তৃণমূল বাজেট শিক্ষা সহায়িকা জাতীয় বাজেটের বিকেন্দ্রীকরণ, জনঅংশগ্রহণ ও জেলা বাজেট ২০১২

বাজেট কি?
বাজেট হলো আগামী দিনের বা বছরের বা কোন অনুষ্ঠানের সম্ভাব্য আয়-ব্যয়ের হিসাব। বাজেট সাধারণত কোন পরিবার, সামাজিক ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান বা দেশের জন্য করা হয়ে থাকে। পরিবারের মোট উপার্জন অনুযায়ী খরচ মিটানোর জন্য পরিবারের প্রধান ব্যক্তি যেমন একটা বাজেট তৈরি করে থাকেন, তেমনি একটি দেশের উন্নয়ন ও পরিচালনার জন্য সরকার একটি বাজেট তৈরী করে থাকেন। পার্থক্য হলো যে, পরিবারের ক্ষেত্রে আয় বুঝে খরচের একটা বাজেট করা হয় আর রাষ্ট্র ব্যয় অনুযায়ী আয়ের খাত সনাক্ত করে।

বাজেট দারিদ্র্য কমানোর এক শক্তিশালী হাতিয়ার। কারণ সরকারি আয়-ব্যয়ের সঙ্গে দরিদ্র মানুষের/জনগণের আয়-উপার্জন ও জীবন -জীবিকার নানা দিক নানাভাবে জড়িত। তবে তা নির্ভর করে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, সুশাসন এবং প্রয়োগ-কৌশল ও বাস্তবায়ন দক্ষতার উপর।

একটি দেশের বাজেট দরিদ্র মানুষের জীবনে কতটা প্রভাব ফেলে তা দেখতে হলে নীচের প্রশ্নগুলির উত্তর কতটা আমাদের পক্ষে আসে তার উপর নির্ভব করে:
 উন্নয়ন প্রকল্প কর্মসূচি কি দরিদ্র মানুষের দারিদ্র থেকে মুক্ত করবে?
 সকল পেশা,শ্রেনীর মানুষের এবং বঞ্চিত জনগোষ্ঠির জন্য কি কর্মসূিচ নেয়া হয়েছে?
 বাজেট কি ধনী-গরীবের এবং আঞ্চলিক বৈষম্য কমাবে?
 প্রত্যক্ষ করকে প্রাধ্যান্য দেয়া হয়েছে কিনা?
 শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থানের মাধ্যমে সাধারণ জনগণের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন হবে কিনা?

বাজেট কত প্রকার?
বাংলাদেশের বাজেট দুই ধরনের:

  • রাজস্ব বাজেট: যে বাজেটে সরকারের রাজস্ব আয় (কর ও করের বাইরের আয়) এবং রাজস্ব ব্যয়ের (সরকার পরিচালনার খরচ) হিসাব থাকে তাকে রাজস্ব বাজেট বলা হয়। এক অনুন্নয়ন বাজেটও বলে। যেমন: সরকারি কর্মচারীর বেতন, পেনশন, অবসরভাতা ইত্যাদি।
  • উন্নয়ন বাজেট: দেশের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করার জন্য যে বাজেট তৈরী করা হয় তাকে উন্নয়ন বাজেট বলে। উন্নয়ন বাজেটে কৃষি, শিল্প, শিক্ষা, সড়ক, ব্রিজ-কালভার্ট, পরিবহন ও যোগাযোগ, বিদ্যুৎ খাতের উন্নয়ন ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত থাকে।

বাজেটের টাকা কোথা থেকে আসে?
বাজেটের অর্থ সংগ্রহ করা হয় রাষ্ট্রের নাগরিকের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ কর, আয়কর, ভ্যাট এবং দাতা দেশ, আন্তর্জাতিক সংস্থা, দেশি-বিদেশি ব্যাংক ঋণের মাধ্যমে। এছাড়াও জমা-জমি, হাট-বাজারের খাজনা, ঘর-বাড়ির উপর ট্যাক্স, ইত্যাদি উৎস থেকে সরকারের বাজেটের টাকা আসে। এ সবই জনগণের অর্থ।

আমরা নাগরিকরা কেন কর দিই?
দেশের আয়ের সাধরণ উৎস হলো প্রত্যক্ষ কর, যেমন: ব্যক্তির আয়ের ওপর ট্যকা¦স (আয়কর), ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের আয়ের উপর কর (কর্পোরেট আয়কর), দান কর, উত্তরাধিকার কর, ঘরবাড়ি-জমিজমা থাকলে তার উপর কর ইত্যাদি। এই করের চূড়ান্ত পরিশোধের দায়িত্ব একজন নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের । অন্যদিকে আমদানি-রপ্তানি শুল্ক, আবগারি শুলক্ব (মাদক জাতীয় দ্রব্যের ওপর কর), ভ্যাট বা মূূল্য সংযোজন কর বা বিক্রয় কর, প্রমোদ কর ইত্যাদি হচ্ছে পরোক্ষ কর, এই অর্থে যে এই করের পরিশোধের দায়িত্ব সরাসরি না হলেও পরোক্ষভাবে একজন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের। যেমন: কোন পণ্য – সাবান ইত্যাদি কেনার সময় আমরা ভ্যাট দিই, কিন্তু এটা ঐ সাবান কোম্পানির দেয়ার কথা। কিন্তু পরোক্ষ কর বা ভ্যাটের কারণে কোম্পানির এ বোঝা সাধারণ ক্রেতাকে বহন করতে হচ্ছে। আশ্চর্য কথা হলো, আমাদের দেশে শতকরা ৮০ ভাগ করই আসে পরোক্ষ করের মাধ্যমে গরীব মানুষের কাছ থেকে।

সরকার কেন কর নেয়?
সরকারের প্রশাসনিক খরচ যেমন-সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারিদের বেতন, রাস্তা-ঘাট, স্কুল কলেজ, হাসপাতাল ইত্যাদি প্রতিষ্ঠান চালানোর খরচ , জনগণকে নানা রকম সেবা দেয়া এবং সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার জন্য যে খরচ হয় সেটা মেটানোর জন্য সরকার কর নেয়।

ভ্যাট কি? আমরা কেন ভ্যাট দিই?
সরকার তার আয় বাড়ানোর জন্য খাদ্যদ্রব্য বা পণ্যের বিক্রয় মূল্যের উপর বিক্রয় কর আরোপ করে থাকেন। আগে এটাকে টার্নওভার ট্যাক্স বলা হতো, যেখানে পণ্যের উৎপাদন থেকে বিক্রয় পর্যন্ত মাত্র একবারই বিক্রয় কর পরিশোধ করতে হতো। কিন্তু ১৯৯১ সালে বিশ্বব্যাংকের পরামর্শে তৎকালীন সরকার এ পদ্ধতির পরিবর্তন করে পণ্যের উৎপাদন থেকে বিক্রয় পর্যন্ত যতগুলো হাত বদল হয়ে ক্রেতার কাছে পৌঁছায় তার প্রতিটি স্তরে বিক্রয় কর ধার্য করে নতুন বিক্রয়কর পদ্ধতির প্রচলন করেন। একে ভ্যাট (ঠঅঞ) বা ভ্যালু এ্যাডেড ট্যাক্স অর্থাৎ হলো মূল্য সংযোজন কর বলা হয়। ভ্যাট প্রচলন করার ফলে জিনিসপত্রের বিক্রয় মূল্য বেড়ে যায়, সরকারের রাজস্ব আয় বৃদ্ধি পায় কিন্তু গরীব ও নি¤œবিত্ত মানুষ সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

আমরা কেন বাজেট নিয়ে কথা বলবো?
আমরা বাজেট নিয়ে কথা বলবো কেননা-

  • আমরা রাষ্ট্রের নাগরিক, আমরা কর প্রদান করি এবং সেই করের টাকা দিয়ে সরকার চলে।
  • সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণ করার সাংবিধানিক অধিকার আছে এবং নাগরিকরাই রাষ্ট্রের ‘মালিক’।
  • যেহেতু রাষ্ট্রের মালিক জনগণ, তাই সাধারণ মানুষ যত বেশি আগ্রহ নিয়ে বাজেট বোঝার চেষ্টা করবে এবং তাদের মতামত প্রকাশ করবে, বাজেটে ততই তাদের ইচ্ছা-অনিচ্ছার প্রতিফলন ঘটার সুযোগ থাকবে। একইসাথে রাষ্ট্রীয় বাজেট জনগণের বাজেটে পরিনত হবে।

বাংলাদেশের জাতীয় বাজেট কি প্রক্রিয়ায় হয়?
বাজেট প্রণয়ণ প্রক্রিয়া একটি আমলাতান্ত্রিক ও অত্যন্ত কেন্দ্রীভূত প্রক্রিয়া অর্থাৎ ঢাকায় বসে কিছু সরকারী কর্মকর্তা এবং কয়েকটি প্রভাবশালী মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীরা দেশের বাজেট তৈরী করে। পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তাগণ বিভিন্ন মন্ত্রণালয় থেকে সম্ভাব্য ব্যয়ের তালিকা সংগ্রহ করেন। এরপর তারা একনেকের অনুমোদনের জন্য প্রকল্প তৈরী করেন এবং প্রকল্প অনুযায়ী বাজেট বরাদ্দের তালিকাও তৈরী করেন। এই প্রক্রিয়া সরকারি ব্যয়ের বিস্তারিত যাচাই-বাছাইয়ের ক্ষেত্রে আর্থিক বিলের জন্য শুধুমাত্র অর্থ মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত স্ট্যান্ডিং কমিটি ছাড়া সংসদের অন্যান্য স্ট্যান্ডিং কমিটিসমূহ এ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করতে পারে না। সাধারণত জুন মাসের প্রথম সপ্তাহে সংসদে বাজেট পেশ করা হয় এবং শেষ সপ্তাহে তা পাশ করা হয়। কার্যকর হয় ১ জুলাই থেকে। মাননীয় সংসদসদস্যদের ‘হ্যাঁ’ ভোটের মাধ্যমে বাজেট পাশ হয়। বাজেট প্রণয়নের ক্ষেত্রে কিছু আইন আছে। যেমন:
ক্স বাজেট প্রণয়ন প্রক্রিয়া মূলত: সরকারি কর্মকর্তা ও গুটি কয়েক মন্ত্রীদের কাজ ।
ক্স বাজেটে নতুন কোন ব্যয় অনুমোদনে সংসদসদস্যদের কোন ক্ষমতা নেই [অনুচ্ছেদ ৮৯(২) ও ৯০(২)]
ক্স সংসদে সরকারি দলের সদস্যগণ প্রস্তাবিত বাজেটের বিপক্ষে ভোট দিতে পারেন না (অনুচ্ছেদ ৭০)।

বাজেট কে তৈরী করে?
জাতীয় বাজেট নিম্নলিখিত প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন হয়ে থাকে। প্রক্রিয়ায় সরকারের বা রাষ্ট্রের নিম্নলিখিত বিভাগ জড়িত থাকে।

তাহলে বাজেট কি প্রক্রিয়ায় হওয়া উচিত?
 গ্রামের উন্নয়ন চাহিদা ও অগ্রাধিকার স্থানীয় জনগণের মাধ্যমে নির্ধারণ করার জন্য ইউনিয়ন পরিষদের ওয়ার্ড থেকে পরিকল্পনা ও বাজেট তৈরি করা উচিত, যা ঐ জেলার সমস্ত উপজেলা ও পৌরসভার বাজেট চাহিদা যোগ করে জেলা পর্যায়ে সমন্বয় হবে। কেন্দ্রীয় সরকার এক্ষেত্রে জেলা পরিষদের মারফত বাজেটের অর্থ যোগান দিতে পারে।
 পাশাপাশি জাতীয় বাজেট ও আঞ্চলিক বাজেটের খাতসমূহ আলাদা করতে হবে। বাজেটকে আঞ্চলিক পর্যায়ে ভাগ করে দেয়ার (বিকেন্দ্রীকরণ) জন্য সম্ভাব্য খাতসমূহ নির্দিষ্ট করে চাহিদা অনুযায়ী সম্পদ ও আয়ের পথ তৈরী করতে হবে। এ খাতগুলো হতে পারে- শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নারী, শিশু, কৃষি সম্প্রসারণ, শিল্প, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি।
 যে এলাকাগুলো উন্নত নয় সে এলাকার প্রতি বিশেষ বরাদ্দ দিয়ে আঞ্চলিক বৈষম্য দূর করার পাশাপাশি বাজেট দলিলকে সাধারণ মানুষ যাতে বুঝতে পারে সেরকম করে উপস্থাপন করতে হবে।

বাজেট গণতান্ত্রিক করতে হলে কি করতে হবে?

  • জাতীয় বাজেট প্রণয়নে জনগণের সরাসরি অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।
  • জেলা ভিত্তিক বাজেট এবং পর্যায়ক্রমে আইন নির্ধারিত অন্যান্য স্থানীয় সরকার পর্যায়ে বাজেট প্রণয়ন করা।
  • জাতীয় বাজেট ও আঞ্চলিক বাজেটের খাত/বিভাগসমূহ আলাদা করা। আঞ্চলিক পর্যায়ে বিকেন্দ্রীকরণের জন্য সম্ভাব্য খাতসমূহ নির্দিষ্ট করা, যেমন- শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নারী, শিশু, কৃষি সম্প্রসারণ, শিল্প, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি।
  • জাতীয় বাজেট ও আঞ্চলিক বাজেটের একে অপরের সহায়তাকারী খাতগুলো চিহ্নিত করা।
  • আঞ্চলিক অবস্থা ও চাহিদার ভিত্তিতে সম্পদ ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা।
  • কর ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে জেলা/ উপজেলা/ ইউনিয়ন পর্যায়ে বাজেট বরাদ্দ করা।
  • সুষম জাতীয় উন্নয়ন নিশ্চিত করার জন্য যেসব এলাকা বেশি দরিদ্র সেসবএলাকাকে অগ্রাধিকার দেয়া।
  • আঞ্চলিক ও জাতিগত বৈষম্য বিবেচনা করা।
  • আঞ্চলিক বাজেটের জন্য শুধু লজিস্টিকস্ নয়, সেবার মান উন্নত করার জন্য কর্মসূচী নেয়া। ব্যবস্থাপনা ও কার্যকরী জনবলকে অন্যতম বিবেচনা হিসেবে নেয়া।
  • বাজেটে অধিকারভোগী বা উপকারভোগীর মতামতের প্রতিফলন করা।
  • বাজেট প্রক্রিয়ায় জনগণকে স¤পৃক্ত করার জন্য কার্যকরী ইলেক্ট্রনিক সরকার ব্যবস্থা (ই-গভার্নেন্স) চালু করা।

প্রকাশনা: গণতান্ত্রিক বাজেট আন্দোলন প্রকাশনা কমিটির পক্ষে সার্বিক তত্ত্বাবধানে এসপিইডি। প্রকাশনা: রচনা: ফজলুল হক। সম্পাদনা: অলংকরণ: । প্রথম প্রকাশ: জুলাই ২০১২। মূদ্রণ: