ঘোষণা ২০১১ঃ গণতান্ত্রিক বাজেট আন্দোলন জাতীয় সম্মেলন ২০১১

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে সাধারণ জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ অন্যতম নাগরিক অধিকার। আমাদের দেশের প্রথাগত-প্রচলিত-দুর্বোধ্য বাজেট সংসদে উপস্থাপন করা হয়, যাতে জনগণ কিংবা জনপ্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ থাকে না। বাংলাদেশ সংবিধানের কার্যপ্রণালী বিধির ৭০ ধারায় দলীয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অবস্থানের কোন সুযোগ নেই। তাই সংসদ সদস্যরা বাজেট আলোচনায় আগ্রহ রাখেন না। এই অবস্থার প্রেক্ষিতে দাবি উঠেছে জাতীয় বাজেট প্রণয়ন প্রক্রিয়ার পরিবর্তন প্রয়োজন। তৃণমূল পর্যায়ে জনগনের মতামতের ভিত্তিতে প্রান্তিক জনগোষ্ঠির চাহিদা অনুযায়ী বাজেট পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন দরকার। এটি কারা সম্ভব হলে আঞ্চলিক বৈষম্যও দুর করে জাতীয় বাজেটে সমতা আনা সম্ভব।

গণতান্ত্রিক বাজেট আন্দোলন ২০১০ জাতীয় সম্মেলনের প্রস্তাবনা ও দাবী গত বাজেটে প্রতিফলিত হয়নি। একই প্রেক্ষাপটে আমরা এবারও জাতীয় সম্মেলনে রাষ্ট্র, সরকার ও জাতির কাছে বাজেট প্রস্তাবনা ও দাবী উপস্থাপন করছি। কাজেই এবারের সম্মেলনে প্রচলিত বাজেট প্রক্রিয়াকে বাতিল ও সংশোধন করে আমলা নির্ভর বাজেট প্রণয়ন প্রক্রিয়ার পরিবর্তে তৃণমূল থেকে কেন্দ্রীয় পর্যায় পর্যন্ত সমস্ত জনগোষ্ঠীর মতামত ও প্রস্তাবনা গ্রহণ করার কাঠামো এবং আইন করা প্রয়োজন।

বাজেট প্রণয়ন প্রক্রিয়াকে গণতান্ত্রিক ও অংশগ্রহণমূলক করার লক্ষ্যে দেশের নাগরিক সমাজের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ সম্পন্ন অংশ ২০১০ সাল থেকে গণতান্ত্রিক বাজেট আন্দোলন শিরনামে কাজ করে যাচ্ছে । তাদের এই কার্যক্রমের অংশ হিসেবে দেশের ২২ টি জেলায় বাজেট বিকেন্দ্রীকরণ বিষয়ে নাগরিক কর্মশালা আয়োজনের উদ্যোগ নেয়া হয়। ইতিমধ্যে দেশের ১২ টি জেলায় এই কর্মশালাগুলো শেষ করা হয়েছে। ১৫ জুন গণতান্ত্রিক বাজেট আন্দোলনের জাতীয় সম্মেলন ২০১১ এ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী, পরিকল্পনা মন্ত্রী, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংসদ সদস্যদের বরাবর নিচের দাবিগুলো পেশ করছে।

সাধারণ দাবিনামা:

  • নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী সরকারকে অবিলম্বে জেলা ভিত্তিক বাজেট প্রণয়নের জন্য সুনির্দিষ্ট রূপরেখা ঘোষণা করতে হবে। এজন্য জেলা পরিষদকে কার্যকর করতে জেলা পরিষদের নির্বাচন দিতে হবে এবং নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে এলাকার উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে। জেলা বাজেটের জন্য ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায় থেকে বাজেট প্রণয়নের কাজ শুরু করতে হবে।
  • সম্পদ বন্টন ও আঞ্চলিক বৈষম্য নিরসনে অনুন্নত এলাকার জন্য বিশেষ পরিকল্পনা এবং বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে।
  • সংসদে বাজেট বিষয়ে সংসদ সদস্যদের কার্যকরী আলোচনা নিশ্চিত করার জন্য বাজেট অধিবেশনের সময় বৃদ্ধি ও কার্যপ্রণালী বিধিতে প্রয়োজনীয় সংশোধন করতে হবে। সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলোকে বাজেট সম্পর্কে জনগণের মতামত গ্রহণের সুযোগ দিয়ে কমপক্ষে তিন মাস পূর্বে উন্নয়ন বাজেটের খসড়া প্রস্তাব স্ট্যান্ডিং কমিটিতে প্রেরণ করতে হবে।
  • বাজেটে জনমতামতের কার্যকরী প্রতিফলন ঘটাতে ৬ষ্ঠ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় সকল শ্রেণী-পেশার মানুষকে সম্পৃক্ত করতে হবে।

খাতভিত্তিক দাবিনামা:

  • দারিদ্র বিমোচনে ও দরিদ্র মানুষকে সামাজিক সুরক্ষা প্রদানে খাদ্য নিরাপত্তা আইন ও কর্মসংস্থান আইন করতে হবে। এজন্য বাজেটে বিশেষ উদ্যোগ থাকা দরকার। গ্রামীণ দরিদ্রদের পাশাপাশি নগর দরিদ্রদের জন্য সামাজিক সুরক্ষা বলয় তৈরি করা প্রয়োজন। পাশাপাশি আদিবাসী, প্রতিবন্ধী, উপকূল-চর-দ্বীপ-হাওর অঞ্চলের জনগোষ্ঠীসহ অন্যান্য সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর জন্য জাতীয় বাজেটে বিশেষ কর্মসূচী নিতে হবে।
  • কৃষিভর্তুকি জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করা দরকার। কৃষকদের কাছে মানসম্পন্ন বীজ ও সার সরবরাহ এবং নিরাপদ কৃষি শস্য উৎপাদনকে উৎসাহ প্রদান করার জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা দরকার। নারী কৃষককে স্বীকৃতি দিয়ে কৃষিকার্ডের মাধ্যমে কৃষি উপকরণ, ভর্তুকি, ঋণ ও অন্যান্য সুযোগ সুবিধা প্রদান করে নারীকৃষককে সমান অধিকার দেয়া প্রয়োজন। অনৈতিক ও অন্যায্য কৃষি বাণিজ্য বন্ধ করতে কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে হবে। কৃষকের জন্য উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে এবং কৃষি ভর্তুকির সুফল যাতে কৃষকের হাতে পৌঁছায় তার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। উচ্চফলনশীল দেশীয় জাতের কৃষি ফসলের উৎপাদন এবং আবাদযোগ্য জমির পরিবেশসম্মত ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। অঞ্চল ভেদে বৈশিষ্ট্য ও বৈচিত্র অনুযায়ী বিশেষ বিশেষ কৃষিভিত্তিক শিল্প গড়ে তুলতে হবে
  • শিক্ষা, স্বাস্থ্য, মানবসম্পদ উন্নয়ন খাতে বাজেট বাড়ানো দরকার। এ সব খাতে সামরিক ও বেসামরিক বাজেট বরাদ্দ পৃথকভাবে উপস্থাপন করতে হবে। এক্ষেত্রে নারীদের অগ্রাধিকার দিয়ে নারী উন্নয়ন নীতিমালা ২০১১ এর আলোকে সুনির্দিষ্ট কর্মসূচী থাকা আবশ্যক। পাশাপাশি জেন্ডার বাজেট বাস্তবায়নে মন্ত্রণালয়গুলোর কাজের মূল্যায়ন হওয়া জরুরী।
  • অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগে সমন্বিত উন্নয়ন পরিকল্পনা/বাস্তব ভিত্তিক ভাবে বাজেটে বরাদ্দ করতে হবে। পাশাপাশি সরকারি ও স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠানসমূহের ব্যবস্থাপনা ও সেবার মান উন্নতির জন্য কর্মকৌশল অত্যন্ত জরুরী এবং দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে জনসেবা প্রদান করতে উৎসাহিত করার জন্য সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিশেষ প্রণোদনা দিতে হবে।
  • শ্রমিক সমাজের দারিদ্র বিমোচন করতে বাঁচার মত জাতীয় ন্যূনতম মজুরীর জন্য বাজেটে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা থাকা দরকার। নারী পুরুষের মজুরী বৈষম্য নিরসনে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। সেইসাথে শিল্পশ্রমিক (বিশেষত গার্মেন্টস শ্রমিক)-দের জন্য পরিবহন ও আবাসন সুবিধা তৈরি করতে তহবিল গঠন করতে হবে।
  • জাতীয় প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধির জন্য শ্রমঘন শিল্পে সরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা দরকার। বন্ধকৃত সকল রাষ্ট্রীয় কলকারখানা সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার আওতায় অবিলম্বে চালু করা উচিত। রাষ্ট্রায়ত্ত্ব শিল্পপ্রতিষ্ঠান পি,পি,পি’র অধীনে দিয়ে বিশিল্পায়ন করা যাবে না।

আঞ্চলিক দাবী:
ঢাকা ঘোষণা ২০১০ এর আলোকে নিম্নলিখিত আঞ্চলিক দাবীগুলো পুনর্ব্যক্ত করা হলো।

খুলনা অঞ্চলের দাবিসমূহ

  • বৃহত্তর খুলনাকে শিল্পনগরী রূপে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে বন্ধ শিল্প কারখানা চালু করতে বাজেট বরাদ্দ করতে হবে। শিল্পে বিনিয়োগ বাড়াতে অবিলম্বে পাইপলাইনে গ্যাস সরবরাহ করতে হবে।
  • আইলা-সিডরে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের পুনর্বাসন করতে, সুপেয় পানি নিশ্চিত করতে এবং সুন্দরবনকে বাঁচাতে পরিবেশ-প্রতিবেশ বান্ধব কর্মসূচি নিতে হবে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় দুর্নীতি বন্ধ করতে কর্মসূচি বাস্তবায়নে জনঅংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
  • মংলা পোর্টকে আধুনিকায়ন করতে বাজেটে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ করতে হবে।

চট্টগ্রাম অঞ্চলের দাবিসমূহ

  • চট্টগ্রাম বন্দর উন্নয়ন ও কুতুবদিয়ায় গভীর সমুদ্র বন্দর স্থাপন করে সমুদ্রবন্দরকেন্দ্রিক অর্থনীতি গড়ে তোলার উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। সামুদ্রিক মৎস নির্ভর অর্থনীতিকে শিল্প হিসেবে ঘোষণা করে সরকারি সহায়তা বাড়াতে হবে।
  • ঢাকা-চট্টগ্রাম সড়ককে চার লাইনে রূপান্তর করতে হবে এবং একটি ট্রাক টার্মিনাল গড়ে তোলার জন্য বাজেট বরাদ্দ রাখতে হবে।
  • পরিবেশ বিপর্যয় বিবেচনায় জাহাজভাঙ্গাকে শিল্প হিসাবে চিহ্নিত করা হতে বিরত থাকতে হবে এবং জাহাজভাঙ্গাকে নিরুৎসাহিত করতে হবে।

পাবর্ত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের দাবিসমূহ

  • পার্বত্য চট্টগ্রামের পিছিয়ে পড়া জাতিগোষ্ঠির প্রযুক্তিগত উন্নয়নে প্রকল্প নিতে হবে। বাজেট প্রণয়নে গ্রামকে প্রাধান্য দিতে হবে এবং কাপ্তাই লেককে মাছ চাষের উপযোগি করতে বাজেট বরাদ্দ রাখতে হবে।
  • পার্বত্য চট্টগ্রামের জন্য পৃথক উন্নয়ন পরিকল্পনা ও নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে এবং কাপ্তাই বাঁধ তৈরী করার ফলে ক্ষতিগ্রস্থদের ক্ষতিপুরণ দেয়ার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
  • পার্বত্য অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে প্রকল্প প্রণয়ন করতে হবে।

বরিশাল অঞ্চলের দাবিসমূহ

  • ভোলার গ্যাস উত্তোলন করে বিভাগের সমস্ত জেলায় বিতরণের ব্যবস্থা করতে হবে এবং গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ক্ষমতা ৫০ মেগাওয়াটে উন্নীত করতে হবে।
  • কুয়াকাটাকে আন্তর্জাতিক পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত করতে পরিকল্পনা নিতে হবে।
  • দক্ষিণাঞ্চলকে জলাবায়ু পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে রক্ষা করার জন্য এডিপিতে পর্যাপ্ত বরাদ্দ রাখতে হবে।
  • দ্বীপ জেলা ও উপজেলার আন্তঃসড়ক যোগাযোগ নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে হবে এবং পিরোজপুরের বেকুটিয়া ব্রীজ নির্মাণে অর্থ বরাদ্দ করতে হবে।

রাজশাহী অঞ্চলের দাবিসমূহ

  • রাজশাহী রেশম শিল্পে বিশেষ বরাদ্দ প্রদান করে ১ লাখ পরিবারের দারিদ্র বিমোচনের সুযোগ দিতে হবে।
  • ভূ-উপরিস্থ পানি নির্ভর সেচ ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য উত্তর রাজশাহী সেচ প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হবে। বৃষ্টি ও বর্ষার পানি ধরে রাখার জন্য প্রয়োজনীয় আধার ও সংরক্ষণাগার তৈরি করতে হবে। পদ্মা নদীসহ বরেন্দ্র অঞ্চলের অন্যান্য নদী, খাল, বিল, পুকুর সংস্কার করে পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।
  • বরেন্দ্র অঞ্চলের আদিবাসী ও চরাঞ্চলের মানুষের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীতে বিশেষ ব্যবস্থা করতে হবে।

রংপুর অঞ্চলের দাবিসমূহ

  • বৃহত্তর রংপুর অঞ্চলের গ্যাস সরবরাহের জন্য আলাদা বরাদ্দ রাখতে হবে।
  • আন্ত:নগর ট্রেন পুনরায় চালু করতে হবে।
  • রংপুর অঞ্চলে কৃষিভিত্তিক বিশেষত আলু ও কলাভিত্তিক শিল্প স্থাপনের জন্য বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ রাখতে হবে। মঙ্গা চিরতরে অপসারণের লক্ষ্যে স্থায়ী কর্মসংস্থানের জন্য বাজেটে বরাদ্দ রাখতে হবে।

দিনাজপুর অঞ্চলের দাবি সমূহ:

  • পাইপলাইনে গ্যাস সরবরাহ করতে হবে।
  • ফুলবাড়ির কয়লা উন্মুক্তভাবে নয়। পরিবেশ প্রতিবেশের দিকে নজর রেখে উত্তোলন করতে হবে। এই কয়লা রফতানি করা চলবে না।

সিলেট (হাওর) অঞ্চলের দাবিসমূহ

  • বিশেষ অঞ্চল ঘোষণা করে হাওর অঞ্চলের জনগোষ্ঠির শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান ও অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য বিশেষ বরাদ্দ প্রদান করতে হবে। হাওর অঞ্চলের শিশুদের শিক্ষা অব্যাহত রাখার লক্ষ্যে নৌকার ব্যবস্থা করতে হবে। ঢাকার সাথে সুনামগঞ্জকে সরাসরি যুক্ত করার জন্য জগন্নাথপুর হয়ে সংযোগ সড়ক স্থাপন করতে হবে।
  • হাওর অঞ্চলের প্রাকৃতিক সম্পদ মৎস্য, পাথর-কয়লা শিল্পকে সুরক্ষা প্রদান করার জন্য বাজেট বরাদ্দ রাখতে হবে।
  • হাওরের ফসল ও গৃহাস্থালি রক্ষার্থে স্বল্পমেয়াদী পরিকল্পনার আওতায় হাওর রক্ষা বাঁধগুলো বর্তমান উচ্চতা থেকে কমপক্ষে ৩ মিটার উঁচু করতে হবে। হাওর অঞ্চলের অবকাঠামো উন্নয়নে কৃষি ও প্রকৌশল গবেষণা কেন্দ্র স্থাপন করতে হবে।