বাংলাদেশ ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার খসড়া দলিল প্রসঙ্গে গণতান্ত্রিক বাজেট আন্দোলনের আহবান

ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার খসড়া জনগণের জন্য উন্মুক্ত করুন
জনগণ ও জনপ্রতিনিধিদের অন্ধকারে রেখে ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রণয়ন করা যাবে না

প্রিয় সুধী,
আপনারা নিশ্চয়ই অবগত আছেন যে বাংলাদেশ সরকারের পরিকল্পনা কমিশন ২০১১-২০১৫ মেয়াদের জন্য ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার খসড়া প্রণয়ন করেছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর জাতীয় সংসদে প্রদত্ত ভাষ্য অনুযায়ী জুন মাসের মধ্যে এ পরিকল্পনা দলিল চূড়ান্ত করা হবে। সে অনুযায়ী ২০১১-১২ বছরের বাজেট ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার আওতায় প্রণীত হওয়ার কথা। এ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা আমাদের দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দলিল যার অলোকে প্রণীত হবে আগামী দিনের উন্নয়নের পথনির্দেশনা।

আমরা পত্র-পত্রিকা মারফত জানতে পেরেছি ইতিমধ্যেই এই গুরুত্বপূর্ণ পরিকল্পনা দলিলের খসড়া প্রণীত হয়েছে এবং একনেকে অনুমোদিত হয়েছে। কতিপয় আমলা ও বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে এই কাজ সমাধা করা হয়েছে। পত্রিকা মারফত আমরা আরো জানতে পেরেছি যে, ইতিমধ্যেই খসড়া দলিল নিয়ে পরিকল্পনা কমিশনে সীমিত আলোচনা হয়েছে । দুঃখজনক হলেও সত্য যে, সাধারণ নাগরিকদের মতামত নেয়ার জন্য এ খসড়া পরিকল্পনা এখনো জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি। এমনকি ওয়েবসাইটেও দেওয়া হয়নি। ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রণয়নের পুরো প্রক্রিয়াতেই জনগণ ও জনপ্রতিনিধিদের অন্ধকারে রাখা হয়েছে। কোন প্রকার জনসংলাপ অনুষ্ঠান ব্যতিরেকে অস্বচ্ছপ্রক্রিয়ায় খসড়া পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে। আমরা পুরো প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা দাবি করছি ও অবিলম্বে খসড়া পরিকল্পনা জনসম্মুখে প্রকাশের দাবি জানাচ্ছি।

২০০২ থেকে বিশ্বব্যাংকের পিআরজিএফ ঋণের শর্তে বাংলাদেশ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা থেকে সরে এসে দারিদ্র্য নিরসন কৌশলপত্র বা পিআরএসপি প্রণয়ন শুরু করে। প্রকৃত জনঅংশগ্রহণ ব্যতিরেকে ঋণের শর্তে প্রণীত প্রথম পিআরএসপির ব্যর্থতার পরও কোন প্রকার জনমূল্যায়ন ব্যতিরেকে বিগত সরকার ২০০৮-২০১১ মেয়াদি ২য় পিআরএসপি প্রণয়ন করেছে। এরপরও দাতাগোষ্ঠীর পরামর্শ ছিল পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার পথে আর যাওয়া যাবে না। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অজন বা উন্নয়নের জন্য দারিদ্র্য নিরসন কৌশলপত্রে বা পিআরএসপির মাধ্যমেই আগ্রসর হতে হবে। বর্তমান সরকার তাঁদের নির্বাচনী ইশতেহারের ঘোষণা অনুযায়ী ২০১১-২০১৫ সাল মেয়াদি ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রণয়নের কাজে হাত দেয়। ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হলেও দাতাগোষ্ঠীর চাপিয়ে দেয়া পিআরএসপি বাদ দেয়া হচ্ছে না। ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার সঙ্গে পিআরএসপি’র সমন্বয় করা হচ্ছে।

পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার প্রয়োজন হয় বৃহত্তর সামগ্রিক উন্নয়ন-ভাবনা থেকেই। শুধুমাত্র গতানুগতিক জাতীয় আয়ের প্রবৃদ্ধি বা মাথাপিছু গড় আয়ের বৃদ্ধির জন্য নয়, উন্নয়ন প্রক্রিয়াকে যখন এর চেয়ে ব্যাপকতর বিষয় হিসেবে দেখা হয়, তখনই পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার প্রাসঙ্গিকতা আসে। তাই পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার উন্নয়ন-দর্শন হতে হবে দেশজ বাস্তবতা, প্রত্যাশা ও প্রয়োজনের নিরিখে; এবং নিজস্ব অভিজ্ঞতা, মূল্যায়ন ও আগামীর স্বপ্ন থেকে। দাতাগোষ্ঠী বা আন্তর্জাতিক সংস্থার পরামর্শ বা দিকনির্দেশনা আলোকে নয়। সেকারণে পুরাতন পিআরএসপির সাথে সমন্বয় বা এর অর্থনৈতিক দর্শনের আলোকে অথবা পিআরএসপি’র আদলে ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা নয়; বরং সার্বভৌম উন্নয়ন পরিকল্পনার স্বার্থে সম্পূর্ণ স্বকীয় নিজস্ব দেশজ উন্নয়ন দর্শনের নিরিখে এই পরিকল্পনা প্রণীত হতে হবে।

বিগত সময়ে পিআরএসপিতে প্রবৃদ্ধির ওপর যেভাবে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে, বৈষম্যের বিষয়টি সেভাবে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয় নি। বৈষম্য বাড়তে থাকলে দারিদ্র হ্রাস কঠিনতর হয় ও সামাজিক স্থিতিশীলতা বিনষ্ট হয়। আমরা প্রবৃদ্ধি চাই তবে তা হতে হবে সমতাঅভিমুখি ও অন্তর্ভূক্তিমূলক। দারিদ্র ও বৈষম্য বৃদ্ধি করে এমন প্রবৃদ্ধিকেন্দ্রিক উন্নয়ন চিন্তার পূনরাবৃত্তি আমরা ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় দেখতে চাই না।

স্বাধীনতার পর এ পর্যন্ত একটি দ্বিবার্ষিকসহ মোট পাঁচটি পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়েছে। এছাড়া খাতভিত্তিক বিশেষ নীতি ও পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়েছে। নানা কারণে এসব পরিকল্পনা থেকে আশানুরূপ সাফল্য আসেনি। তাছাড়া আমাদের জাতীয় বাজেট প্রণয়নের সাথে এ পরিকল্পনাসমূহের সবসময় সামঞ্জস্য খুঁজে পাওয়া যায় না। শুধুমাত্র ‘কেতাবী’ তত্ত্ব নয়, আমাদের প্রয়োজন বিশ্বাসযোগ্য পরিকল্পনা ও কাঠামোগতভাবে সমাঞ্জস্যপূর্ণ বাস্তবায়নযোগ্য কর্মকৌশল। এর সাথে সাথে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার জন্য উন্নয়নের কাঠামোগত বাঁধাসমূহকে চিহ্নিত করতে হবে এবং এর প্রতিকারের সুস্পষ্ট কর্মকৌশল নির্ধারণ করতে হবে।

সরকারের একজন গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারক ইতোমধ্যে খসড়া ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনাকে ‘কেতাবী’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। তাছাড়া অন্যান্য খাতভিত্তিক পরিকল্পনার সাথে ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা সাংঘর্ষিক কিনা তাও দেখা প্রয়োজন। ইতিমধ্যে প্রণীত চবৎংঢ়বপঃরাব চষধহ-এর সাথে এ পরিকল্পনার সম্পর্ক কী? সরকারকে তা সুস্পষ্ট করতে হবে। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসুচির আওতায় চলমান প্রকল্পসমূহ ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার লক্ষ্যের সাথে কতটুকু সামঞ্জস্যপূর্ণ তারও সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রয়োজন ।

এ প্রেক্ষিতে গণতান্ত্রিক বাজেট আন্দোলন-এর পক্ষ থেকে আমরা নিম্নলিখিত দাবি উত্থাপন করছি:

  • অবিলম্বে ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা জনগণের জন্য উন্মুক্ত করুন, জনগণ ও জনপ্রতিনিধিদের অন্ধকারে রেখে ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রণয়ন করা যাবে না
  • ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় জনঅংশগ্রহণ নিশ্চিত করার জন্য ন্যূনতমপক্ষে প্রতিটি জেলায় মতবিনিময় সভার আয়োজন করতে হবে এবং এর সাথে সাথে সকল শ্রেণী-পেশার মানুষের মতামত নিতে হবে
  • আমাদের উন্নয়ন পরিকল্পনার সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করতে হবে; দাতাগোষ্ঠীর নির্দেশিত পথে ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা নয়; পুরাতন পিআরএসপি’র সাথে সমন্বয় বা এর অর্থনৈতিক দর্শনের আলোকে অথবা পিআরএসপি’র আদলে ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা নয়; বরং স্বাধীন স্বকীয় নিজস্ব উন্নয়ন দর্শনের আরোকে পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে।
  • শুধুমাত্র প্রবৃদ্ধিকেন্দ্রিক উন্নয়ন পরিকল্পনা নয়; আমরা চাই সমতাঅভিমুখি ও অন্তর্ভূক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির ধারায় উন্নয়ন পরিকল্পনা
  • অবাস্তবায়নযোগ্য উচ্চাভিলাশী লক্ষ্য নয়, আমরা চাই বাস্তবায়নযোগ্য কর্মকৌশল। উন্নয়নের কাঠামোগত বাঁধাসমূহকে চিহ্নিত করে এর প্রতিকারের কর্মকৌশলসমূহ ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় নির্ধারণ করতে হবে।

আমরা আশা করছি যে, সরকার অতি দ্রুতই ৬ষ্ঠ পঞ্চ বার্ষিক পরিকল্পনার খসড়া দলিল সাধারণ জনগণ ও নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের মতামতের ভিত্তিতে চুড়ান্ত করার উদ্যোগ গ্রহণ করবেন।

গণতান্ত্রিক বাজেট আন্দোলন স্টিয়ারিং কমিটি