জাতীয় বাজেট ও স্বাস্থ্যখাত ২০১৬

 

জনগণের মৌলিক চাহিদার পাশাপাশি মানব সম্পদ উন্নয়নের সূচক হিসেবে স্বাস্থ্যখাত খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে। এই কারণে সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার পর টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার ৩য় গোলটিতে সকল বয়সের মানুষের জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।[1] স্বাস্থ্যখাতের টেকসই মানোন্নয়নের জন্য সরকারের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি নীতি হচ্ছে ২০৩০ সালের মধ্যে সকল প্রকার সংক্রামক রোগ দুর করা, গড় আয়ুস্কাল ৭০ বছরে উন্নীত করা এবং প্রতি হাজারে শিশু মৃত্যুর হার ১৫ শতাংশে নামিয়ে আনা। সপ্তম পঞ্চ বার্ষিকী পরিকল্পনাতেও সবার জন্য স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টি উঠে এসেছে[2]। শহর এলাকার সাথে সাথে গ্রাম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এর পাশাপাশি ১২,৮১৫ টি কমিউনিটি ক্লিনিক চালু করা হয়েছে।[3] তবে জাতীয় বাজেটের অপ্রতুলতা, অব্যবস্থাপনা ও আধুনিক যন্ত্রপাতির সংকটের কারণে সরকারের এ পদক্ষেপ মুখ থুবরে পড়েছে।

জাতীয় বাজেটে অবহেলিত স্বাস্থ্যখাত

স্বল্প বাজেট নিয়ে স্বাস্থ্যখাতে বাংলাদেশের অবদান তৃতীয় বিশ্বের দেশ গুলোর জন্য  উৎসাহব্যাঞ্জক। তবে সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পর টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্যে স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দকৃত বাজেটের পরিমাণ বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ টাকার অঙ্কে বাড়লেও মোট বাজেট ও জিডিপি’র অনুপাতে সেই পরিমাণ নিতান্তই হতাসাব্যঞ্জক।

লেখচিত্র ১: স্বাস্থ্যখাতে ব্যয় ( মোট বাজেট ও জিডিপি’র শতকরা হার )

তথ্যসূত্রঃ বাজেটের সংক্ষিপ্তসার (বিভিন্ন বছর), অর্থ মন্ত্রণালয়

বিগত কয়েক বছর ধরেই বাজেটের আকারের বিপরিতে স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দের পরিমাণ ক্রমশ কমে আসছে (লেখচিত্র ১)। ২০০৯-১০ অর্থবছরের তুলনায় ২০১৫-১৬ অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় মোট বাজেটের ৬.১ শতাংশ কম এবং জিডিপি’র ৪.৩ শতাংশ কম। জিডিপি থেকে বরাদ্দকৃত অংশের উপর নির্ভর করে বিবেচনা করা হয় সরকার খাতটিকে কতখানি গুরুত্ব দিচ্ছে। অথচ প্রায় ১ যুগ ধরে দেশের গুরুত্তপূর্ণ এই স্বাস্থ্যখাতের বরাদ্দ মোট জিডিপি’র ১ শতাংশের ও কম। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, একটি মানসম্মত স্বাস্থ্য ব্যবস্থা চালাতে হলে স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ জিডিপি’র ৫ শতাংশ হওয়া উচিত।

সরকারের থেকে ব্যক্তি পর্যায়ে অধিক চিকিৎসা ব্যয়

স্বাস্থ্যখাতের সামগ্রিক ব্যয়ের মধ্যে ২৩.০৯ শতাংশ পূরণ হয় বাজেটের মাধ্যমে আর বাকি দুই- তৃতীয়াংশ পূরণ হয় জনগনের নিজের পকেট থেকে (লেখচিত্র ২)।[4] বিশ্বের অন্যান্য দেশে এর চিত্র সম্পূর্ণ বিপরিত। প্রতিবেশী দেশ ভারতে স্বাস্থ্যখাতে সরকারি ব্যয় ৩৩ শতাংশ, নেপালে ৪০ শতাংশ এবং শ্রীলঙ্কায় ৪৫ শতাংশ। কিন্তু বাংলাদেশে ৬৮ শতাংশ চিকিৎসা ব্যয় সেবা প্রত্যাশী নিজেরাই বহন করে। অতএব সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের লক্ষ্যে স্বাস্থ্যখাতে জনগনের ব্যয় কমিয়ে সকারের ব্যয় বাড়ানো জরুরি।

লেখচিত্র ২:  মোট চিকিৎসা ব্যয়ের বিভিন্ন অংশ

উৎসঃ হেলথ ইকোনমিক্স ইউনিট, বাংলাদেশ জাতীয় স্বাস্থ্য হিসাব ২০০৭-১২

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একটি হিসাবে বলা হয়েছে দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১০ শতাংশ প্রতিবন্ধী।[5] সেই হিসাবে আমাদের দেশে প্রতিবন্ধী মানুসের সংখ্যা প্রায় দেড় কোটি। উন্নত স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করতে সরকারের উচিত তাদের প্রত্যেকের সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা। জাতীয় স্বাস্থ্য হিসাব ২০০৭-১২ অনুযায়ী, বাংলাদেশে বাৎসরিক মাথাপিছু চিকিৎসা ব্যয় ২৭ মার্কিন ডলার যেখানে ২০০৭ সালে এই হার ছিল ১৬ মার্কিন ডলার এবং ১৯৯৭ সালে ছিল মাত্র ৯ মার্কিন ডলার। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে স্বাস্থ্য সেবার মানোন্নয়নের জন্য এই খাতে ব্যয় ৪০ মার্কিন ডলার হওয়া আবশ্যক। অথচ সর্বশেষ হিসাব বলছে স্বাস্থ্যখাতে ন্যূনতম ব্যয়ের চেয়েও বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে আছে।

চিকিৎসা ব্যয়ে সরকারি বরাদ্দের অসমতা

স্বাস্থ্যখাতে সরকারি বরাদ্দে দরিদ্র জেলা সমূহ এখনো পিছিয়ে আছে। যেসব জেলায় ধনী মানুষের বসতি বেশি সেসব জেলায় সরকারি ব্যয়ও বেশি। মোট স্বাস্থ্য বাজেটের ৪১ শতাংশ ব্যয় হয় ঢাকা জেলায় এবং চট্টগ্রাম জেলায় ব্যয় ১৮ শতাংশ।[6] সবচেয়ে কম ব্যয় হয় সিলেট ও বরিশাল বিভাগে মাত্র ৪ ও ৫ শতাংশ যথাক্রমে (লেখচিত্র ৩)। এটি একদিকে যেমন দুর্বল সরকারি ব্যবস্থাপনাকে নির্দেশ করে অন্যদিকে স্বাস্থ্যখাতে দুর্নীতির চিত্রকেও তুলে ধরে। এরই মধ্যে স্বাস্থ্যব্যয়ের একটি বড় অংশ চলে যায় ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম কিনতে এবং ২০১২ সালে এই খাতে ব্যয় ছিল মোট ব্যয়ের ৪১ শতাংশ। এরপর বেশি ব্যয় হয় হাসপাতালে (৩০ শতাংশ) এবং হাসপাতালের বহির্বিভাগ ও পরিবার পরিকল্পনা সেবায় (১৫ শতাংশ)।

লেখচিত্র ৩: অঞ্চল ভিত্তিক স্বাস্থ্যখাতে ব্যয় (মোট ব্যয়ের শতকরা হার)

উৎসঃ স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়

অঞ্চল্ ভিত্তিক অসম বরাদ্দের পাশাপাশি স্বাস্থ্যখাতে উন্ননয়ন ও অনুন্নয়নমূলক ব্যয়ের মধ্যেও বিস্তর পার্থক্য দেখা যায়। সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য স্বাস্থ্য সেবায় বেশকিছু সূচক যেমন শিশু মৃত্যুর হার হ্রাস, শিশু ও মায়েদের টিকা প্রদান, ভিতামিন এ এর ঘাটতি দূরীকরণ ইত্যাদি নানাবিধ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ইতিবাচক সাফল্য অর্জন করলেও স্বল্প পরিমাণের বাজেটের কারণে স্বাস্থ্যের গুনগত মানোন্নয়নের জন্য সরকারি নীতি এবং পদক্ষেপ গুলো প্রশ্নের সম্মুখীন হয়ে পড়েছে।

লেখচিত্র ৪: স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দকৃত বাজেটের গতিপ্রকৃতি (কোটি টাকা)

তথ্যসূত্রঃ বাজেটের সংক্ষিপ্তসার ( বিভিন্ন বছর ), অর্থ মন্ত্রণালয়

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের দুরাবস্থা

বাংলাদেশের সরকারি স্বাস্থ্য খাতে একদিকে যেমন দক্ষ জনবলের সংকট রয়েছে অন্যদিকে রয়েছে অপর্যাপ্ত ব্যবস্থাপনা। স্বাস্থ্যখাতে ব্যয় বৈষম্যের পাশাপাশি নতুন প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও অবকাঠামোগত উন্নয়নের উপরই বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়। ফলে জাতীয় বাজেটের একটা বড় অংশ অব্যবস্থাপনার মধ্যে পড়ে যাচ্ছে সুধুমাত্র অপর্যাপ্ত লোকবল ও অর্থ সংকটের কারণে। প্রাথমিক সেবার মান নিশ্চিত করতে ১২,৮১৫ টি কমিউনিটি ক্লিনিকের মধ্যে রয়েছে দক্ষ চিকিৎসক ও যন্ত্রপাতির সংকট। সরকারি হাসপাতাল গুলোতেও সাত থেকে আট হাজার চিকিৎসকের পদ খালি রয়েছে। কোনো কোনো হাসপাতালে চিকিৎসকের অভাবে ফার্মাসিস্টরাই রোগী দেখেন।[7] রাঙ্গামাটি জেলায় ১৭৫ টি অনুমোদিত চিকিৎসক পদ খালি থাকলে ও মাত্র ৬১ টি পদে চিকিৎসক রয়েছে।

লেখচিত্র ৫: দক্ষ চিকিৎসক প্রতি ১০,০০০ জনে

দেশ দক্ষ চিকিৎসক
বাংলাদেশ ৬.০২
পাকিস্তান ১৪.৬
শ্রীলংকা ২৩.৭
ভারত ২৫.৫
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা’র মতে প্রয়োজন ২৩

উৎসঃ WHO Global Health Workforce Statistics, 2014

সরকার একদিকে যেমন সরকারি হাসপাতালের দক্ষতা বাড়াতে পারছে না, অন্যদিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা বাবদ ব্যয়। সরকারি হাসপাতালে আলত্রাসনগ্রাফি অব অ্যাবডোমেন করতে খরচ পড়ে ৪৫০ টাকা আর বেসরকারি হাসপাতাল বা ডায়গনসটিক সেন্টারে নেয় ১২০০ থেকে ১৬০০ টাকা। রক্তের সিবিসি পরীক্ষা করতে যেখানে সরকারি হাসপাতালে নেয় ৫০ টাকা সেখানে বেসরকারিতে নেয় ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা।[8] স্বাস্থ্যখাতের মতো এমন একটা গুরুত্বপূর্ণ খাতের এরকম বেহাল দশা দেখলে দেশের জনগণ উদ্বিগ্ন না হয়ে পারে না।

বাংলাদেশে স্বাস্থ্যখাতে বাজেট প্রণয়ন প্রক্রিয়া সম্পূর্ণভাবে কেন্দ্রীভূত। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রণীত বিধিমালা অনুসারে উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ও তার নিচের প্রতিষ্ঠানসমূহে স্বাস্থ্য বাজেট নির্ধারিত হয়। এখানে জেলার সিভিল সার্জন কার্যালয়ের কোন ভূমিকা নেই। সুযোগ নেই স্থানীয় চাহিদার আলোকে নতুন কোন খাত অন্তর্ভুক্তির বা কোন খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির।

 

সুপারিশ

১. বাংলাদেশে স্বাস্থ্যখাতে বাজেট প্রণয়ণে কেন্দ্রীভূত প্রক্রিয়া থেকে সরে আসতে হবে। জেলা পর্যায়ের সমন্বয় ও স্থানীয় চাহিদার আলোকে বাজেট প্রণয়ন প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে।

২. স্বাস্থ্যখাতে সকল শূন্যপদ অনতিবিলম্বে পূরণ করতে হবে। প্রত্যন্ত ও পার্বত্য অঞ্চলে স্বাস্থ্য সেবার দিকে সরকারের নজর দিতে হবে।

৩. স্বাস্থ্যখাতের সকল প্রকার অপচয়, অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতি দুর করতে হবে। সেই সাথে স্বাস্থ্য বাজেটে বরাদ্দকৃত অর্থের অসমতা দুর করতে হবে।

৪. ব্যাক্তি পর্যায় ও সরকারি পর্যায়ে চিকিৎসা ব্যয়ের অসমতা দুর করতে হবে।

৫. টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ও প্রেক্ষিত পরিকল্পনার আলোকে এবং সকলের জন্য মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকারকে বাস্তবসম্মত পথ নির্দেশিকা ঘোষণা করতে হবে এবং সম্ভব হলে সকলের জন্য সরকারি ভাবে স্বাস্থ্য বীমার ব্যবস্থা চালু করতে হবে।

লেখক

জিসান আরা মিতু

 

[1] Working Group Proposal on Sustainable Development Goals

[2] Seventh Five Year FY 2016 – 2020

[3] Bangladesh Economic Review 2015

[4] www.heu.gov.bd/phocadownload/bnha%201997-2007.pdf (Accessed on 15-04-2016)

[5] www.jjdin.com/print_news.php?path=data_files/334 (Accessed on 17-04-2016)

[6] www.jugantor.com/old/last-page/2014/04/07/85715(Accessed on 17-04-2016)

[7] https://www.facebook.com/cafedoctors/posts (Accessed on 18-04-2016)

[8] https://www.facebook.com/permalink.php? (Accessed on 18-04-2016)