ভূমি সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়নে প্রস্তাবিত বাজেট ২০১৩-১৪ কতটুকু জনবান্ধব

 

গত ৬ জুন ২০১৩ বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় অর্থমন্ত্রী জনাব আবুল মাল আব্দুল মুহিত জাতীয় সংসদে ২০১৩-১৪ অর্থবছরের বাজেট পেশ করলেন। এবারের বাজেট দলিল এর শিরোনাম ছিল “উন্নয়নের চার বছর: স্বপ্ন পূরণের পথে বাংলাদেশ ঃ বাজেট বক্তৃতা ২০১৩-১৪’’। বাজেট বক্তৃতার শুরু ও শেষ হয়েছে মহাজোট সরকারের দিন বদলের সনদ ‘রূপকল্প ২০২১’ বাস্তবায়নের আকাঙ্খা নিয়ে। ২০২১ সালের বাংলাদেশ হবে অসাম্প্রদায়িক, প্রগতিশীল, উদার গণতান্ত্রিক কল্যাণ রাষ্ট্র; ২০২১ সালের বাংলাদেশ হবে স্বল্প বৈষম্যপূর্ণ এক মধ্য আয়ের দেশ। রূপকল্প-২০২১ বাস্তবায়নকারীদের অবশ্যই স্মরণ রাখতে হবে যে, দেশের রাজস্ব কর, সরকারি ব্যয়, আর্থিক নীতিমালা বা যাই বলা হোক না কেন তা দেশের বৃহত্তর দরিদ্র বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর স্বার্থানুকূলে হতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে দেশের উন্নয়ন প্রক্রিয়াটি হতে হবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সাথে সাথে বন্টনের ন্যায্যতা নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে। ২০১৩-১৪ সালের প্রস্তাবিত বাজেট রূপকল্প ২০২১ বিনির্মাণের অঙ্গীকারাবদ্ধ। এটি এমন এক উন্নয়নের দিক নির্দেশক দলিল যা আয়-ব্যয়ের বিন্যাসসহ বিভিন্ন নীতি কৌশল সংশ্লিষ্ট দিক নির্দেশনার প্রতিফলন সেখানে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, শিল্পায়ন, মানুষে মানুষে বৈষম্য হ্রাস, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি, দারিদ্র্র্য দূরকরণ, নারীবান্ধব উন্নয়ন এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর উন্নয়নের বিষয়টি গ্রোথিত রয়েছে।
বর্তমান সরকারে এবারের জাতীয় বাজেটে বাংলাদেশের ভূমি ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন, ভূমি বিষয়ক যুগোপযোগী আইন ও বিধিমালা প্রণয়ন এবং সর্বোপরি ভূমিহীন পুর্নবাসন এর বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। এছাড়াও পানি সম্পদের ব্যবহার এবং এর ন্যায্য হিস্যা আদায় নিশ্চিতকরণে বিশেষ উদ্যোগ এর কথা জোর দিয়ে বলা হয়েছে। কিন্তু এসব কর্মকান্ডের ধারাবাহিকতায় যেমন অভাব রয়েছে তেমনি রয়েছে জনগণের কাছে এর স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার বিষয়টিও।

ভূমি ব্যবস্থার আধুনিকায়ন
মাননীয় অর্থমন্ত্রী তার বাজেট বক্তৃতায় গত ৪ বছরের বাজেটে ইতোমধ্যে সম্পন্ন নীতি/কার্যক্রম সম্পর্কে জানাতে গিয়ে বলেছেন, ‘ভূমি ব্যবহারভিত্তিক ২১ টি জেলার ১৫২ টি উপজেলায় জোনিং সম্পন্ন হয়েছে এবং ঢাকা মহানগর জরিপে ১৯১ মৌজার ৪ লক্ষ ৪১ হাজার ৫০৬ টি খতিয়ান ও ৪০৮৯ টি মৌজা ম্যাপ সীট ডিজিটাইজেশান এর কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে এবং জমি রেজিষ্ট্রেশন এর ক্ষেত্রে উৎসে কর কর্তনের হার হ্রাস করা হয়েছে (অনুচ্ছেদ ৩০৮, ৩০৯)। জমি রেজিষ্ট্রেশন এর ক্ষেত্রে উৎসে কর কর্তনের হার হ্রাস কার্যক্রম জমি রেজিষ্ট্রেশন এর মাত্রা বৃদ্ধিতে সহায়ক হলেও জনগণের ভোগান্তি এবং আর্থিক দুর্নীতি হ্রাসকল্পে কোন সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারেনি। তাছাড়া উল্লেখিত অনুচ্ছেদ ৩০৮ ও ৩০৯ এর কার্যক্রম সম্পর্কে জনগণ কাছে স্বচ্ছ ধারনা না থাকায় এর জবাবদিহিতার বিষয়টি স্পষ্ট নয়।
অর্থমন্ত্রী তার বাজেট বক্তৃতায় ৩১০ অনুচ্ছেদে বাস্তবায়নাধীন অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত বিষয়সমূহের যে বর্ণনা দিয়েছেন তন্মধ্যে ১৬ নম্বরে বলেছেন, ‘ভূমি রেজিষ্ট্রেশন ডিজিটাইজেশন এর প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন’। এতে বিষয়টি পুরোপুরি পরিষ্কার হয়নি। রেজিষ্ট্রেশন ডিজিটাইজেশন এর আওতা কতটুকু হবে এবং কি কাজসমূহ করা হচ্ছে তা জানা যায়নি। এটি যদি পুরো রেজিষ্ট্রেশন প্রক্রিয়াকে না বুঝিয়ে শুধুমাত্র রেজিষ্ট্রেশন এর দলিলগুলোকে স্ক্যানিং করা বুঝানো হয় তবে তা সামগ্রীক অর্থে জনগণের জন্য কার্যকরী ফল বয়ে আনবে না। তাছাড়াও তার প্রদত্ত বক্তৃতায় তিনি উল্লেখ করেছেন (১৬ এবং ২১ অনুচ্ছেদে) যে, ‘ডিজিটাল পদ্ধতিতে ভূমি জরিপ ও অন্যান্য কার্যক্রম চালু হচ্ছে এবং ৬১ টি জেলায় ভূমি জরিপ সংক্রান্ত কার্যক্রম ডিজিটাইজ করা হচ্ছে’। কিন্তু বাস্তবে ডিজিটাইজ ভূমি জরিপ কাজের জন্য পর্যাপ্ত দক্ষ লোকবল, মুলধন এবং অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়েছে কি? তাছাড়া এই কাজ দেশব্যাপি ৬১টি জেলায় পরিচালনা করতে কত সময় লাগবে এবং কবে নাগাদ তা শেষ হবে তা জানানো হয়নি। জনগণের কাছে এ নতুন ধারণার কর্মযজ্ঞ প্রচারের কোন ব্যবস্থা গণমাধ্যমে করা হবে কিনা তাও অস্পষ্ট। এসব প্রশ্নের উত্তর না খুঁজে এই বৃহত্তর কাজে কি সফলতা আসবে তা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যায়।
জাতীয় বাজেট ২০১৩-১৪ ঘোষিত কার্যক্রম এর ২৪৮ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে, সম্পূর্ণ ভূমি ব্যবস্থাপনাকে এক দপ্তর থেকে সম্পন্ন করার পথনকশা প্রণয়ন-বাস্তবায়ন অগ্রগ্রতির খসড়া প্রণয়ন হয়েছে। অনলাইনে ভূমি রেকর্ড সংরক্ষণ, হালনাগাদকরণ, ডিজিটাল জরিপ কাজ পরিচালনা, ডিজিটাল নকশা ও খতিয়ান প্রণয়ন, প্রচলিত খতিয়ানের পরিবর্তে ভূমি মালিকানার সনদ প্রবর্তন-বাস্তবায়ন অগ্রগতি হয়েছে। তা ছাড়া ২০ টি উপজেলায় ২০ টি ভূমি তথ্য সেবা কেন্দ্র চালুর লক্ষ্যে প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন। ২০১৪ সালের মধ্যে ৫৫ জেলায় কম্পিউটারাইজেশান মৌজা ম্যাপ এবং খতিয়ান প্রকাশনার এর কাজ সম্পন্ন হবে এবং ৩ টি উপজেলায় ভূমি মালিকানা সনদ প্রবর্তনের কাজ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে (অনুচ্ছেদ ২৪৭)। এক্ষেত্রে চলমান পাইলট প্রকল্পসমূহ দ্রুত চূড়ান্ত করতে হবে এবং প্রয়োজনে বাস্তবায়ন কার্যক্রম ত্বরান্বিত করতে আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে।

ভূমি ব্যবহার আইন ২০১১
মাননীয় অর্থমন্ত্রী বলেছেন, তার সরকার কৃষি জমি সুরক্ষা ও ভূমি ব্যবহার আইন ২০১১ এর খসড়া প্রণয়ন করেছেন এবং তার জন্য এখন স্টেকহোল্ডারদের মতামত গ্রহণ করা হচ্ছে। এ উদ্যোগটি অবশ্যই প্রশংসনীয়। এটি যুগোপযোগী, দারিদ্র্য ও কৃষি বান্ধব হতে হবে এবং এ উদ্যোগের সফল বাস্তবায়ন দক্ষতার সাথে করতে হবে। সর্বোপরি এই আইনটি প্রণয়ন চূড়ান্তকরণ এবং এর বিধিমালা প্রণয়ন অতীব জরুরি। এ নিয়ে কালক্ষেপন আর কোন ক্রমেই কাম্য নয়। এছাড়া নগর অঞ্চল পরিকল্পনা ও ভূমি ব্যবহার আইন ২০১১ এর যে প্রাথমিক খসড়া প্রণয়ন করা হয়েছে তাও স্টেকহোল্ডারদের মতামতে প্রতিফলন ঘটিয়ে তার বাস্তবায়ন করা জরুরি হয়ে পড়েছে (অনুচ্ছেদ ১৪০)। অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, ভূমির পরিকল্পিত ও সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করতে মোট ২১ টি জেলার ১৫২টি উপজেলার ডিজিটাল ল্যান্ড জোনিং ম্যাপ সম্বলিত প্রতিবেদন প্রণয়ন করা হয়েছে। অবশিষ্ট ৪০ টি জেলার ডিজিটাল ল্যান্ড জোনিং এর কাজ চলছে। এ কাজে জনগণের অংশগ্রহণ ও সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মতামতের প্রতিফলন থাকাটা গুরুত্বপূর্ণ।

নদী ব্যবস্থাপনা
নদী ব্যবস্থাপনা প্রসংগে অর্থমন্ত্রী জানিয়েছে, ক্যাপিটাল ড্রেজিং ও নদী ব্যবস্থাপনায় গঙ্গা, মেঘনা, যমুনা নদীতে এর কাজ শুরু হয়েছে (অনুচ্ছেদ ৬১) এবং গড়াই নদী পুনরুদ্ধার প্রকল্পে ২য় পর্যায়ের কাজ চলমান (অনুচ্ছেদ ৬৪)। এসব প্রকল্প নদী ব্যবস্থাপনায় ধারবাহিকতা বজায় রাখা জরুরি। তবে এ কার্যকারিতা জনবান্ধব কিনা এবং এর পরিকল্পনায় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা দরকার। নতুবা এসব প্রকল্পের আর্থিক জবাবদিহিতার বিষয়টি দুনীতি রোধে কোন পদক্ষেপ গ্রহণে ফলপ্রসু ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে না। তাছাড়া আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় স্বচছতা ব্যাহত হতে পারে।
গত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে ৭.৪ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছিল যে, ভূমিহীনদের মধ্যে খাসজমি বিতরণ, খাস জলাশয় ও জলমহাল প্রকৃত মৎস্যজীবীদের মাঝে বন্দোবস্ত দেয়া হবে। সমুদয় জমির রেকর্ড কম্পিউটারায়ন করা হবে এবং ভূমি, জলাশয়ের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং সামাজিক ন্যায় বিচারের লক্ষ্যে ভূমি সংস্কার কমিশন গঠন করা হবে। ৭.৫ এ বলা হয়েছে যে, উপকূলীয় অঞ্চলে পরিকল্পিতভাবে ভূমি উদ্ধারের ব্যবস্থা করা হবে। ১৮.১ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে, আদিবাসীদের জমি, জলাধার এবং বন এলাকায় সনাতনি অধিকার সংরক্ষণের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণসহ ভূমি কমিশন গঠন করা হবে। বস্তি, চর, হাওর, বাওড় ও উপকূলসহ সকল অনগ্রসর অঞ্চলের মানুষের জীবনের মান উন্নয়নে অগ্রাধিকার দেয়া হবে।

ই-গভর্ন্যান্স চালু
২০১৪ সালের মধ্যে ই-গভর্ন্যান্স চালুর লক্ষ্যে ৪ হাজারেরও বেশি ইউনিয়ন এ ইউনিয়ন তথ্য কেন্দ্র স্থাপন করেছি। ই-সার্ভিস সেন্টার রয়েছে প্রতিটি জেলায়। জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে মোট ২৪ হাজার ওয়েভ পোর্টাল তৈরির কাজও শেষ পর্যায়ে। এটি নিঃসন্দেহে ভাল উদ্যোগ তবে এ কাজের সাথে ভূমি বিষয়ক তথ্য প্রাপ্তির বিষয়টি নিশ্চিত করতে পারলে জনগণের হয়রানি অনেকাংশে লাঘব হতে পারে। যদিও অর্থমন্ত্রী তার ভাষণে বলেছেন যে, ২০ টি উপজেলায় ২০টি ভূমি তথ্য সেবা কেন্দ্র স্থাপন করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এ তথ্য আমাদের প্রত্যাশার পূরণে যথেষ্ট নয়।

ভূমি ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন
বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী বলেছেন যে, ঢাকা মহানগর জরিপে ১৯১টি মৌজার ৪ লক্ষ ৪১ হাজার ৫০৬ টি খতিয়ান ও ৪ হাজার ৮৯টি মৌজা ম্যাপ সীট ডিজিটাইজেশনের কাজ সম্পন্ন করেছি। জুন ২০১৪ এর মধ্যে ৫৫ টি জেলায় বিদ্যমান মৌজা ম্যাপ ও খতিয়ান কম্পিউটারাইজেশন এর কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হবে। এ কাজে পর্যাপ্ত দক্ষ জনবল তৈরি এবং কম্পিউটার ব্যবহার ও তার সংরক্ষণের প্রস্তুতি না থাকলে তা জনগণের কল্যাণ বয়ে না এনে বরং তা বুমেরাং হতে পারে। অর্থমন্ত্রী স্বয়ং ভূমি ব্যবস্থার ডিজিট্যালাইজেশনের বিষয়ে খেদোক্তি প্রকাশ করেছেন নি¤œক্তোভাবে, ‘গত ৩ বছরের মধ্যে পিপিপি’র মাধ্যমে আমরা সব জেলায় ভূমি রেকর্ডকে নবায়ন করবো এবং সত্যায়িত করবো। এজন্য আমরা সরজমিনে জরিপ করবো, মহাকাশ প্রযুক্তির মাধ্যমে করা জমি জরিপ এবং সরজমিনে জরিপ মিলিয়ে দেখবো এবং প্রতিটি জমির মালিক অথবা দখলদার অথবা বর্গাদারকে জমিতে তার আইনানুগ অধিকার অনুযায়ী খতিয়ান প্রদান করবো। এর উপর ভিত্তি করে আমরা যে কেন্দ্রিয় ডাটাবেজ তৈরি করবো তারই মাধ্যমে জমির লেনদেন হবে, রেকর্ড নবায়িত বা সংশোধিত হবে এবং মালিকানা বা অধিকার পরিবর্তন হবে। এ আদর্শ ব্যবস্থা প্রচলিত হবে এবং জমি নিয়ে মামলা মোকদ্দমা ব্যাপকভাবে হ্রাস পাবে’। কিন্তু গত চার বছরের মধ্যে এ ডিজিট্যালাইজেশনের কাজ বাস্তবে আতুর ঘর পেরুতে পারেনি। এখনো এটি স্বপ্ন হিসেবেই রয়ে গেছে। ফলে এটি বাস্তবায়ন কবে নাগাদ শেষ হবে তা বলা কঠিন হয়ে পড়েছে।

পানি সম্পদ
বাজেটে ২০১৩-১৪ অর্থ বছরের জন্য প্রস্তাবিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে কৃষি, পল্লী উন্নয়ন ও পল্লী প্রতিষ্ঠান, পানি সম্পদ এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য খাতে ২৫.৪ শতাংশ বরাদ্দের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এক্ষেত্রে পানি সম্পদের সমন্বিত উন্নয়ন এবং সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার উপর জোর দেয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে অনুমোদন দেয়া হয়েছে বাংলাদেশ পানি আইন-২০১৩। এ আইনটি প্রণয়নে জনগণের অংশগ্রহণ না থাকায় জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট ইস্যুগুলোকে পাশ কাটিয়ে যাওয়া হয়েছে। তাই এটি আরো পুর্নবিবেচনার দাবি রাখে। এ ছাড়া নদী তীর ও শহর সংরক্ষণ এবং নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন ২০১৩-১৪ অর্থবছরসহ পরবর্তী ৫ অর্থবছরে আরো ১২শ’ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ, ১৫ হাজার কিলোমিটার অধিক বাঁধ মেরামত, সাড়ে ৪ হাজার বন্যা নিয়ন্ত্রণ কাঠামো নির্মাণ এবং মেরামত ও ১ হাজার ৫০০ কিলোমিটার নদী তীর নতুনভাবে সংরক্ষণের ও মেরামতের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। গড়াই নদী পুনরুদ্ধার প্রকল্পের ২য় পর্যায়ের কাজ শুরু হয়েছে। ঢাকার পার্শ্ববর্তী নদীসমূহের নাব্যতা ও প্রবাহ বৃদ্ধি করার উদ্দেশ্যে নেয়া হয়েছে বুড়িগঙ্গা নদী পুনরুদ্ধারের জন্য প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। এসব প্রকল্পের জন্য চাই সঠিক জনবান্ধব নীতি ও ব্যবস্থাপনা, যার প্রায়ই অভাব পরিলক্ষিত হয়। ফলে এসব প্রকল্পে অর্থ ব্যয় হয় কিন্তু উদ্দেশ্য ব্যর্থতায় পর্যবেসিত হয়।

চর এলাকার জমি
ক্লাইমেট চেঞ্জ ট্রাস্ট ফান্ড এর আওতায় সমুদ্র হতে ভূমি উদ্ধারের জন্য উপকূলীয় অঞ্চলে ক্রস ড্যাম ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। উপকূলীয় এলাকায় জেগে উঠা চর অবৈধ দখলমুক্ত করে সেখানে ১১ হাজার ২৯৮ ভূমিহীন পরিবারকে প্রায় ১৬ হাজার একর জমি স্থায়ীভাবে বন্দোবস্ত দেয়া হয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় আগামী ৫ বছরে আরো ১৩ হাজার ৫৯০ একর জমি উদ্ধার করে সেখানে সাড়ে ৯ হাজার পরিবারকে পুর্নবাসন করার পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে। এছাড়াও উপকূলীয় এলাকায় আড়ি বাঁধ নির্মাণ করে ৫০ হাজার একর ভূমি পুনরুদ্ধারের ব্যবস্থা নেয়ার প্রতিশ্রুতি রয়েছে। বলা হয়েছে যে, এর মধ্যে ২৭ হাজার একর এলাকায় ১৬ হাজার দরিদ্র পরিবারকে পুর্নবাসন করার উদ্যোগ নেয়া হবে।

অভিন্ন নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা
অর্থমন্ত্রীর বক্তৃতায় স্থান পেয়েছে অভিন্ন নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা আদায় বিষয়টি। তিনি বলেছেন, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে পানি সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব। টিপাইমুখ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের বিষয়ে ভারত ১ টি যৌথ সমীক্ষা পরিচালনায় সম্মত হয়েছে। গঙ্গার উপনদীতে জলাধার নির্মাণের মাধ্যমে ফারাক্কায় পানি প্রবাহ বৃদ্ধিসহ জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের বিষয়ে বাংলাদেশ সরকার ভারতের সাথে সমঝোতায় পৌছেছে। তিস্তা নদীর পানি বন্টন চুক্তি চূড়ান্তকরণ পর্যায়ে রয়েছে। সেপ্টেম্বর ২০১১ করা উভয়দেশের মধ্যে উন্নয়ন সহযোগিতা কাঠামো বিষয়ে একটি যুগান্তকারী চুক্তি (ঋৎধসবড়িৎশ অমৎববসবহঃ ড়হ ঈড়ড়ঢ়বৎধঃরড়হ ভড়ৎ উবাবষড়ঢ়সবহঃ) স্বাক্ষরিত হয়েছে। কিন্তু এসব আঞ্চলিক চুক্তি কোন ধারনাই সাধারণ মানুষের কাছে স্পষ্ট নয়। গোপনীয় অনেক শর্তে দেশের সাধারণ মানুষের সকল স্বার্থ দেখভালের দায়িত্ব সরকার যথাযথ পালন করবেন কিনা এবং পালনে সক্ষম কিনা এখন তার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে।

হাওর উন্নয়ন
অর্থমন্ত্রী তার বাজেট বক্তৃতায় জানিয়েছেন যে, উত্তর পূর্বাঞ্চলের ৭ জেলায় ২ কোটি জনগণের টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে ৭৯ কোটি ৩৬ লক্ষ টাকা ব্যয়ে ১ টি হাওর উন্নয়ন মহাপরিকল্পনা ও ডাটাবেজ তৈরি করা হয়েছে। এ মহাপরিকল্পনা ১৭ টি বিশেষ উন্নয়ন ক্ষেত্র চিহ্নিত করা হয়েছে। যা ২০ বছরে বাস্তাবয়িত হবে। এ বাবদ ২০১৩-১৪ সালে ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ বিশেষ কর্মসূচি খাতে থাকবে। এটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। কিন্তু প্রশ্ন হলো ২০ বছরের ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে তো?

পানি উৎপাদন
এছাড়াও পরিবেশগত দিক বিবেচনায় পানির উৎপাদনের ক্ষেত্রে ভূগর্ভস্থ উৎসের পরিবর্তে ক্রমান্বয়ে ভূ-উপরিস্থ উৎসের ওপর নির্ভরশীলতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে ভূ-উপরিস্থ উৎস হতে পানি সরবরাহের পরিমাণ ১২ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ২২ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। দৈনিক ৪৫ কোটি লিটার পানি সরবরাহের ক্ষমতা সম্পন্ন সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার (তৃতীয় পর্যায়ে) এবং সাভারে ১৫ কোটি লিটার সরবরাহের ক্ষমতা সম্পন্ন ওয়েলফিল্ড নির্মাণের প্রকল্প গ্রহণ করেছি। সিলেট ও বরিশাল নগরীতেও পানি সরবরাহের লক্ষ্যে ২৮ টি উৎপাদক নলকূপ ৪ টি ভূ-উপরিস্থ পানি শোধনাগার ও বিতরণ লাইন নির্মাণের কাজ চলছে। অর্থমন্ত্রী বলেছেন সরকারের উদ্দেশ্য হচ্ছে ভূগর্ভস্থ ও ভূ-উপরিস্থ পানি সরবরাহের অনুপাত ৫০:৫০ এ উন্নীতকরণ। এক্ষেত্রে রাজশাহীসহ গোটা উত্তরবঙ্গ এর বরেন্দ্র এলাকাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনায় আনতে হবে।

জাতীয় গৃহায়ন নীতিমালা ২০১২
আবাদযোগ্য ও উৎপাদনক্ষম জমির সুরক্ষা ও জমির পরিকল্পিত ব্যবহারের মাধ্যমে আবাসন সমস্যা সমাধানের উদ্দেশ্যে জাতীয় গৃহায়ন নীতিমালা ২০১২ ও পরিবেশবান্ধব, নিরাপদ ও ঝুঁকিমুক্ত ইমারত নির্মাণের লক্ষ্যে বাংলাদেশ ন্যাশানাল বিল্ডিং কোড বিএনবিসি সংশোধন এর কাজ করা হয়েছে। প্রণয়ন করা হয়েছে রিয়েল এস্টেট উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা আইন ২০১০ ও এ সংক্রান্ত বিধিমালা ২০১১। এছাড়াও বেসরকারি আবাসিক প্রকল্পের জমি উন্নয়ন বিধিমালা ২০০৪ সংশোধন করা হয়েছে। নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা আইন ২০১২ প্রণয়নের কাজও চলমান রয়েছেন। এখন প্রশ্ন হচ্ছে এতোসব আইনের মারপ্যাচে আমাদের আবাদযোগ্য ও উৎপাদনক্ষম জমির সুরক্ষা ও জমির পরিকল্পিত ব্যবহার নিশ্চিত হবে তো?

অর্পিত সম্পত্তি আইন
অর্পিত সম্পত্তি প্রর্ত্যপণ আইন(সংশোধন) ২০১২ এবং অর্পিত সম্পত্তি অবমুক্তি বিধিমালা ২০১২ প্রণয়ন করা হয়েছে। এই আইনের আওতায় দেশের ৬১ টি জেলার ‘ক’ ও ‘খ’ তফসিলভুক্ত অর্পিত সম্পত্তির তালিকা গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়েছে। ‘খ’ তফসিলভুক্ত সম্পত্তি নিষ্পত্তির আবেদন নিষ্পত্তি করার জন্য জেলাগুলোতে অর্পিত সম্পত্তি প্রর্ত্যপণ ট্রাইব্যুনাল ও জেলা কমিটি গঠন করা হয়েছে। এবারের বাজেটে এ খাতে আর্থিক বরাদ্দে কথা উল্লেখ করা হয়নি। অর্পিত সম্পত্তি প্রর্ত্যপণ ট্রাইব্যুনাল এর বিচারপতি নিয়োগ এবং আনুষাঙ্গিক খরচ মিটাতে চূড়ান্ত বাজেটে অর্থ বরাদ্দ জরুরি। এছাড়াও বলা হয়েছে যে, জলমহাল ও বালুমহাল সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন ২০১০ এবং বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা বিধিমালা ২০১১ প্রণয়ন করা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে এসব আইনে শুধুমাত্র রাজস্ব আদায় ও ব্যবস্থাপনাকে প্রাধান্য না দিয়ে প্রকৃত মৎসজীবী ও ভূমিহীন, দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানের বিষয়টি গুরুত্বসহকারে বিবেচনায় আনতে হবে।

ভূমিহীনদের পুনর্বাসন
বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহনের পর হতে ১ লক্ষের অধিক ভূমিহীন পরিবারের মধ্যে ৫২ হাজার ৪২৪ একর খাসজমি বন্দোবস্ত প্রদান করা হয়েছে। ১৬৪ টি গুচ্ছগ্রাম নির্মিত হয়েছে। ৮ হাজার ২২২টি ভূমিহীন পরিবারকে পুনর্বাসন করা হয়েছে। ৪৩৬ টি উপজেলায় প্রায় ৮ হাজার পরিবারকে সাড়ে ৬ হাজার একর খাসজমি বন্দোবস্ত প্রদান করা হয়েছে। ৪০ টি গুচ্ছগ্রাম নির্মাণের মাধ্যমে ১ হাজার ৫০ টি ভূমিহীন পরিবার পুর্নবাসনের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এবছরই ২১ হাজার ভূমিহীন পরিবারের মধ্যে আরো ৫ হাজার একর খাসজমি বন্দোবস্ত প্রদানের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব পুর্নবাসন প্রক্রিয়ায় দরিদ্র ভূমিহীন মানুষের রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনায় আনা সমীচীন নয়। এবং ভূমিহীন নামে ক্ষমতাবানরা এসব জমি যেন বন্দোবস্ত না পায় তা নিশ্চিত করা যথাযথ কর্তৃপক্ষের অতীব দায়িত্ব ও কর্তব্য।

বলার অপেক্ষা রাখে না যে, বর্তমান মহাজোট সরকারের বাজেটের অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ ও দুর্বল দিক হলো সময়মতো এবং মানসম্মত বাজেট বাস্তবায়ন। এই বাজেট বাস্তবায়ন এর কার্যকারিতা বৃদ্ধির লক্ষে বাজেটে ঘোষিত পদক্ষেপসমূহের পাশাপাশি বাস্তবায়নকারী সংস্থাসমূহের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং সংশ্লিষ্ট আন্ত:মন্ত্রণালয় এর সমন্বয় জোরদার এবং পরিবীক্ষণ-মূল্যায়ন কর্মকান্ড শক্তিশালী করার ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপসমূহ চূড়ান্ত বাজেটে আরো সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা দরকার ছিল।
জাতীয় বাজেট এমন একটি দলিল যার মাধ্যমে একটি সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও আর্থ সামাজিক নীতির প্রতিফলিত ঘটে থাকে। তাই বাজেটের শ্রেণী কাঠামো প্রয়োজনীয় সংস্কারের/ পরিবর্তনের কাজ শুরু করতে হবে। অর্থমন্ত্রী নিজেই বলেছেন, ‘আমি সেদিনের স্বপ্ন দেখি যখন জাতীয় বাজেট একটি শুধু কেন্দ্রীয়ভাবে প্রণীত বাজেট হবে না বরং অধ:স্তন অবস্থা থেকে যেসব দাবী আসবে সেগুলোও বিবেচিত হবে’। আমরা চাই অর্থমন্ত্রীর এই স্বপ্ন দ্রুত বাস্তবে রূপ লাভ করুক এবং রূপকল্প ২০২১ পূরণেও দারিদ্র্য দূরীকরণে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা সফল হউক।
————————-