বাজেট প্রতিক্রিয়া ২০১২-১৩ ; জাতীয় বাজেট বিকেন্দ্রীকরণের প্রতিশ্রুতি ও প্রতিফলন ২০১২

জাতীয় বাজেট বা জনবাজেট স্বাধীন বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষের আশা আকাক্সক্ষার প্রতিচ্ছবি- এটা কোন শুধু ভিশন বা স্বপ্ন নয়, বরং দেশের সকল নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকারের বিষয়। প্রত্যেক বছরের মতো এবারো ২০১২-১৩ সালের বাজেট পেশ করা হয়েছে জাতীয় সংসদে। আর প্রত্যেক বছরের মতো এবারেও বাজেট প্রনয়ণ প্রক্রিয়ায় গতানুগতিকতার ব্যতিক্রম ঘটেনি। আরো মজার বিষয় হলো প্রত্যেকবারের মতো এবারেও বেশকিছু সংগঠন তাদের নিজস্ব পর্যালোচনা নিয়ে গণমাধ্যমের সামনে হাজির হয়েছে। গতানুগতিকতার গন্ডির ভেতর থেকেই কোন খাতে বরাদ্দ বাড়লো আর কোন খাতে কমলো কিংবা কোন জিনিসের দাম বাড়লো বা কমলো এইসব আলোচনার মাধ্যমে তারা তাদের পর্যালোচনা তুলে ধরছেন। কিন্তু এই গতানুগতিক বাজেট এর প্রনয়ণ প্রক্রিয়ার বিষয়টি এখানে একেবারেই অনুপস্থিত। একইসাথে জনঅংশগ্রহন শূন্য এবং অগণতান্ত্রিক এই বাজেটকে কীভাবে জনমুখী এবং জনঅংশগ্রহনমূলক করা যায় এ প্রস্তাবনাও এসব আলোচনায় অনুপস্থিত। জাতীয় বাজেটের সুফল কেন জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছায় না সে বিষয়ে আমরা আমাদের পর্যালোচনা এ আলোচনায় আনার চেষ্টা করেছি।

এবারের বাজেট
গত ৭ জুন ২০১২-১৩ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট চুড়ান্ত অনুমোদনের জন্য জাতীয় সংসদে উত্থাপন করা হয়েছে। ১,৯১,৭৩৮ কোটি টাকার এই বাজেটে সামগ্রিক ঘাটতির পরিমান (বৈদেশিক অনুদান বাদে) ৫২,০৬৮ কোটি টাকা যা জিডিপি’র প্রায় শতকরা ৫ ভাগ। বাজেটের এই ঘাটতি মেটানো হবে অভ্যন্তরীণ ঋণ ও বৈদেশিক ঋণ-অনুদান থেকে। দেশীয় ব্যাংকিং ও অন্যান্য খাত (নীট) থেকে নেয়া হবে ৩৩,৪৮৪ কোটি টাকা আর প্রত্যাশিত বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান প্রাপ্তির অংক (নীট) যথাক্রমে ১২,৫৪০ কোটি ও ৬,০৪৪ কোটি টাকা।


সূত্র: বাজেটের সংক্ষিপ্ত সার

সম্পদের ব্যবহারের চিত্র থেকে দেখা যায়, এবারের প্রস্তাবিত বাজেটে সুদ পরিশোধের জন্য মোট বাজেটের শতকরা ১২.২ ভাগ অর্থ ব্যয় করতে হবে, এটা শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দের তুলনায় যথাক্রমে শতকরা ১.১, ৭.৭ ও ৬.৫ ভাগ বেশি। অন্য এক হিসেবে দেখা যায়, সুদ পরিশোধের জন্য যে পরিমান অর্থ ব্যয় করতে হবে তা বিদ্যুৎ-জ্বালানি ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে মোট বরাদ্দের চেয়েও বেশি।

সরকারের আয়ের দিকে তাকালে দেখা যায়, মোট রাজস্ব সংগ্রহের পরিমান বেড়েছে এবং তা সঙ্গত কারণেই ঘটেছে বলে অনুমান করা যায়। তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো রাজস্ব আয়ের দুই তৃতীয়াংশই কিন্তু পরোক্ষ করের ওপর নির্ভরশীল। এই নির্ভরশীলতা নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দামের ওপর প্রভাব ফেলতে বাধ্য। তাছাড়া বাজেটে যে কথা স্পষ্ট করে বলা হয়নি তা হলো, সরকার ইতিমধ্যেই আইএমএফ এর কাছ থেকে যে ১০০ কোটি ডলারের ঋণ নিয়েছে, সেই ঋণের অন্যান্য শর্তের মধ্যে অন্যমত হলো জ্বালানি তেল ও বিদ্যুতের দাম বাড়ানো। এটা করা হবে ধাপে ধাপে এবং এর ফলে নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসের দামও সারা বছর ধরে ধাপে বাড়তে থাকবে। সাধারণ জনগণকে এই চাপ সহ্য করতে হবে- এটা হলপ করেই বলা যায়।

ইতিমধ্যেই প্রস্তাবিত বাজেটের সম্ভাব্য প্রভাব-প্রতিক্রিয়া নিয়ে বিস্তার আলাপ-আলোচনা শুরু হয়ে গেছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, ব্যবসায়ী গোষ্ঠী, নাগরিক সমাজের বিভিন্ন সংগঠন, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, অর্থনীতিবিদ, পেশাজীবী গোষ্ঠীসহ অন্যান্য স্বার্থগোষ্ঠীসমূহ তাদের অবস্থান থেকে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে তাদের স্ব স্ব দাবির যৌক্তিকতা তুলে ধরে কর হারে পরিবর্তন কিংবা বাড়তি বরাদ্দের দাবি করছেন।

কিন্তু বরাবরের মতো বাজেট নিয়ে সব আলোচনা শেষ হয়ে যাবে এ মাসের ৩০ তারিখের মধ্যে কেননা এর মধ্যেই জাতীয় সংসদে এটা পাশ হয়ে যাবে। একারণেই বাজেট বিষয়ক আলোচনাকে কেউ কেউ ‘মৌসুমি আলোচনা’ হিসেবে আখ্যায়িত করে থাকেন।

সামষ্টিক অর্থনৈতিক বিভিন্ন ইস্যু’র বাইরে মোটা দাগে বাজেট নিয়ে দুটো সমালোচনা লক্ষ করা যায়- বাজেট ‘গতানুগতিক’ ও ‘বাজেটে জন-আকাংঙ্খা’র প্রতিফলন নেই’। আর এক ধাপ এগিয়ে কেউ কেউ এই বাজেটকে ‘গণ-বিরোধী’ বলেও আখ্যায়িত করেন। সমালোচকদের বক্তব্যের সত্যতা আছে কিন্তু সমালোচনা-পর্যালোচনার সময় এর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ যথাযথভাবে হাজির করা হয় না। কোন অর্থে এই বাজেট গতানুগতিক? বাজেটে কেন জন-আকাংঙ্খার প্রতিফলন থাকে না যার ফলে হয়ে ওঠে গণ-বিরোধী? গণতান্ত্রিক বাজেট আন্দোলনের পক্ষ থেকে আমরা এই বিয়য়টি খোলসা করতে চাই। কেননা এর মধ্যেই রাষ্ট্র-সরকারের (অ)গণতান্ত্রিক চরিত্র নিহিত হয়ে আছে।

বাজেট গতানুগতিক, সমালোচনা-পর্যালোচনার ধরণও গতানুগতিক
শুধু এবারের বাজেট নয়, সব বাজেটই গতানুগতিক কেননা বাজেট পর্যালোচনা করে এই সিদ্ধান্তে পৌছানো যায় যে, এটা সামগ্রিক অর্থেই আমলাতান্ত্রিক অনুশীলন। সরকার বদল হলেও এর মূল কাঠামো বদলায় না। মন্ত্রণালয় ও খাত ভিত্তিক অর্থের বরাদ্দে সততই উর্দ্ধমুখী ধারা বজায় থাকে। আর্থ-সামাজিক অবস্থা বিশেষ করে দারিদ্র্য পরিস্থিতি বিবেচনায় কিছু কিছু জনতুষ্টিমূলক কর্মসূচি নেয়া হয়। কম্পিউটারের ¯েপ্রডসিটের বদৌলতে গাণিতিক এই হিসেব-নিকেশ অনেটাই সহজ হয়ে গেছে। বাজেট বক্তৃতার শুরু এবং শেষাংশে ক্ষমতাসীন দলের দর্শন, দলের নির্বাচনী প্রতিশ্র“তি পালন ও নেতার গুণগান থাকে। মৌল কাঠামোর কোন বদল হয় না। মূলত অর্থ মন্ত্রণালয় ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় খসড়া বাজেট দলিল তৈরি করে। অর্থ মন্ত্রণালয়ই একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় শুধু এডিপি বা বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির প্রকল্পগুলি প্রণয়ন করে, তবে চুড়ান্তভাবে এগুলি অনুমোদনের ক্ষমতা জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ-এর হাতে। প্রধানমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী ও মন্ত্রিপরিষদ বাজেট তৈরিতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে। তবে বাংলাদেশে বাজেটের কাঠামো ও বিন্যাস নির্ধারণে অর্থমন্ত্রীর একচ্ছত্র ক্ষমতা রয়েছে। বাংলাদেশের সংসদীয় কার্যপ্রণালী বিধি’র (জঁষবং ড়ভ চৎড়পবফঁৎব) ১১১(২) বিধি মতে, “এই ব্যাপারে সংবিধানের বিধান সাপেক্ষে অর্থমন্ত্রী যেরূপ উপযোগী মনে করেন সেই আকারে বাজেট সংসদে পেশ করিবেন”। সুতরাং বাজেটে কি কি বিষয় থাকবে আর কি কি থাকবে না তা নির্ধারণ করার ক্ষমতা অর্থমন্ত্রীর এখতিয়ারভুক্ত।

বাজেট নিয়ে রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজের প্রতিক্রিয়ার ধরণ একটি ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা রক্ষা করে চলে। কোন কোন দশকে আলোচনা সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে বিশেষ বিশেষ কোন ইস্যু স্থান দখল করে নেয়। ৮০ দশকে সামগ্রিক বাজেট ঘাটতি, বৈদেশিক ঋণ ও প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় বিষয়ক আলোচনা কেন্দ্র বিন্দুতে অবস্থান করছিল। নব্বই-এর দশকের শেষ দিক থেকে এই ধারায় কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। বিগত কয়েক বছর ধরে আলোচনা কেন্দ্রীভুত হয়েছে কয়েকটি বিষয়কে ঘিরে: বাজেটে উচ্চাভিলাষ, বাজেট ঘাটতি, বর্ধিত হারে অভ্যন্তরীণ ঋণ গ্রহণ, সুদ পরিশোধে বর্ধিত ব্যয়, বিদ্যুত ও জ্বালানি খাতের উন্নয়ন, শিক্ষা-স্বাস্থ্য খাতে বর্ধিত বরাদ্দের দাবি, কালো টাকা সাদা করা বা না করা বিষয়ক বিতর্ক, এডিপি বাস্তবায়নে ধীরগতি, অদক্ষতা ও দুর্নীতি ইত্যাদি। তাছাড়া এনজিও গোষ্ঠী, গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের সংগঠনসমূন্নারীসহ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর চাহিদা ও দাবিগুলিকে সামনে নিয়ে আসতে সচেষ্ট হচ্ছে। অর্থ মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের পক্ষ থেকেও ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন পেশাজীবীদের সাথে বাজেট পূর্ব সংলাপের আয়োজন লক্ষ করা যায়।

এভাবেই এপ্রিল-মে-জুন এই তিন মাস ধরে বাজেট -পূর্ব ও বাজেট পেশ-পরবর্তী মৌসুমি আলোচনার সূত্রপাত ঘটেছে। নি:সন্দেহে সমাজে এর ইতিবাচক দিক রয়েছে। সাধারণ জনগণ এখন বাজেট নিয়ে অনেক বেশি সচেতন, মানুষ এখন প্রশ্ন করতে শুরু করেছে। গণতান্ত্রিক সমাজ বিনির্মাণের পথে এ এক শুভ লক্ষণ।

বাজেটে জন-আকাঙ্খার প্রতিফলন নেই
বাজেট বক্তৃতায় কখনো বলা হয় না- এই বাজেটটি কিভাবে তৈরি করা হলো, কখন, কিভাবে, কার কার সাথে কথা বলা হলো। জন-আকাঙ্খার প্রতিফলন মানে জনগণের চাহিদা ও দাবিগুলির সন্নিবেশন। বাংলাদেশের বাজেট যেভাবে তৈরি করা হয় তাতে এই সুযোগ কখনোই ছিলো না, এখনো নেই। নাগরিকদের চাহিদাগুলিকে কি প্রক্রিয়ায় তুলে আনা হবে তার কোন প্রাতিষ্ঠানিক আয়োজন নেই। অর্থ মন্ত্রণালয় বাজেটের আগে এপ্রিল-মে মাসে বিভিন্ন পেশাজীবীদের সাথে ঢাকাভিত্তিক যে আলোচনা সভার আয়োজন করে তার ভেতর দিয়ে বাংলাদেশের ১৫ কোটি মানুষের চাহিদা ও দাবি উঠে আসে না। এ আলোচনা মূলত এলিট-সেন্ট্রিক (উচ্চবর্গ কেন্দ্রিক)। বিপুল সংখ্যক গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সাথে সরকার বাজেট নিয়ে কোন আলোচনা করে না। সরকার মূলত ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর সাথে আলোচনাকেই গুরুত্বপূর্ণ মনে করে। বাজেটে জন আকাঙ্খার প্রতিফলন ঘটতো যদি সরকার বিভিন্ন পর্যায়ের মানুষের সাথে আলোচনা করে বাজেট তৈরি করতো। দীর্ঘদিন ধরে গার্মেন্টস্ শ্রমিকরা গণ-পরিবহনের দাবি করে আসছে কিন্তু এবারের বাজেটেও তার জন্য কোন বরাদ্দ রাখা হয়নি। অথচ মালিক পক্ষের সাথে তারা কয়েক দফা বৈঠক করেছে। তাদের অনেক দাবিকেই গুরুত্বের সাথে বিবেচনায় নিচ্ছে।

বাজেট তৈরির প্রক্রিয়াটি মূলত জন-অংশগ্রহণহীন। বাজেট তৈরিতে জনগণের সরাসরি অংশগ্রহণের কোন সুযোগ নেই। তাই বাজেটে জন আকাক্সক্ষা প্রতিফলনের কোন সুযোগ নেই। এই অর্থে বাংলাদেশের জাতীয় বাজেট তৈরির প্রক্রিয়াটি অগণতান্ত্রিক। একই সাথে এটি একটি অতি-কেন্দ্রীভূত প্রক্রিয়া যা চুড়ান্ত বিচারে আমলাতন্ত্র নির্ভর। তাত্ত্বিকভাবে যদিও বাজেট প্রণয়ন প্রক্রিয়াটি ‘পরোক্ষ অংশগ্রহণ’ নির্ভর কিন্তু বাস্তবে বিভিন্ন পর্যায়ের জনপ্রতিনিধিগণ (সংসদসদস্য এবং স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধিগণ) এই প্রক্রিয়ার সাথে কোনভাবেই সম্পৃক্ত নন। সংসদসদস্যগণই কেবল বাজেট নিয়ে কথা বলতে পারেন। তাও ২০-২২ দিনের বেশি নয়। তাছাড়া সংবিধানের একাধিক অনুচ্ছেদ [৮৯(২), ৯০(২) এবং ৭০] ও সংসদীয় কার্যপ্রণালীবিধির একাধিক বিধি [১১১(৩)] সংসদসদস্যদের কার্যকরভাবে বাজেট আলোচনায় অংশগ্রহণকে বাধাগ্রস্থ করে। জাতীয় সংসদ মূলতবাজেট অনুমোদনের জন্য একটি ‘রাবার-স্ট্যাম্প’ হিসেবে ব্যবহৃত হয়, এর বেশি কিছু নয় । আইনগত দিক দিয়ে বাজেট তৈরির প্রক্রিয়াটি কার্যত নির্বাহী বিভাগের অধীন। আইনপ্রণেতাদের কার্যকর কোন ভূমিকা নেই। সুযোগের এই সীমাবদ্ধতার কারণে সংসদসদস্যগণ বাজেট আলোচনায় উদ্দীপনা বোধ করেন না।

লক্ষণীয় বিষয় হলো স্থানীয় সরকারের কোন পর্যায়ের প্রতিনিধিগণ (ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা, জেলা পরিষদ ও সিটি করপোরেশন) জাতীয় বাজেট প্রণয়ন প্রক্রিয়ার সাথে এমনকি প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে আলোচনার সাথেও যুক্ত নন। অথচ তারাই জনগণের সবচেয়ে কাছের সরকার।

সুতরাং বাজেট প্রণয়ন প্রক্রিয়াটি তাত্ত্বিকভাবে পরোক্ষ অংশগ্রহণমূলক হলেও বাস্তবে তার কোন প্রমাণ মেলে না। একারণেই বাংলাদেশের বাজেট প্রণয়ন প্রক্রিয়াটি চরম অগণতান্ত্রিক, জন-অংশগ্রহণহীন ও অতি-কেন্দ্রীভূত। এখানে জন-আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটবে না এটাই স্বাভাবিক। এবারের বাজেটেও তার কোন ব্যতিক্রম ঘটেনি।

সংসদসদস্যগণই দায়ী
সংসদসদস্যগণই দায়ী, কেননা তারা এমন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেননি যার ফলে তারা বাজেট নিয়ে বিস্তৃত ও কার্যকর আলোচনায় অংশ নিতে পারেন। আমাদের জানা মতে আজ পর্যন্ত কেউই এ বিষয়ে সংসদে মুখফুটে কথা বলেননি, প্রয়োজনীয় আইনগুলি সংস্কারের দিকে আঙ্গুলি নির্দেশ করেননি। তারা কখনোই বলেননি, বাজেট প্রণয়নে তাদেরকে শুরু থেকেই প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সম্পৃক্ত করা হোক। তারা কখনোই বলেননি যে, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলিকে ক্ষমতায়িত করে তাদেরকেও জাতীয় বাজেট প্রণয়নে অংশীদার করা হোক। তারা কখনোই বলেননি যে, বাজেট তৈরির আগে বিভিন্ন পর্যায়ের মানুষের সাথে আলোচনার জন্য প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক আয়োজনের ব্যবস্থা করা হোক। বরঞ্চ তারা প্রধানমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী আর মন্ত্রণালয়ে নিজ এলাকার জন্য প্রকল্প পাওয়ার বিষয়ে তদবির করাকেই যথাযথ বলে মনে করেছেন। ফলে এখন নিজেরাও যেমন বাজেটের অংশীদার হতে পারেননি, তেমনি সাধারণ নাগরিকদেরকেও বাজেট আলোচনায় সম্পৃক্ত করাতে পারেননি। জাতীয় বাজেটের অগণতান্ত্রিক চরিত্র টিকিয়ে রাখার জন্য তারা তাদের দায় অস্বীকার করতে পারে না।

এডিপি প্রণয়ন প্রক্রিয়া চরম অগণতান্ত্রিক আর বাস্তবায়নে ‘হরিলুট’
বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বা এডিপি প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কোন ধরণের অংশগ্রহণের সুযোগ নেই। যা আছে তা হলো ‘তদবির’! সম্পূর্ণ কাজটি করে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়। এডিপি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে একজন সদ্যবিদায়ী পরিকল্পনা সচিবের পর্যবেক্ষণ হলো: “……..অনেক প্রকল্প তৈরি করা হয় তাড়াহুড়া করে। সার্বিক পরিস্থিতি ও ভবিষ্যৎ ফলাফল ভালোভাবে পরীক্ষা করা হয় না। তাড়াহুড়া করে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়। কমিশনের প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি (পিইসি) সভায় মূল্যায়ন কম হয় চাপের মুখে, তদবিরের মুখে।……..প্রকল্পের ড্রয়িং, ডিজাইন, টেন্ডার দলিলাদি প্রণয়ন ও বাজেট বিভাজনেও কালক্ষেপন করা হয়। বড় বড় প্রকল্পের ক্ষেত্রে …………অনুমোদন, কার্যাদেশ প্রদানে প্রায় ছয় মাস সময় লেগে যায়। আবার দৃশ্যমান ও অদৃশ্য হস্তক্ষেপ হলে তো কথাই নেই।…………প্রকল্পের বাস্তব কাজের অগ্রগতি ও গুণগত মান নিয়ে গুরুত্বসহ আলোচনা হয় না। আর্থিক অগ্রগতি নিয়েই বেশি আলোচনা করা হয়।…..প্রকল্প বাস্তবায়নের পরও প্রকল্পের সমস্যা থেকে যায়। সংরক্ষণের জন্য ব্যয় বরাদ্দ রাখা হয় না বা রাখা হলেও তা সঠিকভাবে ব্যয় করা হয় না। ……..সেতু, কালভার্ট কিছুদিন পর খারাপ হয়ে যায় এবং ব্যবহারের অনুপযুক্ত হয়ে পড়ে। অনেক ভৌত কাঠামো নির্মাণ হওয়ার পর দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকে। এগুলো লক্ষ করা গেছে হাসপাতাল ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে টেন্ডারবাজি ও চাঁদাবাজি, যা উন্নয়ন প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্থ করছে। ” সচেতন যে কোন নাগরিকেরও এই একই পর্যবেক্ষণ। আরো চিত্তাকর্ষক পর্যবেক্ষণ হলো, বছরের প্রথম ১০ মাস কাজের শতকরা ৪৫-৫০ ভাগ বাস্তবায়িত (টাকার অংকে অবশ্যই) হলেও পরবর্তী ২ মাসে আরো ৪০-৪৫ ভাগ বাস্তবায়িত হয়ে যায়। বাস্তবায়নকারী দপ্তরের কাঁধে যেন এক ভৌতিক শক্তি ভর করে! মাত্র দুই সাসে যারা ৪০-৪৫ ভাগ বাস্তবায়ন করে ফেলতে পারে, তাদের দক্ষতা নিয়ে সরকার নিজেও প্রশ্ন তোলে, এ এক হাস্যকর ধারণা বৈ-কি! আর কিছু নয়।

এডিপি হলো ‘সরকারি বিনিয়োগ’। সাধারণভাবে এটি জিডিপি’র ৪ শতাংশের মতো, মূল উন্নয়ন বাজেটের প্রায় ৯৫ শতাংশ। এবারের এডিপি ৫৫,০০০ কোটি টাকা। টাকার অংকে তা যাই হোক না কেন সমাজ-অর্থনীতিতে এর গুণীতক প্রভাব আছে। অথচ এই টাকার একটি বড় অংশই মাঠে ব্যয় হবার চেয়ে অন্যের পকেটে চলে যায়। তাছাড়া এই বিনিয়োগ পরিকল্পনাটা আবার সরকারের মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার (পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা ও পরিপ্রেক্ষিত পরিকল্পনা) অংশ। এই দুই পরিকল্পনা প্রণয়নেও নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি বা সাধারণ জনগণ কোনভাবেই সম্পৃক্ত নন। গত ২ বছর ধরে এডিপি প্রণীত হচ্ছে ৬ষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার আওতায়। অথচ সাধারণ জনগণতো দূরে থাকুক কোন পর্যায়ের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরাও এই পরিকল্পনা দলিল প্রণয়নের সাথে সম্পৃক্ত ছিল না। আসলে মূল সংকটটা নিহিত আছে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা ও এডিপি প্রণয়ন প্রক্রিয়ার অগণতান্ত্রিক চরিত্রের মধ্যে, জন-অংশগ্রহণহীনতার মধ্যে এবং সর্Ÿোপরি অতি-কেন্দ্রিকতা ও আমলা-নির্ভরতার মধ্যে। আমরা আশা করেছিলাম, অর্থমন্ত্রী গতানুগতিক সমালোচনা ও অভিযোগের বাইরে গিয়ে এ ব্যাপারে প্রাতিষ্ঠানিক কিছু পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেবেন, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে ক্ষমতায়িত করে তাদেরকে এডিপি’র অংশীদার করবেন, তা তিনি করলেন না । আবারো সেই অগণতান্ত্রিকতা, অংশগ্রহণহীনতা আর আমলা-নির্ভরতা বজায় রাখলেন।

মহাজোট সরকার তাদের নির্বাচনী ওয়াদা বরখেলাপ করেছে, জেলাভিত্তিক বাজেট করেনি
আওয়ামী লীগ তার দিনবদলের সনদ তথা নির্বাচনী ইশতেহারে ওয়াদা করেছিল তারা ক্ষমতায় গেলে একটি বিকেন্ত্রীকৃত, স্ব-শাসিত ও স্বনির্ভর স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার প্রবর্তন করবে (৫.৬ ও ৬নং অনুচ্ছেদ)। তাছাড়া ‘রূপকল্প’ বা ভিশন-২০২১ এর ২নং ধারায়ও অনুরূপ প্রতিশ্র“তি ব্যক্ত করা হয়েছিল। এবারের বাজেটে তার কোন প্রতিফলন নেই। আমাদের বর্তমান বাজেট কাঠামোর সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে সরকার ওয়াকিবহাল। মহাজোট সরকারের প্রথম বাজেট (২০০৯-১০) উত্থাপনকালে মাননীয় অর্থমন্ত্রী নিজেই বলেছিলেন, “আমরা জাতীয় বাজেট কেন্দ্রীয়ভাবে প্রণয়ন করি। এতে জেলা বা মাঠ পর্যায়ের জনগণের ইচ্ছার বা তাদের চাহিদার যথাযথ প্রতিফলন ঘটে না। একইসাথে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা অনিশ্চিত থেকে যায়। আমরা বলতে পারি না কী পরিমাণ সরকারি অর্থ একটি নির্দিষ্ট জেলায় ব্যয় হচ্ছে বিদ্য,ান শ্রেণী বিন্যাস কাঠামোতে কিছু পরিবর্তন এনে আমরা প্রাথমিকভাবে প্রতিটি বিভাগের একটি জেলায় জেলা বাজেট প্রণয়ন করতে চাই। ” অর্থ মন্ত্রণালয় এ ব্যাপারে জেলাভিত্তিক বাজেট কিভাবে প্রণয়ন করা যায় সে সংক্রান্ত একটি ধারণাপত্রও প্রকাশ করেছিলো যেখানে আশু ও দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছিল। বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ হিসেবে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলিকে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে সম্পৃক্ত করার কথাও বলা হয়েছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক যে, এর পরে দু-দুটি অর্থ বছর পার হয়েছে, এমনকি এবারের বাজেটেও জেলাভিত্তিক বাজেট প্রণয়নের কোন হদিস নেই। এটা করা সম্ভব হলে বাজেটের গণতন্ত্রায়ন তথা জনগণের সরাসরি অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার পথে একধাপ হলেও অগ্রসর হওয়া যেতো।

আমরা বাজেটের পরিপূর্ণ গণতন্ত্রায়ন চাই
বাজেটের অগণতান্ত্রিক চরিত্র মূলত অতি-কেন্ত্রীকতা, জন-অংশগ্রহণহীনতা ও আমলা-নির্ভরতার মধ্যে। এর অবসান না হলে বাজেট হবে গতানুগতিক, জন-আকাক্সক্ষা বিবর্জিত এবং সে কারণেই তা হবে গণবিরোধী। এর জন্য বাজেট সম্পৃক্ত ‘রুলস্ অব দ্যা গেম’ এ পরিবর্তন আনতে হবে। তা না হলে বিদ্যমান অগণতান্ত্রিক চরিত্রের নিয়ম নীতি বা ‘রুলস্ অব দ্যা গেম’-এর মধ্যে থেকে আমাদেরকে বাজেট পড়তে হবে, ব্যাখ্যা করতে হবে, প্রতিক্রিয়া দিতে হবে। আমার আশা করবো, এবারের বাজেট অধিবেশনে অর্থমন্ত্রী তার ২০০৯-১০ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায় দেয়া গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণটি আরেকবার স্মরণ করবেন এবং তার ভাষায়, “জনগণের ইচ্ছার বা চাহিদার প্রতিফলন” ঘটানোর জন্য প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেবেন। আমরা আরো আশা করবো মাননীয় সংসদসদস্যগণও এবারের বাজেট অধিবেশনে প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনের পক্ষে জোরালো অবস্থান নেবেন।

আপনাদের সকলকে ধন্যবাদ।