানীয় নগর সরকারকে শক্তিশালী করতে হবে। স্বল্প ও মধ্যবিত্তের আবাসনখাতে স্বল্পসুদে ব্যাংক ঋণ প্রদানে তফশিলি ব্যাংকগুলোকে একটি নীতি কাঠামোর আওতায় আনতে হবে। রাজধানীসহ অন্যান্য নগরের বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে। আবাসনখাতের বিশৃংখলা নিয়ন্ত্রণে রাষ্ট্রীয় পরিবীক্ষণ বৃদ্ধি করতে হবে। ভূমি জোনিং পরিকল্পানা বাস্তাবায়ন করতে হবে।
  • নগর দরিদ্র পূনর্বাসন বিশেষ করে হকার, রিক্সাচালক, পরিচ্ছন্নতা কর্মী, অন্যান্য স্বল্প আয়ের মানুষের জীবন মান উন্নয়ন ও আবাসন নিশ্চিত করতে হবে।