Home → Column

শ্রমজীবী মানুষ ও জাতীয় বাজেট

Thursday, Apr 27, 2023

837 Views

বাংলাদেশের শ্রম অর্থনীতি এখন এক নতুন অধ্যায়ে পদার্পন করছে। একদিকে পোশাক শিল্প বিশ্বের প্রতিযোগিতামূলক বাজারে একটা অবস্থান নিচ্ছে, অন্যদিকে চামড়া শিল্প, চিংড়ি শিল্প, ওষুধ শিল্প ও ফুড প্রসেসিং-এর মতো নতুন নতুন শিল্প দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখছে। আবার কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর সংখ্যাও দিনে দিনে বাড়ছে। বিশেষ করে তরুণ জনশক্তির বিশাল একটা অংশ আমাদের শ্রম শক্তিতে যোগ হচ্ছে। এই নতুন শ্রম খাত এবং শ্রম শক্তির
অধিকার নিশ্চিত করতে না পারলে আমাদের অর্থনীতি প্রবৃদ্ধিও ধারাবাহিকতা সচল রাখতে পারবে না। আর এ কারণেই বাজেটের মতো নীতিনির্ধারণী বিষয় নিয়ে দরকার যেমন বিশ্লেষণ, ঠিক তেমনিভাবে দরকার জড়িত পক্ষগুলোর মধ্যে আলোচনা ।

জাতীয় অর্থনীতি ও শ্রমজীবী মানুষ
বাংলাদেশ একটি জনবহুল ও ঘনবসতিপর্ণ দেশ। শ্রম-ঘনত্বই এ দেশের অর্থনীতির বিশেষ বৈশিষ্ট্য। শ্রমজীবী মানুষের বিপুল অংশ (৪৭.৫%) কৃষিতে নিয়োজিত। অন্যদিকে প্রাতিষ্ঠানিক খাতের চেয়ে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে শ্রম-নিয়োজন অনেক বেশি। সর্বশেষ শ্রম সমীক্ষা অনুযায়ী ১৫ বছরের উর্ধে শ্রমজীবী লোকের সংখ্যা ৫ কোটি ৪০ লক্ষেরও অধিক, যেখানে প্রাতিষ্ঠানিক খাতে মাত্র শতকরা ১২.৫ ভাগ এবং বাকি ৮৭.৫ ভাগ শ্রমজীবী মানুষ নিয়োজিত রয়েছে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে। শ্রম বাজারে নারীর অংশগ্রহণ ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেলেও উল্লেখ্য যে প্রাতিষ্ঠানিক খাতে নারীর অংশগ্রহণ এখনও উল্লেখযোগ্য হারে কম। অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের একটি বিরাট অংশ জুড়ে রয়েছে কৃষি এবং অন্যান্য ছোট ও মাঝারি শিল্প। বাংলাদেশের শ্রম-নিয়োজনের ক্ষেত্রসমূহ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, শ্রমজীবী মানুষের অবস্থান তিনটি ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ: (১) সরকারি শিল্প শ্রমিক- পাট, টেক্সটাইল, চিনি, কাগজ প্রভৃতি (২) বেসরকারি শিল্প শ্রমিক - গার্মেন্টস, হালকা যান, পরিবহন, টেনারী প্রভৃতি এবং (৩). অপ্রাতিষ্ঠানিক শিল্প শ্রমিক - গৃহ শ্রমিক, নির্মাণ শ্রমিক, কৃষি শ্রমিক, হকার প্রভৃতি। তবে পরিতাপের বিষয় এই যে, একজন নারী কৃষি শ্রমিকের যেমন সাংবিধানিক কোন স্বীকৃতি নেই তেমনি কৃষি শ্রমিক হিসেবে পরিচয় দেয়ার মতো পরিচয়পত্রও নেই। এমনাকি জীবন, স্বাস্থ্য, অক্ষমতা, মাতৃত্ব সংবলিত সামাজিক নিরাপত্তা সুযোগ এবং বৃদ্ধ বয়সের ভাতার সুযোগ নিশ্চিতকরণের কোন নীতি বা কৃষিশ্রমিক কল্যাণ তহবিল (The Agriculture Workers' Welfare Fund) বা জাতীয় বোর্ড গঠন এবং এ সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় কোন প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো আজও উঠেনি।

কৃষিতে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড কমে যাওয়ার ফলস্বরূপ গ্রামাঞ্চলের এক বিরাট সংখ্যক জনগোষ্ঠী (যাদের সিংহভাগই নিরক্ষর কিংবা আধা-দক্ষ) কাজের সন্ধানে শহরমুখী হয়েছে। গ্রামাঞ্চলে কিছুটা অকৃষিজ পেশার সুযোগ বৃদ্ধি, কাজের টানে শহরমুখী হওয়া এবং শিল্পায়ন না হওয়া - প্রধানত এই তিনটি কারণে বাংলাদেশের জাতীয় অর্থনীতিতে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের বিকাশ ত্বরান্বিত হয়েছে। গ্রামাঞ্চলের পাশাপাশি শহরে জন্ম নিয়েছে বিশাল আকৃতির এক অপ্রাতিষ্ঠানিক খাত। এই খাতে কম মজুরিতে কর্মরত লক্ষ লক্ষ শ্রমজীবীর কর্ম নিরাপত্তা বলতে কিছু নেই। সুতরাং সামগ্রিকভাবে স্থায়িত্বশীল কর্মসংস্থান বাড়েনি। শ্রমবাজার কাঠামোতে যে পরিবর্তন সূচিত হয়েছে তা কোন অর্থনৈতিক অগ্রগতির নির্দেশক নয় বরং এটাকে বলা যেতে পারে “কর্মসংস্থানহীন প্রবৃদ্ধি"। কর্মসংস্থানহীন এ প্রবৃদ্ধির ফলে প্রকৃত বেকারত্ব কমছে না। বাংলাদেশ শ্রম শক্তি সমীক্ষা-২০১০ এর হিসেব মতে ছদ্মবেশী বেকারত্ব (under employment), যারা কোন নির্দিষ্ট সপ্তাহে ৩৫ ঘন্টার কম কাজ করেছে, তাদের হার ২০.৩১ ভাগ এবং বেকারত্বের হার ৪.৫৩ ভাগ। ছদ্মবেশী বেকারত্বের হার শহরের তুলনায় গ্রামে বেশি, যা যথাক্রমে ১২.৪০ ও ২২.৬৭ ভাগ । আবার
বেকারত্বের (unemployment) হার গ্রামের তুলনায় শহরে বেশি, যা যথাক্রমে ৩.১৪ ও ৬.৪৫ ভাগ। এতকিছুর পরেও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি থেমে থাকেনি, বিগত এক দশকে যা গড়ে ৬ শতাংশের কাছাকাছি।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে যেসব খাত সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে তাদের মধ্যে তৈরি পোশাক খাত অন্যতম। এ খাতে প্রায় ৫ হাজার কারখানা রয়েছে যেখানে ৩.৫ মিলিয়নেরও আধিক শ্রমিক কাজ করছে। ২.৫ বিলিয়ন ডলারের এ খাত জাতীয় রপ্তানি আয়ের প্রায় ৭৫ শতাংশ পূরণ করে থাকে (বিকেএমইএ)। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃত বাংলাদেশের এ পোশাক খাতের ৮০ ভাগ শ্রমিকই হচ্ছে সমাজের অবহেলা ও বঞ্চনার শিকার নারীগোষ্ঠী যাদের উল্লেখযোগ্য কোন শিক্ষাগত যোগ্যতাও নেই। বার্ষিক জিডিপি-তে এ খাতের অবদান ১৬ শতাংশ (বিকেএমইএ)।

কৃষি ও পোশাক খাত ছাড়াও যেসব খাতসমূহ বার্ষিক জিডিপি-তে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- নির্মাণ, শিপ বিল্ডিং/ব্রেকিং, চিংড়ি, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোটেল/মোটেল ও রেস্তোরাসহ অন্যান্য সেবা এবং বিভিন্ন ধরনের ছোট ও মাঝারি শিল্প।

আওয়ামী লীগের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ও গৃহীত উদ্যোগ
আওয়ামী লীগের ২০০৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহার হতে ২০১৪ সালের ইশতেহারে বেশ কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ্যনীয়। শ্রম বিষয়ে বেশ কিছু ইতিবাচক প্রতিশ্রুতি ইশতেহারে যুক্ত হয়েছে। যেমন: পোশাক শিল্পের ন্যূনতম মজুরি কার্যকর, নিম্নতম মজুরি পুনঃনির্ধারণ, পোশাক শিল্পের কর্মপরিবেশ ও শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা; শ্রমিক-কর্মচারীদের ট্রেডভিত্তিক প্রশিক্ষণ প্রদান; ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার নিশ্চিত করা; মাঝারি ও ক্ষুদ্র শিল্প খাত উৎসাহিত করা প্রভৃতি। কিন্তু বাজেটে এই সকল প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন সরাসরিভাবে দেখা যায় না।

শ্রমিক ও জাতীয় বাজেট
বাংলাদেশের শ্রম বিষয়ক বিষয় নিয়ে সরাসরি কাজ করে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। এই দুই মন্ত্রণালয়ের বাজেট বরাদ্দের তুলনা করলে দেখা যায় যে, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের বাজেট বিশেষ করে উন্নয়ন বাজেট যেভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের বাজেট সেভাবে বৃদ্ধি পায়নি। যার ফলে, দেশের অভ্যন্তরের শ্রমিক স্বার্থ যেমন, শ্রমিকদের জন্য হাসপাতাল, আবাসন, সামাজিক নিরাপত্তা ইত্যাদি বিষয়সমূহ উপেক্ষিত থেকে গেছে। এছাড়া অনুন্নয়ন বাজেট এর পারিমাণও প্রায় প্রতি বছর প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের জন্য দ্বিগুণ ছিল।

গত ৬ বছরে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের বাজেট পর্যবেক্ষণে দেখা যায় এখানে জাতীয় বাজেটের বরাদ্দ শতকরা ৮-৯ ভাগের মধ্যে সীমাবদ্ধ। সাম্প্রতিক সময়ে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে বরাদ্দ কমে যাওয়ার একটি কারণ হল, এই মন্ত্রণালয়ের অনেকগুলো কাজ অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের প্রকল্প দ্বারা বাস্তবায়িত হয়েছে, যার আর্থিক পাঁরমাণ ৪১৩.৬ কোটি টাকা (সিপিডি)। 

গবেষণা ও প্রকাশনা: গবেষণা টাস্কফোর্স, গণতান্ত্রিক বাজেট আন্দোলন।
টাস্কফোর্স সদস্য ও রিভিউ প্যানেল: মনোয়ার মোস্তফা, মোঃ শহিদ উল্লাহ, মোসফিকুর রহমান, এ আর আমান। থিম কন্ট্রিবিউটর: সেকেন্দার আলী মিনা। তথ্যসহায়তা: ফজলুর রহমান। প্রকাশকাল: মে ২০১৫।

Related Articles