Democratic Budget Movement

কর্মসংস্থান সৃষ্টি, গণ-পরিষেবার মান বৃদ্ধি ও বৈষম্য দূরীকরণে কী করণীয়?

প্রেক্ষাপট-১ অর্থনীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা

আগামী জুন মাসের প্রথম সপ্তাহে ২০১৯-২০ অর্থ বছরের বাজেট পেশ করা হবে। বিভিন্ন সময়ে পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্য থেকে জানা যায়, এবারের বাজেটের আকার হবে প্রায় ৫ লক্ষ কোটি টাকা। অর্থমন্ত্রী বলেছেন, এবারের বাজেটে নতুন কোন করারোপ করা হবে না তবে করের আওতা বাড়ানো হবে। আগামী অর্থবছর থেকে নতুন ভ্যাটনীতি কার্যকর হবে। সরকারি তথ্য মতে, চলতি বছর জিডিপি প্রবৃদ্ধি হবে ৮.৩ শতাংশ। গত এক দশক ধরে প্রবৃদ্ধি ৬-৭ শতাংশের মধ্যে থেকেছে। সামষ্টিক অর্থনীতির সূচকসমূহ আপাতত: স্থিতিশীল। বিগত কয়েক বছর ধরে সামগ্রিক অর্থনীতি, রাজস্ব ব্যবস্থা ও বাজেট ব্যবস্থাপনার ৬টি ক্ষেত্রকে ঘিরে বিতর্ক চলমান রয়েছে: ১. বেসরকারি বিনিয়োগের স্থবিরতা ২. আয় ও সম্পদের বৈষম্য বৃদ্ধি ৩. আর্থিক খাতের অব্যবস্থাপনা ৪. কর-জিডিপি অনুপাত ১০.৩ শতাংশ যা দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্ন ৫. পরোক্ষ কর, বিশেষ করে ভ্যাটের ওপর নির্ভরশীলতা ও ৬. ব্যয়ের গুনগত মান নিয়ে প্রশ্ন।

প্রেক্ষাপট- ২ রাজনীতি ও ক্ষমতা সম্পর্ক  

সব সময়ই বাজেটের একটি ‘রাজনীতি’ থাকে। রাষ্ট্রের ওপর প্রভাব বিস্তার করে সমাজে বিদ্যমান বিভিন্ন শ্রেণী-গোষ্ঠীর কে কতটুকু ‘সম্পদ’ ও ‘সিদ্ধান্ত’ নিজের পক্ষে নিয়ে আসতে পারছে- বাজেটের রাজনীতিতে সেটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। অন্য অর্থে বললে, এটাই বাজেটের ‘রাজনৈতিক-অর্থনীতি’। আরেক অর্থে এটা হলো এক ধরণের ‘রাজনৈতিক বন্দোবস্ত’। বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার স্বার্থে এই বন্দোবস্ত তৈরি হয়। বন্দোবস্তের চরিত্র নির্ধারিত হয় মূলত: শ্রেণীর সংগঠিত রূপ, শক্তি ও সামর্থ্যের ওপর ভিত্তি করে। বাংলাদেশে বিভিন্ন ধরণের ব্যবসায়ী-শিল্পপতি শ্রেণী তাদের স্বীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ের সিংহ ভাগই অর্জন করতে পারে। এই বন্দোবস্তের মাধ্যমে সাম্প্রতিককালে আমাদের ব্যাংক মালিকদের সমিতি সরকারের কাছে থেকে বিশেষ কিছু সুবিধা আদায় করে নিতে পেরেছে। অর্থনীতিতে এর সুদুরপ্রসারী অভিঘাত রয়েছে। অন্যদিকে তৈরি পোষাক শিল্প মালিক সমিতি তাদের অনুকূলে নানান সুবিধা বিদ্যমান থাকা সত্বেও তাদের ওপর বিদ্যমান কর্পোরেট কর হার কমিয়ে ১০ শতাংশে নামিয়ে আনার দাবি জানাচ্ছে। অথচ সাধারণ নাগরিকসহ বিভিন্ন প্রান্তিক জনগোষ্ঠী তাদের জীবন-জীবিকা সংশ্লিষ্ট প্রয়োজনীয় সম্পদ ও সিদ্ধান্ত তাদের পক্ষে নিয়ে আসতে পারছে না। রাষ্ট্রীয় সম্পদকে ঘিরে ‘রাজনৈতিক বন্দোবস্ত’ তাদের আশানুরূপ হচ্ছে না।  বাজেট ও পরিকল্পনা প্রণয়ণ   কার্যত: একদল পলিটিক্যাল এলিট, আমলাতন্ত্র ও ব্যবসায়ী-শিল্পপতিদের নিরঙ্কুশ ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। সাধারণ জনগণের জন্য গণতান্ত্রিক স্পেস’র মতো ফিসক্যাল স্পেসও অত্যন্ত সীমিত হয়ে পড়েছে। অথচ একথা স্বীকৃত যে,  বিপুল পরিমাণ সরকারি ব্যয়ের গুনগত মান নিশ্চিত করার জন্য    ‘জন-অংশগ্রহণ’ বৃদ্ধির কোন বিকল্প নেই। অন্যদিকে সরকারি ও বেসরকারি উভয় ধরণের বিনিয়োগের ক্ষেত্রে পরিবেশ-প্রতিবেশ ও সাধারণ মানুষের জীবন-জীবীকার প্রতি হুমকি সৃষ্টিকারী যে কোন ধরণের উদ্যোগ প্রতিহত করাও গণতান্ত্রিক আকাঙ্খার বহি:প্রকাশ  হিসেবে স্বীকৃত।    

প্রেক্ষাপট- ৩ বিদ্যমান বাজেট কাঠামো ও প্রক্রিয়া

আমাদের জাতীয় বাজেট ও পরিকল্পনা প্রণয়ন প্রক্রিয়াটি চুড়ান্তভাবে ‘জন অংশগ্রহণহীন’। সাংবিধানিকভাবে জাতীয় বাজেট অনুমোদনের দায়িত্ব সংসদসদস্যগণের হলেও তাঁরা নানা ধরণের বিধিবিধানের বেড়াজালে আবদ্ধ। বাজেট আলোচনার সময়ও অত্যন্ত সীমিত। তাছাড়া অনেক সদস্য এ আলোচনায় তেমন আগ্রহ দেখান না। এসব কারণে বাজেট অনুমোদন প্রক্রিয়ার গুনগত মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অন্যদিকে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলি কোনভাবেই বাজেট প্রণয়ন প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত নয়। প্রচলিত ব্যবস্থায় বাজেট প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া মন্ত্রণালয়/বিভাগ নির্ভর। এই অতিকেন্দ্রীভূত ব্যবস্থার কারণেই বাজেট প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে জন অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। সাধারণ জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার জন্য বাজেট প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার বিকেন্দ্রীকরণের কোন বিকল্প নেই। এ ক্ষেত্রে বাজেট ও পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলিকে কার্যকরভাবে যুক্ত করা দরকার। এসব প্রতিষ্ঠানগুলিকে রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও আর্থিকভাবে ক্ষমতায়িত করা প্রয়োজন। জন-অংশগ্রহণ প্রক্রিয়ার বুনিয়াদি প্রতিষ্ঠানিক ক্ষেত্র হবে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান।       

বিদ্যমান এই প্রেক্ষাপটের ওপর দাঁড়িয়ে আমরা আগামী অর্থবছরের বাজেট বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্টভাবে নিম্নোক্ত বিষয়গুলির ওপর আলোকপাত করার জন্য সবাইকে বিনীত অনুরোধ রাখছি।   

কর্মসংস্থান:        

আমাদের অর্থনীতি ব্যক্তিখাত নির্ভর। আমাদের মোট কর্মসংস্থানের মাত্র ৩.৮ শতাংশ সরকারি খাতের। বাকি ৯৬.২ শতাংশই কোন না কোনভাবে ব্যক্তিখাতের। ফলে ব্যক্তি খাত বা বেসরকারি খাতে বিনিয়োগই                            কর্মসংস্থান সৃষ্টির একমাত্র পথ। সরকারি বিনিয়োগ সব সময়ই ‘কৌশলগত’। এটা সরাসরি কর্মসংস্থানে                   তেমন একটা ভূমিকা না রাখলেও বেসরকারি খাতকে বিনিয়োগে উৎসাহ যোগায়।  অথচ বিগত ৫ বছর ধরে                         ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ ২২-২৩ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে আছে। ফলে কর্মসংস্থানের ওপরে                                     নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। তাছাড়া যে ধরণের কর্মসংস্থান ঘটছে তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। দেশের ৮৫.১                               শতাংশ কর্মসংস্থান ঘটছে অনানুষ্ঠানিক খাতে যেখানে বেতন-ভাতা, কর্মঘন্টা, কাজের নিশ্চয়তা,                                উৎপাদনশীলতা ইত্যাদি  প্রশ্ন সাপেক্ষ। জাতীয় বাজেটে কর্মসংস্থানের একটি পূর্ণরূপরেখা থাকা উচিত। কোন              খাতে, কী ধরণের এবং কতো কর্মসংস্থান হতে পারে- তার একটি চিত্র তুলে ধরা উচিত।

বৈষম্য:               সরকারের নিজস্ব পরিসংখ্যানসহ বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে বাংলাদেশে ক্রমবর্ধমান আয় ও                        সম্পদ বৈষম্যের চিত্র উঠে এসেছে। সর্বশেষ খানা আয়-ব্যয় জরিপের তথ্য বিশ্লেষণ থেকে দেখা যায়, ২০১০                  সালের তুলনায় ২০১৬ সালে ওপরের দিকের ৫ শতাংশ পরিবারের আয় বৃদ্ধি পেয়েছে ৮৮.১ শতাংশ;                          অন্যদিকে একই সময়ে নীচের দিকের ৫ শতাংশ পরিবারের আয় নেমে গেছে ৫১.৩ শতাংশ। নীচ ও ওপরের                   দিকের এই পার্থক্য ১২১.৩ গুন। লন্ডনভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘ওয়েল্থএক্স’র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে                  ‘অতি ধনী’ লোকের সংখ্যা বৃদ্ধির হার বিশ্বে সর্বোচ্চ। এ দেশে ৩ কোটি ডলার বা ২৫০ কোটি টাকার সম্পদ                       রয়েছে এমন মানুষের সংখ্যা বেড়েছে ১৭.৩ শতাংশ হারে। প্রগতিশীল কর ব্যবস্থার অনুপস্থিতি, সম্পদের             ওপর কর ধার্য না করা এবং সরকারি ব্যয়ের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার নির্ণয়ে সমস্যা সামগ্রিকভাবে বৈষম্য                             পরিস্থিতিকে চরম অবস্থার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বাজেটে এই বিষয়গুলি নিয়ে সুনির্দিষ্ট বক্তব্য ও কার্যক্রম                       থাকা দরকার।     

গণ পরিষেবা:      স্বাস্থ্য-শিক্ষা-পরিবহন-নিরাপত্তা ইত্যাদি খাতগুলিতে শুধু বর্ধিত বরাদ্দই নয় ব্যয়ের গুনগত মান নিশ্চিত                          করাও জরুরি। এ ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য খাতটি চরম অবহেলিত। বাংলাদেশে স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় বরাদ্দ কখনোই                                 জিডিপি’র ১ শতাংশও অতিক্রম করতে পারে নি। ফলে সাধারণ মানুষের ‘আউট অব পকেট’ ব্যয় ৬৭                             শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে, যা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলির নিরিখে সর্বোচ্চ। চিকিৎসা ব্যয় বৃদ্ধির সাথে দারিদ্র্য                     বৃদ্ধির সম্পর্ক রয়েছে। এর সাথে বৈষম্য বৃদ্ধির সম্পর্কও নিবিড়। শিক্ষা ব্যবস্থার বাস্তব চিত্রের সাথেও সকলে                  পরিচিত। এ খাতে বরাদ্দ বেশি দেখানো হলেও তা এখনো আন্তর্জাতিক মানদন্ড ছুঁতে পারেনি। তাছাড়া                                     শিক্ষার গুনগত মান অত্যন্ত নীচুতে অবস্থান করছে।   ফলে গণ পরিষেবা খাতগুলিতে বর্ধিত ব্যয়                                 বরাদ্দ ও সেবার গুনগত মান    নিশ্চিত করার বিষয়টি এবারের বাজেটে গুরুত্ব সহকারে আলোচিত হওয়া                 উচিত। 

করের বোঝা:      আমাদের দেশে মোট রাজস্ব আয়ের দুই তৃতীয়াংশই ‘পরোক্ষ কর’ যার মধ্যে ভ্যাট অন্যতম। যে কোন                          ধরণের    পরোক্ষ করের বোঝা সাধারণ মানুষকে বইতে হয়- এটা সর্বজনবিদিত। এই পরোক্ষ করের ওপর                   নির্ভরশীলতাই ‘করের বোঝা’ সৃষ্টি করে। অন্যদিকে প্রতি বছর একাধিকবার বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম দৃষ্টির                       ফলে পরিবহন- যাতায়াতসহ পণ্য-সেবার উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়, যার নেতিবাচক অভিঘাত পরে সাধারণ             মানুষের জীবনযাত্রায়। এবারের বাজেটে প্রত্যক্ষ কর বৃদ্ধিসহ জীবনযাত্রায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলে এমন                      ‘কৌশলগত’ পণ্যের দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে বাজেটে সৃস্পষ্ট  নির্দেশণা থাকা দরকার। বিশেষভাবে ‘সম্পদ                   কর’ প্রবর্তন করার বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা উচিত।

বাজেটের

কাঠামোগত

পরিবর্তন ও

জনঅংশগ্রহণ:     আমাদের জাতীয় বাজেট প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় মৌলিক কাঠামোগত পরিবর্তন দরকার। বিশেষ                  করে উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে বিভিন্ন স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের কার্যকর ভূমিকা থাকা চাই।                 নীতিগতভাবে সরকারি বরাদ্দের ৩০-৩৫ শতাংশ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের হাতে দিয়ে দেওয়া উচিত। এই                   অর্থ ব্যয় ও প্রকল্প বাস্তবায়নের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য স্থানীয় সরকারকে আরো  শক্তিশালী ও ক্ষমতায়িত                       করা দরকার। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলির মাধ্যমে তৃণমূল পর্যায় থেকে মানুষ যাতে বাজেট আলোচনায়                       অংশ গ্রহণ করতে পারে- সে ব্যবস্থা করা দরকার। জাতীয় সংসদে বাজেট আলোচনার জন্য সময় বৃদ্ধি,                   সংসদসদস্যদের ভূমিকার ব্যপ্তি ও স্ট্যান্ডিং কমিটিগুলিতে বাজেট নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা ও মতামত                            পেশের সুযোগ বৃদ্ধির ‘সংসদীয় কার্যপ্রণালী বিধি’তে প্রয়োজনীয় সংস্কার আনা জরুরি।

মনোয়ার মোস্তফা

সদস্য, নির্বাহী পর্ষদ